কলহার মুখোপাধ্যায়: পাঁচটি ছোট্ট তথ্য জানতে হবে। প্রথমেই।
কলহার মুখোপাধ্যায়: পাঁচটি ছোট্ট তথ্য জানতে হবে। প্রথমেই।
১) প্রতি বছর ভারতে খাদ্যশস্যের ২২ শতাংশ নষ্ট হয়।
২) ভারতে প্রায় ২০ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পান না। প্রায় ৩৫ শতাংশ শিশু ঠিকমতো খেতে পায় না। ১৯ শতাংশ শিশু অপুষ্টিতে ভোগে।
৩) ভারতে ফি বছর ৭কোটি ৮০ লক্ষ টন খাবার নষ্ট হয়।
৪) বছরে ৯০ হাজার কোটি টাকা স্রেফ খাদ্য অপচয়ের কারণে জলে যায়।
৫) ফল ও সবজির প্রায় ১৫-৩০ শতাংশ নষ্ট হয় বছরে।
একটু সহজ করে দেখলে, দেশে ১০০ কেজি ধান-গম-ডাল উৎপাদন হলে তার মধ্যে ২২ কেজি যায় নষ্ট হয়ে। ১০০টা কলা জন্মালে ৩০টি জলাঞ্জলি যায়।
এখন বাজারে গিয়ে ৮০ টাকা কেজি দিয়ে যখন উচ্ছে বা শসা কিনতে চোখে জল আসে বা সন্তানকে দুটোর বদলে চারটে ফল খাওয়ানো যায় না, তখন এই লেখায় চোখ পড়লে গা রি রি করবে বইকি! তথ্যগুলি একত্রে দেখলে একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে অসহায়ও লাগবে।
ছোট্ট গল্প...
কলেজ স্ট্রিটে থাকে দাস পরিবার। ছেলেটা রোগাভোগা। ডাক্তার বলেছে, দুধের সঙ্গে একটু আমন্ড আর কাজু বেটে খাওয়াতে। কিন্তু যা দাম, রোজ বাদাম খাওয়ানো সম্ভব হয় না। কর্তা-গিন্নি দু’জনে চাকরি করেও না।
তাঁদের বাড়িতে ঠিকে কাজ করতে আসেন মালতি। কথায় কথায় মালতি সেদিন দাস গিন্নিকে বলেন, ‘ছেলে আর মেয়ের জন্য একটা দুধের প্যাকেট কিনলে আর হয় না... জানেন দিদি। ওদের খিদে মেটে না। কিন্তু কত দাম বলুন! দু’টো করে প্যাকেট রোজ কেনা সম্ভব?’
মালতির বর সুবল বালিগঞ্জে যাদের গাড়ি চালান, সে বাড়ির ক্লাস থ্রির মেয়েটা নাকি দুধ মুখেও তোলে না। রোজ কয়েক লিটার দুধ ফেলে দেয় কাজের লোকটি।
মেয়েকে তার মা-বাবা এ নিয়ে একদিন বকেছিলেন। শিশুটি নাকি বলেছিল, ‘রেস্তরাঁয় সেদিন তোমরা আর সিন্ধু আন্টিরা যে অতগুলো প্লেট খাবার ফেলে দিলে, তার বেলা! আমাকে শুধু দোষ দাও কেন?’
রোজ এরকম ছোটো দৃশ্যের জন্ম হয় কলকাতায়, জেলায়, রাজ্যে, দেশে, বিশ্বে। দৃশ্যগুলি জন্মাতে জন্মাতে তথ্যের পাহাড় তৈরি করে। সে তথ্যগুলি একত্র হলে যখন জানা যায়, আমাদের দেশের ৩৫ শতাংশ শিশু ঠিকমতো খেতেই পায় না, অসহায় রাগে দাঁত কিড়মিড় করে।
নষ্ট বনাম অপচয়
এতক্ষণে সবার মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, এত খাবার যে অপচয় হয় তার জন্য দায়ী কে? বালিগঞ্জে কাজের লোক দুধ ফেলে দেয় বলেই কি মালতির ছেলে-মেয়ে পায় না? রেস্তরাঁয় খাবার নষ্ট হয় বলেই কি কলেজ স্ট্রিটের রোগা বাচ্চাটা বাদাম পায় না? শুধু কি জন্মাতে থাকা এরকম দৃশ্যগুলিই বিশ্বজোড়া অভাবের কারণ?
এখানে একবার বুঝে নেওয়া দরকার যে, ‘খাবার নষ্ট’ আর ‘খাদ্য অপচয়’ এক বিষয় নয়। নষ্ট বলতে বোঝায়, উৎপাদন থেকে গ্রাহকের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি। এই কাজ মূলত হয় সরকারের তত্ত্বাবধানে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবহণের সমস্যা কিংবা সঠিকভাবে মজুত বা কালোবাজারির কারণে মানুষের প্লেট অবধি পৌঁছানোর আগেই খাবার নষ্ট হয়। আর অপচয় হল, ভোক্তারা খাবার নষ্ট করে। পছন্দ না হলে, পেট ভরে গেলে, বা বেহিসাবি কিনে বহু মানুষ খাবার ফেলে দেন। এটি হল অপচয়। ফলে সরকারি নীতি যেমন খাবার নষ্টের জন্য দায়ী, তেমনই বালিগঞ্জের মতো বিশ্বজোড়া কিছু মানুষের বেহিসাবি স্বভাব অপচয়ের ‘কালপ্রিট’।
আর একটি ছোটো তথ্য। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা ৮৬০ কোটি হওয়ার সম্ভাবনা। ২০৫০ সালে তা দাঁড়াবে ১ হাজার কোটিতে।
এই বিপুল জনসংখ্যার পেট ভরাতে খাদ্য উৎপাদন ৬০ শতাংশের মতো বাড়াতে হবে। কিংবা যেভাবে হোক বন্ধ করতে হবে অপচয়। অর্থাৎ অপচয় বন্ধে এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতের শিশুরা খালি পেটেই ঘুমোতে যাবে।
এবার স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে ‘খাবার নষ্ট হয় কেন?’
তথ্য বলছে, ভারতে শুধুমাত্র সংরক্ষণের অভাবে বহু পরিমাণ খাদ্যশস্য নষ্ট হয়। ফল ও সবজি নষ্টের অন্যতম কারণ, পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজের অভাব, পরিবহণ সমস্যা, পাইকারি বাজারে আচমকা দাম কমে যাওয়া। কৃষক ন্যায্য দাম না পেলে ফসল ফেলে দেন। এছাড়াও রয়েছে সরবরাহ শৃঙ্খলে সমন্বয়ের চূড়ান্ত অভাব। এই কারণগুলির জন্য দায় যায় সরকারের উপর। কিন্তু আয়নার সামনে একবার মানুষ যদি নিজেকে দাঁড় করায়, তাহলে কী দেখা যায়? তথ্য দেখাচ্ছে, ভারতের প্রত্যেক নাগরিক বছরে গড়ে ৫০ কেজি খাবার অপচয় করেন। এ দোষে দুষ্ট বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং ধনী শ্রেণি। এই অপচয় খাদ্যের মোট অপচয়ের শতকরা প্রায় ৩৫ ভাগ।
তাহলে তো বলতেই পারেন—এই যে সমালোচনার আঙুল ঘুরে গেল সাধারণ মানুষের দিকে! তার বেলা? সমাধানের উপায়টা কী শুনি? দেখুন, সরকারি ব্যর্থতায় ৬৫ শতাংশ খাবার নষ্ট হয়। কিন্তু সরকারি নীতি সাধারণ মানুষের হাতে নেই। দেশ স্বাধীন হওয়ার এতদিন পরও যখন সমস্যা সমাধানে কোনো কেন্দ্রীয় বা প্রাদেশিক সরকার সেভাবে খাবার নষ্ট বন্ধে নজর দেয়নি, তখন ধরে নেওয়াই যায়, এর নেপথ্যে নিশ্চয়ই কিছু গূঢ় উদ্দেশ্য আছে। সেদিকটাও জানা যাবে। তার আগে ওই ৩৫ শতাংশ নিয়ে সাধারণ মানুষ নিজে কী করতে পারে, সেদিকে চোখ ঘোরানো যাক।
করণীয়
সাধারণ মানুষের, অর্থাৎ আমাদের অনেক কিছুই করার আছে। ১) শুধুমাত্র কেনার তাৎক্ষণিক তাড়নায় নয়, খাবার কিনতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী এবং আগে থেকে ভেবে। অতিরিক্ত বাজার করা একেবারে চলবে না। বাজার করে বাড়িতে মজুত রাখা খাবার অপচয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। ২) সঠিক সংরক্ষণ সবার করা উচিত। ফল ও সবজি সঠিক উপায়ে না রাখার ফলে দ্রুত নষ্ট হয়। কলা, টমেটো, নাশপাতি, পেঁয়াজপাতা ইত্যাদি আলু, আপেল, শাক থেকে দূরে রাখতে হবে। ৩) প্রয়োজনের অতিরিক্ত রান্না কখনোই নয়। ৪) ফল-সবজির বীজ খাওয়া অভ্যাস করা। যেমন মিষ্টি কুমড়োর বীজ খেতে ভালো ও পুষ্টিগুণও আছে। ধুয়ে রোদে শুকিয়ে কৌটোয় রাখলে দীর্ঘদিন খাওয়া যায়। ৫) ডিমের খোসাও ফেলনা নয়। কিছু গাছের জন্য তা ভালো সার। ৬) কোন খাবার কোথায়, কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়, এ বিষয়টি জেনে রাখা জরুরি। আলু, পেঁয়াজ খোলা জায়গায় রাখতে হয়। শাক-সবজি ফ্রিজে এয়ারটাইট ব্যাগে রাখলে দীর্ঘদিন ভালো থাকে। ৭) বিয়ে কিংবা অনুষ্ঠান বাড়িতে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেকে খাবার খেয়ে ফেলেন। এর ফলে খাবার যেমন অপচয় হয়, তেমন স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি। তাই বাড়িতে ও অনুষ্ঠান বাড়িতে যতটুকু খেতে পারা সম্ভব ততটুকুই নেওয়া উচিত। অনুষ্ঠানে বাড়তি খাবার তৈরি করা অনেকের কাছে স্টেটাস সিম্বল। তা বন্ধ করতেই হবে। প্লেটে অনেক খাবার নিয়ে নষ্ট করা নৈব নৈব চ। ৮) প্যাকেটজাত খাবার কেনার ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া উচিত। পাউরুটির মতো স্বল্পমেয়াদি খাবার মেয়াদের সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। ৯) নিজেদের নষ্ট করার হাত থেকে বিরত থাকতে হবে। ১০) সন্তানদের খাবার নষ্ট না করতে ছোটো অবস্থাতেই শেখানো শুরু করতে হবে। যাতে বালিগঞ্জের ঘটনার মতো মা-বাবার দিকে আঙুল তুলতে না পারে বাড়ির শিশুটি। এটুকু প্র্যাকটিস শুরু করে দিলেই ২০৩০ সালে জন্মানো শিশুরা পেট ভরে খেয়ে ঘুমোতে যেতে পারবে। এবার নজর ঘোরানো যাক ৬৫ শতাংশের দিকে। অর্থাৎ, সরকারি নীতি।
এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ সরাসরি কিছু করতে পারে না ঠিক, তবে ভোটের মেশিনে খাবার নষ্টের প্রভাব যে কোনোদিন পড়বে না, তা কে বলতে পারে? খাবার নষ্ট নিয়ে লাগাতার যে অভিযোগগুলি ওঠে তা হল, বাজারে দাম ঠিক রাখতে অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য নষ্ট হতে দেওয়া। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন হলেও গরিব মানুষ তা কিনতে পারে না। এবং দেশের নাগরিকদের খাদ্যের অধিকার লঙ্ঘিত হয়। অভিযোগ এও ওঠে, দেশে খাদ্যের অভাব নেই, কিন্তু প্রকৃত সমস্যা হল, বণ্টনের অভাব। সরকার পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম বাড়ালে অভাব কমে যেত স্বাভাবিকভাবেই। এ দেশে বহু মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারেন না। অথচ সরকারি গুদামে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য খোলা পড়ে থাকে। লক্ষ লক্ষ টন শস্য নষ্ট হয়। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ভারত খাদ্য উৎপাদনে ‘আত্মনির্ভর’ শুধু নয়, খাবার উদ্বৃত্তও থাকে এদেশে। কিন্তু তারপরও অপুষ্টিতে ভোগে বহু মানুষ। পৃথিবীতে প্রতি তিন অপুষ্ট শিশুর একজন ভারতের। এখানে বছরে ২ কোটি ১০ লক্ষ টন গম নষ্ট হয়, যা কোনো দেশের বার্ষিক উৎপাদনের সমান। খাদ্য অপচয় অনৈতিক বা অমানবিকই শুধু নয়, মানুষের পুষ্টি, শিশুদের বৃদ্ধি, দেশের উৎপাদনশীলতা, অর্থনীতির উপরও আঘাত। এমনিতেই খরা, বন্যা কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছর প্রচুর ফসল নষ্ট হয়। এছাড়া রয়েছে পোকামাকড়ের কবলে পড়ে ফসলের ক্ষতি হওয়া। ভারতের মতো দেশে সঠিক যত্ন না নেওয়ার ফলেও উৎপাদন কম হয়। এছাড়া খামারে বিভিন্ন সময় রোগ দেখা দেওয়ার পশুপাখি মারা পড়ে। এগুলির অনেকগুলি রোধ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু যেগুলি রোধ করা সম্ভব, সেগুলির দিকেও নজর দেন না নীতি নির্ধারকরা। ফলে অভাবের তিমির কিছুতেই কাটে না। আবার অনেক বড়ো খাদ্য প্রক্রিয়াজাত সংস্থা কাঁচামাল সংগ্রহে খুঁতখুঁতে। তারা কৃষকের উৎপাদিত সব ফসল নেয় না, কিছু অংশ মাত্র নেয়। বেঁচে যাওয়া সে ফসলের বেশিরভাগই যায় নষ্ট হয়ে। তখন দায়ভার বর্তায় গরিব কৃষকের উপর। ফসল বিক্রি করতে পারে না। ফলে আত্মহত্যার ঘটনা পর্যন্ত ঘটে।
আমার সন্তান যেন...
আমরা মধ্যবিত্ত। চাহিদা থাকে। শখ থাকে। সীমাবদ্ধতাও। তাই অপচয়ের ভাগীদার হতে চাই না আমরা। কখনো না। আমরা বড়ো হই সেই সীমাবদ্ধতার ছত্রচ্ছায়ায়। বুড়ো হই ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে... ওদের ভাতের অভাব যেন না নয়। পেটের দায়ের থেকে বড়ো দায় আর কিছুই যে হয় না! জীবনটাই যে বাঁধা আমাদের... পাকস্থলিতে।
তথ্য মাধ্যম: ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ/ গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স, জাতিসংঘ/ ন্যাশনাল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন/ ফুড কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া/ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, জাতিসংঘ/ পিপলস ডেমোক্রেসি/মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন।