অবতার শ্রীরামকৃষ্ণের অবতার লীলা সবটাতেই এমন একটা বিশেষত্ব আছে, যেটা অন্য অবতারে পাওয়া যায় না। এ যুগের অবতার রামকৃষ্ণ যেমন রঙের গামলার মতো বিভিন্ন রঙধারি, তেমনিই তাঁর সাধনা, সিদ্ধি, গুরুকুল, শিষ্য, শিষ্যা ও তাঁর ভাবপ্রচারক, ধারক ও বাহকরাও আগের জন্মে নানান অবতারের সঙ্গিরূপে স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছেন। এইটাই এ ‘রামকৃষ্ণ রঙের গামলা’র অদ্ভুত মহিমা। এই পর্যন্ত, সাক্ষাৎ ব্রহ্মশক্তি মা সারদা, নির্বিকল্প সমাধিনিষ্ঠ, অখণ্ডের ঘর ঘোর অদ্বৈতবাদী স্বামী বিবেকানন্দ এবং সাকার সমাধিনিষ্ঠ, যুগে যুগে শ্রীভগবানের খেলার (লীলার) সঙ্গী, স্বামী ব্রহ্মানন্দকে এই ‘রঙের গামলা’য় পেলাম। এইভাবে শ্রীশ্রীঠাকুরের সমস্ত সন্ন্যাসী, গৃহী সন্তান ও শিষ্য শিষ্যাদের পূর্বজন্মে এক এক অবতারের এক এক ভাবের বিভিন্ন রূপে এই ‘রামকৃষ্ণ রঙে’র গামলায় আমরা দেখতে পাব। তাঁদের বিষয়ে সবিস্তারে বর্ণনা ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গে’, ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-কথামৃতে’, ‘শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি’তে, ‘শ্রীশ্রীমায়ের কথা’য় ও শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তমালিকা’য় এবং বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়।
প্রথমে আমরা শ্রীরামকৃষ্ণ সন্ন্যাসী শিষ্যদের সম্পর্কে সংক্ষেপে বলব। স্বামী বিবেকানন্দ ও স্বামী ব্রহ্মানন্দ সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে। স্বামী নিরঞ্জনানন্দের বিষয়ে ঠাকুর বলতেন—“আলেখ নিরঞ্জন! নিরঞ্জন! আয় বাপ, খারে, নেরে, কবে তোরে খাইয়ে জন্ম সফল করব। তুই আমার জন্য দেহধারণ করে নবরূপে এসেছিস।” স্বামী নিরঞ্জনানন্দ শিশুকালে সব সময় তীর ধনুক নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন এবং তীর ধনুক নিয়ে খেলাধূলা করতেন—‘শ্রীরামচন্দ্রের অংশ’। এই নিরঞ্জনানন্দই সর্বপ্রথম শ্রীশ্রীমা সারদাকে ভক্তমণ্ডলীর সামনে সাক্ষাৎ জগদম্বারূপে চিনিয়ে দিয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের গলার অসুখের সময় কাশীপুরে তাঁর দ্বাররক্ষক হিসেবে ছিলেন এবং সে কর্তব্য তিনি অতি যোগ্যতার সঙ্গে পালন করেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দও যখন অসুস্থ, তখনও তিনি স্বামীজীর গৃহের দ্বাররক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। তাই সাক্ষাৎ শ্রীরামচন্দ্রের অংশ নিরঞ্জনানন্দ, এ যুগের শ্রীরামকৃষ্ণের ঈশ্বরকোটি সন্ন্যাসী শিষ্য।
স্বামী যোগানন্দজীও (যোগেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী)—ঠাকুরের নির্দিষ্ট আর এক ঈশ্বরকোটি। ঈশ্বরকোটির অর্থ হচ্ছে, এঁরা ভগবানের একটি অঙ্গ স্বরূপ, যুগে যুগে অবতারের ধর্মস্থাপনার কাজে সাহায্যের জন্য দেহধারণ করে আসেন। ইনি শ্রীশ্রীমা সারদার অত্যন্ত অনুগত মন্ত্রশিষ্য, মার সেবক। মা যোগানন্দ স্বামী সম্পর্কে বলতেন, ‘শ্রীশ্রীঠাকুরের কথায়, যোগেন আগের জন্মে কৃষ্ণসখা অর্জুন ছিলেন’। যোগীন মহারাজের সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন—আমাদের ভেতর যদি সর্বতোভাবে কেউ কামজিৎ থাকে, তো সে যোগীন।’ এইভাবে শ্রীরামকৃষ্ণ-গামলায়, শ্রীকৃষ্ণের সখা অর্জুন যোগানন্দ রূপে প্রকাশ পেলেন। স্বামী প্রেমানন্দজী (আঁটপুরের বাবুরাম ঘোষ) শ্রীরামকৃষ্ণের আর এক ঈশ্বরকোটি সন্ন্যাসী শিষ্য। শ্রীশ্রীঠাকুর বাবুরামকে প্রথম দর্শনেই চিনতে পেরেছিলেন যে, এই সেই বালক যাকে শ্রীশ্রী জগদম্বা নির্দেশ করেছিলেন, শ্রীরামকৃষ্ণের ঈশ্বরকোটি অন্তরঙ্গ শিষ্য বলে।
স্বামী সৎপ্রভানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ও রঙের গামলা’ থেকে