মনের গুণে সেই সারবস্তু ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য লাভ করে, ‘অহং’-বোধ-বিশিষ্ট হয়, যার জন্য আমরা যা কিছু বুঝি এই ‘অহং’-এর মধ্য দিয়ে তা বুঝি। এই ‘অহং’- বুদ্ধি ছাড়া আমরা আমাদের বুঝতে পারি না, যদিও ‘অহং’-বুদ্ধিটি আসল আমি নই। আসল আমি অহং-বোধের অতীত। সদা প্রোজ্জ্বল সারবস্তু মনের গুণে অহং-রূপে প্রকাশিত হয়। এই ভাবে আসল মানুষের দেহাত্মবুদ্ধি আসে। জাগ্রৎ-অবস্থায় আমরা দ্বিবিধ ঘটনা সম্বন্ধে অবহিত থাকি—একদিকে বাহ্যজগৎ দেখি অন্যদিকে আন্তর-রহস্য সম্বন্ধে অবহিত হই। কিন্তু আমরা সমগ্র মনটি দেখতে পাই না, তার উপরের অংশটুকু দেখি। কখনও সুখ অনুভব করি, কখনও ভয় পাই, কখনও আশার আলো দেখি কখনও বা অসুখী হই। কিন্তু আমাদের মধ্যে নানান প্রবণতা, বাসনা, স্মৃতি, সংস্কার থেকেই যায়। অহংচেতনার কাছে তার অংশমাত্র প্রকাশিত হয়। মনের এই অংশটিকে সাধারণতঃ “চেতন মন” বলা হয়।
জাগ্রৎ অবস্থায় আমরা দেহ-বোধে পূর্ণ থাকি। স্বপ্ন অবস্থায় জীব দৈহিক স্তর থেকে অবচেতন স্তরে নেমে আসে। স্বাভাবিক চেতনার নীচে এই অবচেতন স্তরে বাস করে আমাদের প্রবণতাসমূহ, কামনাচয় এবং জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত অতীত সংস্কারসমূহ। জাগ্রৎ অবস্থায় মানুষের নির্দিষ্ট অহং চেতনা থাকে। কিন্তু জীব যখন দৈহিক স্তর থেকে সংস্কারের ভাণ্ডাররূপ অবচেতন স্তরে প্রবেশ করে জাগ্রৎ-কালীন অহং-বুদ্ধি সে হারায়। জীব যেন সঞ্চিত সংস্কারে ডুব দেয়।অবচেতন স্তরে বিচার-ক্ষমতা এবং ইচ্ছাশক্তি কাজ করে না। কল্পনার প্রাচুর্য এবং অনিয়ন্ত্রিত আবেগ তখন কাজ করে। সূক্ষ্ম সংস্কার থেকে যত খুশী রূপ তৈরি করে কল্পনা। মানুষের যে দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য—বিচারশক্তি ও ইচ্ছাশক্তি—সে দুটি থেকে স্বপ্ন অবস্থায় জীব বঞ্চিত হয়। বাস্তবিকই আমরা তখন আবেগ ও কল্পনার অধীনস্থ হই।
তারপর সুষুপ্তি অবস্থায় আমরা আরও গভীরে যাই। স্বপ্ন-স্তরের অনেক নীচে মনের আরও একটি স্তর আছে—যাকে বলে কারণ অবস্থা। স্বপ্ন অবস্থায় মনের বৈচিত্র্য থাকে, যথা—ভালবাসা, অনুভূতি, স্মৃতি। কিন্তু কারণ অবস্থায় সমস্ত কিছু সমশ্রেণীভুক্ত হয়ে যায়।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়—গাছের কারণ অবস্থা হল বীজ। গাছের মধ্যে আমরা বৈচিত্র্য দেখি কিন্তু যে বীজের মধ্যে গাছ সুপ্ত অবস্থায় আছে তার মধ্যে বৈচিত্র্য দৃষ্ট হয় না।অনুরূপে প্রতিটি জীবের মনে একটি কারণ অবস্থা আছে। সে কারণ অবস্থায় মনের সমস্ত কার্য স্তব্ধ হয়ে যায়। এমনকি অহং-চেতনাও লোপ পায়। আমরা যে কী তাও জানতে পারি না। রাজা তখন রাজা থাকেন না, মা তখন মা থাকেন না। পূর্ণ অজ্ঞানের রাজ্যে জীবাত্মা কিন্তু এই অজ্ঞানের নীরব সাক্ষী থাকেন।
স্বামী সৎপ্রকাশানন্দের ‘ধ্যান সাধনা সিদ্ধি’ থেকে