


সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া: কয়েকদশক ধরে শিবপুর আইআইইএসটির এক প্রান্তে, মাটির নীচে নিঃশব্দ বেসমেন্টে চাপা পড়ে ছিল এক ইতিহাস—‘বেনিঅফ সিসমোগ্রাফ’। একসময় এই কলেজ থেকেই যন্ত্রটি নির্ধারণ করত পৃথিবীর গভীর থেকে আসা ভূকম্প তরঙ্গের সাড়া। দেশের ভূকম্প গবেষণার প্রারম্ভিক সুর বেঁধেছিল এই সিসমোগ্রাফ। কিন্তু সময়ের প্রবাহে হারিয়ে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে। বহু বছর ধুলো ও নীরবতাকে সঙ্গী করেই ঘুমিয়ে ছিল যন্ত্রটি। অবশেষে বহু দশক পর, পুনরায় সেটিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে শিক্ষাঙ্গনের আলোয়। যেন ইতিহাস আবার ফিরে এসেছে নিজের জায়গায়।
১৯৩০ সাল নাগাদ ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (ক্যালটেক) বিজ্ঞানী ভিক্টর হিউগো বেনিঅফ তৈরি করেছিলেন আনুভূমিক সিসমোগ্রাফটি। এরপর তৎকালীন বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (পরে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, বর্তমানে আইআইইএসটি শিবপুর) যন্ত্রটি নিয়ে এসে স্থাপন করা হয়েছিল বিশ্বের ভূকম্প পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক গঠনের অংশ হিসেবে। ভূমির সূক্ষ্মতম কম্পন ধরতে কলেজ প্রাঙ্গণের মাটির নীচে তৈরি করা হয় একটি বিশেষ বেসমেন্ট। সেখানে গড়ে ওঠে জিয়োফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি। এই ল্যাব থেকেই বেনিঅফ সিসমোগ্রাফ রেকর্ড করত পৃথিবীর নাড়ির শব্দ, হিমালয় অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ মধ্য ভারত মহাসাগর পর্যন্ত। সংগৃহীত তথ্য পাঠানো হত ক্যালটেকের সিসমোলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে। সেই তথ্য ব্যবহার করা হত ভূমিকম্পের প্রাথমিক পূর্বাভাস নির্ধারণে। শিবপুর আইআইএএসটির ল্যাবের মাধ্যমেই ভারত প্রথমবার যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক ভূকম্প পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে। ১৯৫৭-৫৮ সালে এই কলেজ নির্বাচিত হয় ভারতের সেই পর্যবেক্ষণাগারগুলির একটি হিসেবে, যেগুলি ভূকম্প ও কসমিক রশ্মি সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করত।
এই গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন কলেজের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ডঃ এস কে চক্রবর্তী। সিসমোগ্রাফের মান ও ক্যালিব্রেশন পদ্ধতির উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। পরবর্তীকালে তিনি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব সিসমোলজি অ্যান্ড ফিজিক্স অফ দ্য আর্থস ইন্টিরিয়রের সভাপতি নিযুক্ত হন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে যায় বেনিঅফ সিসমোগ্রাফের পথচলা। আশির দশকে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের জিয়োফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০০৪ সালে সেই বেসমেন্টের উপর গড়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং অফিস। আর তাতেই চাপা পড়ে যায় সিসমোগ্রাফের পেন্ডুলামের শেষ স্পন্দন। পরে সেখানে তৈরি হয় কলেজ ক্যান্টিন। যেখান থেকে একসময় ধরা পড়ত পৃথিবীর কম্পন, সেখানেই এখন বাজে চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ।
তবে ইতিহাসের পুনর্জাগরণও হয়। কেউ তাকে ফিরে আনে যত্নে, ভালোবাসায়। আইআইইএসটির বর্তমান ডিরেক্টর ভি এম এস আর মূর্তির নির্দেশে এবং সহ-নিবন্ধক ডঃ বিভোর দাসের উদ্যোগে সম্প্রতি উদ্ধার করা হয়েছে সেই প্রাচীন সিসমোগ্রাফটি। যত্নসহকারে তার জং ধরা দেহটিকে কাচ ও কাঠের ফ্রেমে ঢেকে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে কলেজের মূল প্রাঙ্গণে। যেন সময়ের বুক চিরে উঠে এসেছে এক নিঃশব্দ সাক্ষ্য। ডঃ বিভোর দাস বলেন, ‘বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারগুলির মধ্যে অন্যতম এই যন্ত্র। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে বাংলার এই কলেজের ইতিহাসকে যেন সুতোর মতো জুড়ে রেখেছে সেটি। বিজ্ঞানের প্রত্যেক পড়ুয়ার জন্য সেই ইতিহাসকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।’ আজ শিক্ষার্থীরা কলেজে ঢুকতেই থমকে যান সেই যন্ত্রের সামনে—বিস্ময়ে, শ্রদ্ধায়। একসময় যে-যন্ত্র পৃথিবীর গভীরের স্পন্দন শুনত, আজ সে সাক্ষ্য দিচ্ছে মানুষের অনুসন্ধিৎসার। শিবপুরের প্রাঙ্গণে বিজ্ঞানের এক হারানো সুর ফিরে পেয়েছে তার নিজের অনুরণন। নিজস্ব চিত্র