দেবাঞ্জন দাস, কলকাতা: পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশমাতৃকাকে মুক্ত করতে তখন উত্তাল গোটা বাংলা। মাছে-ভাতে বেড়ে ওঠা দামাল বাঙালি তরুণ, যুবকরা দেশকে স্বাধীন করার ব্রত নিয়ে চারদিকে জ্বালাচ্ছেন বিপ্লবের আগুন। উত্তাল সেই সময়ে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘অনুশীলন তত্ত্বে’র প্রেরণায় জন্ম নিয়েছিল ‘অনুশীলন সমিতি’। দেশাত্মবোধ আর শরীর গড়ার আখড়ার আড়ালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের বীজ বপন করার কাজ শুরু করেছিল অনুশীলন সমিতি। রচনা করেছিল বাঙালি অস্মিতার নয়া অধ্যায়। ইংরেজ জেনেছিল, বাঙালির ক্ষমতা, বাঙালির বীরত্ব। গোটা দেশ মেনেছিল—বাঙালি মানে লড়াই করে ছিনিয়ে আনা, হার না মানা জেদ।
স্বাধীনোত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালির সেই অস্মিতাকে খর্ব করার স্পর্ধা দেখানো শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে বাংলা ভাষার উপর সন্ত্রাস! এই আবর্তে বাঙালির বীরগাঁথা আর অনুশীলন সমিতির বিপ্লব অধ্যায়কে দেবী দশভুজার আবাহন মণ্ডপে উপস্থাপন করেছে দক্ষিণ কলকাতার নিউ আলিপুরের সুরুচি সংঘ। জননী, জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী—হাসিমুখে আত্মবলিদান, আত্মাহুতি! বাঙালির সেই আত্মবলিদানের স্মৃতি উসকে দিতেই সুরুচি সংঘের এবারের বিষয়-ভাবনা—আহুতি! স্বাধীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে যে কালকুঠুরিতে ভরে বিফল মনোরথ হতে হয়েছিল ওয়ারেন হেস্টিংস আর ক্লাইভের উত্তরসূরিদের, সেই কালকুঠুরি ব্রিটিশ আমলের এক কারাগারই সুরুচির মণ্ডপ। সংগ্রামের দিনগুলোতে যার দেওয়ালে দেওয়ালে রক্ত, ঘাম, রাগ আর দুঃখ লেপটে দামাল বাঙালিরা যা বানিয়েছিলেন আত্মাহুতির পীঠস্থান। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের কুকীর্তির সাক্ষী। লাল ইট আর চুন-সুরকিতে তৈরি পলেস্তরা খসে পড়া, ফাটল আর নোনা ধরা দেওয়ালের সেই কারাগার, দেবীর আবাহনস্থল! দেওয়ালজুড়ে অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত বাঙালি অরবিন্দ, বারীন ঘোষ, মাস্টারদা, প্রফুল্ল চাকি, বাঘাযতীন, কানাইলাল দত্ত, বিনয়, বাদল, দীনেশ, হেমচন্দ্র কানুনগো, উল্লাসকর দত্ত আর প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো আরও অনেকের বীরগাঁথা! মণ্ডপের মাঝে শহিদ ক্ষুদিরাম বসুর পূর্ণাবয়ব, তাঁর পিছনে ইংরেজ বিচারপতির কালাসনদ, ফাঁসির আদেশনামা। ঠিক পিছনের বেদিতে এক অশ্বত্থগাছ। পুজোর দিনগুলোতে এই বেদি থেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অগ্নিযুগের গান পরিবেশিত হবে বলে জানিয়েছেন সুরুচির কর্ণধার রাজ্য মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য অরূপ বিশ্বাস। বাঁশ আর প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে তৈরি হয়েছে সমগ্র মণ্ডপ। সুরুচির মাতৃমূর্তি চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী মৃন্ময়ী। উদ্যোক্তাদের দাবি, প্রতিমা দেখে দর্শকদের মনে হতে বাধ্য, এটা সেই মূর্তি, যা বিপ্লবীদের আরাধ্যা দেবীর শক্তিদায়িনী রূপ। -নিজস্ব চিত্র