Bartaman Logo
১ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

বুঝে শুনে খরচ করুন সংসারে

কোন বয়সে কীভাবে সঞ্চয় করলে সংসার খরচের বোঝা কমবে? পরামর্শে অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার।

বুঝে শুনে খরচ করুন সংসারে
  • ২৪ মার্চ, ২০২৫ ১৬:০৩

কোন বয়সে কীভাবে সঞ্চয় করলে সংসার খরচের বোঝা কমবে? পরামর্শে অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার।

Advertisement

 

গৃহস্থ মধ্যবিত্ত সবসময়ই চায় সংসার খরচ কমাতে। অনেকে মিতব্যয়ী হয়ে সেই পথে অগ্রসর হন, কেউ বা আয় ও ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে না পেরে কিছু ক্ষেত্রে অসুবিধায় পড়েন। কিন্তু কীভাবে সংসার খরচ চালালে আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে একটা ব্যালান্স আনা যায়, সেটা বেশ হিসেব কষে করা দরকার। আমার বিশ্বাস, এই হিসেব গৃহিণীই সবচেয়ে ভালো করতে পারেন। অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি কিছু পরামর্শ দিতে পারি মাত্র। 
     এক্ষেত্রে প্রথমেই সংসার খরচের কয়েকটা স্তর ও ধাপ ভাগ করে নেওয়া যাক। অল্পবয়সি দম্পতি, মধ্যবয়সি দম্পতি ও বয়স্ক (অবসরপ্রাপ্ত) দম্পতি। এই যে ভাগ, এদের জীবনধারণ ও খরচের নিয়ম সবই কিন্তু আলাদা। তার কারণ জীবনের প্রথম থেকে শেষ আমাদের কিছু প্রায়োরিটি সেট করা থাকে। সেই অনুযায়ী আমরা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগই।  
হিসেব কষা শুরু করুন অল্প বয়স থেকেই
একদম গোড়া থেকেই শুরু করি। যারা অল্পবয়সি দম্পতি, তারা কীভাবে নিজেদের সংসার খরচ আয়ত্তের মধ্যে রাখবেন? আজকাল জীবনের একটা নিয়ম এসেছে। আগের তুলনায় এই নিয়মটা একেবারেই ভিন্ন। এখনকার প্রজন্ম প্রথম থেকেই ‘ভোগবিলাস’-এ বিশ্বাসী। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলে ‘কনসাম্পশন’। আগে কী হতো, সারা জীবন রোজগার করে টাকা জমিয়ে প্রায় শেষ বয়সে এসে মধ্যবিত্ত বাড়ি কিনতেন, গাড়ি কিনতেন। কিন্তু জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে গাড়ি বা বাড়ি কিনলেও অধিকাংশই সেটা ভোগ করতে পারতেন না। তবু এটাই ছিল জীবনের প্রতি তাঁদের আউটলুক বা দৃষ্টিভঙ্গি। এখন সেটাই একেবারে বদলে গিয়েছে। এখনকার মধ্যবিত্ত প্রজন্ম মনে করে অল্পবয়সেই জীবনটা ভোগ করে নেওয়া প্রয়োজন। তার ফলে তারা চাকরির গোড়াতেই বাড়ি/ফ্ল্যাট, গাড়ি কিনে নেয়। কিন্তু চাকরির গোড়াতে যেহেতু কারও হাতেই বিশেষ টাকা থাকে না, তাই মধ্যবিত্ত এখন ঋণ নিয়ে এইসব কমোডিটি কেনার দিকে এগয়। অর্থনীতি বলে, এটাই শ্রেষ্ঠ ও দক্ষ ব্যবস্থা। কারণ সারাটা জীবন অতিবাহিত হওয়ার পর যদি প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করা হয় তাহলে তো সেটা নিজের ভোগ করার আর সামর্থ্য থাকে না। ফলে তখন সেই খরচটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। অতএব অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি বলব যে এখনকার প্রজন্মের জীবনধারণের ভাবনা একদম সঠিক। এই ধরনের বিনিয়োগের ফলে দেশের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো উন্নত হয় এবং নাগরিক হিসেবেও আমরা উপকৃত হই। 
এই যে ঋণ নেওয়া বা সহজ ভাষায় ধার করা, তার আবার কিছু নিয়ম রয়েছে। তার মধ্যে প্রথম হল, ধারের অঙ্কটা হিসেব করে নির্ধারণ করা। অর্থাৎ বাড়ি বা গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে যে ঋণ নেব, সেটার পরিমাণ কতটা হতে পারে। এটা কিন্তু নিজের রোজগারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই করতে হবে। এক্ষেত্রেও আবার রোজগারের দুটো ভাগ। প্রথম যাঁরা সরকারি চাকরি করেন এবং দ্বিতীয় যাঁরা বেসরকারি চাকরি করেন বা নিজস্ব ব্যবসা করেন। সরকারি চাকুরেদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অনেকটাই নিশ্চিত। অর্থাৎ তাঁরা রোজগারের অঙ্কটা মোটামুটি জানেন। কেমন হারে মাইনে বাড়তে পারে, কোন বয়সে কেমন স্কেলে বেতন পাবেন এই বিষয়গুলো তাঁরা সহজেই হিসেব করে ফেলতে পারেন। ফলে তাঁদের পক্ষে ঋণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ। কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রটির পক্ষে ভবিষ্যৎটা অনেকটাই অনিশ্চিত। ফলে সেক্ষেত্রেই একটা অঙ্ক কষে সংসার খরচ করা উচিত। 
দ্বিতীয় ক্ষেত্রটির কয়েকটা জিনিস মাথায় রেখে চলতে হবে। 
 প্রথমত ধার বা ঋণ নেওয়ার সময় কাদের থেকে ঋণ নিচ্ছেন, সেটা ভাবা দরকার। খুব বিশ্বাসযোগ্য সংস্থার কাছেই ঋণের আবেদন করা উচিত। যেমন ব্যাঙ্ক, জীবনবিমা ইত্যাদি। এই ধরনের সংস্থার কাছে ঋণ নিলে যিনি তা নিচ্ছেন তাঁর যেমন শোধ করার একটা দায় থাকে, ঠিক তেমনই ব্যাঙ্ক বা জীবনবিমারও তা ফেরত পাওয়ার সমান দায় থাকে। ফলে তারা রোজগারের ভিত্তিতে অঙ্ক কষে ঋণের অর্থ নির্ধারণ করে দেয়। তাতে যিনি ঋণ নিচ্ছেন তাঁর অনেকটাই সুবিধে হয়। হাতে যতটা মাইনে পাওয়া যায় (নেট ইনকাম) তার উপর ভিত্তি করে ঋণের অঙ্কটা নির্ধারিত হয়। ফলে এই ধরনের ঋণ নিলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা কম থাকে।  
 কিছু সংস্থা রয়েছে যারা বিশাল অঙ্কের ঋণ দিতেও প্রস্তুত থাকে। অনেকেই বলে, কাগজপত্র (ডকুমেন্ট) ছাড়াই ঋণ দিয়ে দেবে। কেউ বা বলে বাড়ি থেকে কাগজপত্র সই করিয়ে একদিনে লোন স্যাংশন করে দেবে। কিন্তু এই ধরনের সংস্থার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা উচিত নয়। কারণ এই ধরনের সংস্থায় ঋণের বিরুদ্ধে কিছু ‘হিডেন ক্লজ’ (গোপন শর্ত) থাকে যেগুলো আপাতভাবে মধ্যবিত্তর চোখে পড়ে না। পরে  এইগুলোই বিপদে ফেলতে পারে। সেক্ষেত্রে যেখান থেকে ঋণ নিচ্ছেন তার আদ্যোপান্ত জেনে তবেই ঋণ নেওয়া উচিত। 
 ধার করার সময় খুব চেনাজানা জায়গা থেকে ধার করুন। তাতে হয়তো ঋণ নিতে কিছু অতিরিক্ত ঝক্কিও পোহাতে হতে পারে, তবু সেটাই পরবর্তীকালে ফলপ্রসূ হয়। 
এবার রোজগারের একটা অংশ ঋণের কিস্তি শোধ করতে চলে গেল। বাকি অন্তত স্বামী-স্ত্রী মিলিয়ে যদি হাতে হাজার কুড়ি বা পঁচিশ টাকা থাকে, তাহলে সেখান থেকে সংসার খরচের কিছু ভাগ আগে থেকেই করে নিতে হয়। যেমন বাজার খরচ, ইলেক্ট্রিক বিল, গ্যাস ইত্যাদি। সেই খরচগুলো করার পর মাসে অন্তত হাজার পাঁচেক টাকা যদি বাঁচানো যায় তাহলে বুঝতে হবে খুব সুন্দর করে সংসার খরচ সামলানো গিয়েছে। এই হিসেব দম্পতি সবচেয়ে ভালো করতে পারবেন। তবে ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘Cut your coat according to your cloth.’ এটা সংসার খরচের ক্ষেত্রে ভীষণভাবে প্রযোজ্য। যেমন রোজগার, তেমনই খরচের পরিমাণ হওয়া দরকার।
মাঝবয়সে জমানোর অঙ্ক বাড়িয়ে তুলুন
অল্পবয়সি দম্পতিদের ছেড়ে এবার একটু মধ্যবয়সি দম্পতিদের কথায় আসা যাক। প্রথম কথা যা এক্ষেত্রে বলার তা হল, মধ্যবয়সি দম্পতিদের জীবনে অনিশ্চয়তার মাত্রা অনেকটাই কম। কারণ মোটামুটি পঞ্চাশ বা তার আশপাশের দম্পতিদের যদি মাঝবয়সি ধরা যায় তাহলে বলব, ইতিমধ্যে তাদের বছর পনেরো থেকে কুড়ি চাকরি জীবন পেরিয়ে গিয়েছে। জীবনে কিছুটা অ্যাসেট (ক্যাশ বা কাইন্ড) তারা জমিয়েও ফেলেছে। সন্তান থাকলে তারও একটা দূর পর্যন্ত পড়াশোনা এগিয়ে গিয়েছে। রোজগারের মাত্রাটাও মোটামুটি একটা আয়ত্তে এসে গিয়েছে। অন্তত বোঝা হয়ে গিয়েছে যে তা কতদূর এগতে পারে। ফলে জীবনধারণের ক্ষেত্রে তারা অনেকটাই নিশ্চিত। এইবার প্রশ্ন হল সন্তানের পড়াশোনা কেমনভাবে করানো যেতে পারে। অনেকেই ছেলেমেয়েকে একটু বেশি ভালো জায়গায় পড়ানোর জন্য ‘এডুকেশন লোন’ নেন। সেক্ষেত্রে যেটা দেখার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার তা হল কতটা ঋণ নেবেন। কিন্তু এরও আবার একটা ব্যাপার আছে। এই যে এডুকেশন লোন, সেটা শোধ দেওয়ার দায়িত্ব কিন্তু পুরোপুরি মধ্যবয়সি দম্পতির নয়। বরং সেই ধারটা ভাগ হয়ে যায় বাবা মা এবং সন্তানের মধ্যে। বিদেশে এই প্রথাটা চালু আছে। বাবা মা কলেজ স্তরের প্রাথমিক ভর্তির খরচটা বহন করে দেন, তারপর বাচ্চা পড়াশোনা শেষে চাকরি করে বাদবাকি টাকাটা শোধ করে। এবং সেই টাকার অঙ্কটাই সিংহভাগ। আমাদের দেশে এই প্রথা এখনও খুব একটা কমন বা সর্বজনবিদিত নয়, কিন্তু ক্রমশ আমাদের সমাজব্যবস্থা ও মনোভাব সেদিকেই যাচ্ছে। এবং সেটা একঅর্থে ভালোই বলব, এতে অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে সন্তানের মধ্যেও একটা দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা জন্মায়। যাই হোক, এখনও আমাদের দেশে এই সিদ্ধান্তটা অনেক ভেবেচিন্তে নিতে হবে। 
এর মধ্যেও আবার কিছু টেনশন কাজ করে, যেমন সন্তানের পড়াশোনার পর যদি চাকরি পেতে খুব দেরি হয় তাহলে বাবা মায়ের টেনশন হয় বইকি। আমার মতে একটা হিসেব এক্ষেত্রেও কষা প্রয়োজন। এবং সেটা ঋণ নেওয়ার সময়ই নির্ধারণ করে ফেলতে হবে। ঋণের ভালোমন্দ বিচার করে নিতে হবে। এবং খারাপের জন্য বাবা মাকে প্রস্তুতও থাকতে হবে।  যদি সন্তানের পড়াশোনার লোন খুব বেশি হয় তাহলে সন্তান তা চাকরি পেয়ে শোধ দেবে এমন ভাবনা থাকলেও বাবা-মাকে কিছু টাকা প্রতি মাসে বাড়তি জমাতে হবে। বিদেশি একটা কথা খুব চালু, ‘রেনি ডে ফান্ড’ অর্থাৎ বিপদে ব্যবহার করার পুঁজি। এই পুঁজিটা কিন্তু বাবা-মাকে এডুকেশন লোন শোধ দেওয়ার ক্ষেত্রেও মাথায় রাখতে হবে। 
এডুকেশন লোনের ক্ষেত্রে মাথায় রাখুন
 অকারণ খরচের মধ্যে যাওয়া নিরর্থক। সন্তানের ক্ষমতা অনুযায়ী তার উচ্চশিক্ষার বন্দোবস্ত করা উচিত। মধ্যম মেধার ছাত্রর পিছনে কতটা খরচ করব, আর উচ্চমেধার ছাত্রর পিছনে কতটা খরচ করব সেটা বাবা-মাকেই ভেবে নিতে হবে। 
 এছাড়া দেশের মধ্যেও যদি এমন কোনও কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে চান নিজের সন্তানকে, যেখানে খরচ প্রচণ্ড তাহলে সেখানে কোনও স্কলারশিপের ব্যবস্থা আছে কি না, এবং থাকলে তা কীভাবে পাওয়া যেতে পারে সে বিষয়েও বাবা মাকে ভালো করে জানতে হবে।
 সন্তানের কতটা ক্ষমতা সেটা বাবা মাকে নিরপেক্ষভাবে বুঝে নিতে হবে। তারপরই তার পড়াশোনার পিছনে খরচ করা উচিত। খরচটা অনর্থক হয়ে যাচ্ছে কি না সেটা জেনে, বুঝে তবেই শিক্ষা সংক্রান্ত ঋণ নেওয়ার কথা ভাবতে হবে। 
এখানে একটা জিনিস খুবই ভালোভাবে বুঝে নেওয়া দরকার। মধ্যবয়সি দম্পতিদের যেমন সংসারে একটা মজবুত অবস্থা রয়েছে, তেমনই তাদের চাকরি বা ব্যবসার ক্ষেত্রটাও কিন্তু ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে। সেদিকেও তাদের ভাবতে হবে। অর্থাৎ চাকরির মেয়াদ কমে আসবে, তার আর খুব একটা ওঠাপড়া সম্ভব নয়, এগুলো মাথায় রেখে তবেই খরচের হিসেবটা করতে হবে। 
এখানে দেখতে হবে নিজেদের জীবনধারণের ক্ষেত্রে কতটা ঋণ নেওয়া অছে। তার মধ্যে কতটা ঋণ শোধ দেওয়া হয়ে গিয়েছে। কতটা বাকি আছে। এরপর নিত্য সংসারে কেমন খরচ হচ্ছে। এই সবের পর হাতে কতটা টাকা থাকছে। সেই অনুযায়ী তাদের সন্তানের পড়াশোনার জন্য ঋণ নিতে হবে। এবং সব খরচের পরেও মাস গেলে অন্তত দশ থেকে পনেরো হাজার টাকা বাঁচছে কি না, সেটা দেখতে হবে। নাহলে কিন্তু পরবর্তী জীবনে খুবই টানাটানির মধ্যে পড়তে হবে।
মাঝবয়সি দম্পতিরাই কিন্তু সংসারে বেশি দক্ষ। ফলে তাঁরা চাইলেই সংসার খরচে রাশ টানতে পারেন। কারণ মোটামুটি দশ থেকে পনেরো বছরের সংসারের পর কোথায় বেশি টাকা ব্যয় করবেন আর কোথায় কমাবেন, তা বোঝা যায়। এবং সেই অনুযায়ী সংসার খরচটা একটু একটু করে কমিয়ে ফেলতে পারলে আখেরে লাভ আপনারই।
বয়স্ক দম্পতিরা সচেতনভাবে টাকা খরচ করুন
এবার আলোচনার শেষ পর্যায়ে আসা যাক। অবসরপ্রাপ্ত দম্পতিরাই এক্ষেত্রে আলোচিতব্য। এই ধরনের দম্পতিদের দু’ভাগে ভাগ করে নিচ্ছি। প্রথম যাঁদের পেনশন আছে, আর দ্বিতীয় যাঁদের পেনশন নেই। পেনশন যাঁদের আছে, তাঁদেরও আবার দুটো ভাগ। যাঁরা ব্যাঙ্কের পেনশন পান, তাঁদের কিন্তু সেই টাকাটা খুব একটা বাড়ে না। অর্থাৎ পেনশনের গোড়ার দিকে তাঁরা যেমন টাকা পেতেন, দশ বছর পরেও তেমনই টাকা পান। এঁরা একটু অসুবিধের মধ্যে পড়েন। এবং তাঁদের অবস্থাটা পেনশনহীন শ্রেণির মতোই। এই ক্ষেত্রে আয়ের একটা বিকল্প পথ খোলা রাখতে হবে যেটা চাকরির পরেও তাঁদের সাহায্য করবে। পেনশনহীন লোকেদেরও এই একইভাবে প্ল্যান করতে হবে। এমন ক্ষেত্রে কিছু ‘ডেফার্ড অ্যানুয়িটি প্ল্যান’ আছে। অর্থাৎ অবসরের সময় প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি বাবদ যে থোক টাকাটা পাওয়া গেল, সেটার একটা অংশ ওই প্ল্যানে জমিয়ে ফেলা যেতে পারে। এতে কী হবে, প্রথম কয়েক বছর হয়তো আলাদা করে বিশেষ লাভজনক অর্থ পাওয়া যাবে না, কিন্তু কয়েক বছর বাদে ওই টাকা থেকেই একটা ভালো অঙ্কের সুদ পাওয়া যাবে। সেই সুদের টাকাটা তখন তাঁর বাড়তি রোজগারের মতো তাঁকে সাহায্য করবে। অর্থাৎ থোক টাকার এক অংশ জমিয়ে তিনি যেমন সুদ পাচ্ছিলেন তা তো পাবেনই, উপরন্তু ডেফার্ড ইনকাম প্ল্যানে টাকা জমিয়ে আরও কিছু বাড়তি সুদও পেতে শুরু করবেন যাতে তাঁর জীবন অবসরের পরেও বেশ স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে থকবে। 
এছাড়া বয়স্ক দম্পতিদের একটা বড় খরচ রয়েছে অসুখবিসুখ ও স্বাস্থ্যবিমা বাবদ। সেই খরচটা খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। দৈনন্দিন ওষুধের খরচ যেহেতু আমাদের লাইফস্টাইলে মোটামুটি মধ্যবয়স থেকেই শুরু হয়ে যায়, তাই তার একটা হিসেব আমাদের জীবনের মধ্যেই চলে আসে। আর স্বাস্থ্যবিমার ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম বয়সের সঙ্গেই বাড়তে থাকে। অনেক সময় সেটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়। কিন্তু আমি বলব কষ্ট করে হলেও হেলথ ইনসিওরেন্স চালু রাখাই শ্রেয়।
মধ্যবয়স থেকে এমনকী চাকরির গোড়ার দিকেও আজকাল অনেক সংস্থা নানারকম পেনশন স্কিমের কথা বলে। সেই স্কিমে টাকা নিয়োগ করার পরামর্শ দেয়। এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি, এই স্কিমগুলো সবই কিন্তু স্টকমার্কেট নির্ভর অর্থাৎ বাজারের উপর নির্ভর করে বাড়ে বা কমে। ফলে এমন ক্ষেত্রের উপর পুরোপুরি নির্ভর করা উচিত নয়। কারণ বাড়লে তো খুবই ভালো কিন্তু হঠাৎ পড়ে গেলে বিপদে পড়তে হবে। ফলে রিটায়ারমেন্টের টাকার একটা অংশ যদিও বা এই ধরনের স্কিমে জমানো যায়, বেশিটাই ফিক্সড ডিপোজিট-এর মতো খাতে জমানো উচিত যার থেকে একটা নির্দিষ্ট সুদ পাওয়া যেতে পারে। যা বাড়বে-কমবে না। 
সংসার খরচের ক্ষেত্রে কয়েকটা জিনিস একদম গোড়া থেকেই ভেবে নিতে হয়।
 দূরদৃষ্টি বজায় রেখে অল্প বয়স থেকে খরচ করার উচিত। খরচের মাত্রা ততটাই হবে যতটা আমার সাধ্যের মধ্যে। ঋণ করলেও সেই ঋণের বোঝা যেন কখনওই বিপদসীমার উপর দিয়ে না যায়, সেটা বিবেচনা করে তবেই ঋণ করতে হবে। 
 চাকরির মেয়াদের মধ্যেই ঋণ শোধ হয়ে যাবে এই হিসেবেই ঋণ করতে হবে। ঋণ শোধের কিস্তি যাতে ক্রমশ কমতে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। 
 বয়সকালে অসুখ হবে, তখন খরচের কথা ভাবা    যাবে— এই নিয়মে ভাবনাচিন্তা বাঁধলে হবে না। বিপদ যে কোনও মুহূর্তে আসতে পারে সেটা ভেবে কাজ করতে হবে। 
 প্রথম জীবনে একটু মিতব্যয়ী হয়ে খরচ করা ভালো।
 খুব ভালোভাবে সঞ্চয়ের দিকেও নজর দেওয়া দরকার। এমনভাবে সঞ্চয় করতে হবে যাতে অবসরে সেই সঞ্চয়ের টাকা থেকে প্রাপ্ত সুদ কাজে লাগে। অল্পবয়সে, চাকরির গোড়ার দিকে অনেক সংস্থা চড়া সুদের আশ্বাস দিয়ে টাকা লগ্নি করতে বলে। কিন্তু আমার মতে, বিশ্বস্ত সংস্থা ছাড়া কারও কাছেই টাকা লগ্নি করা উচিত নয়। 
 সাংসারিক খরচের মধ্যে কয়েকটা ভাগ করে নিন। ‘নেসেসারি’ আর ‘লাক্সারি’ এই দুটো খাতে সংসার খরচ ভাগ করুন। রোজকার খরচগুলো নেসেসারি-র খাতে রাখুন। তার মধ্যে বাজার খরচ, ইলেকট্রিক বিল, গ্যাস, ওষুধের খরচ, বাচ্চার পড়াশোনা ইত্যাদি থাকবে নেসেসারি খরচের আয়ত্তে। আর বেড়ানো, বাইরে খাওয়া, বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে নেমন্তন্ন করা এইগুলো থাকবে লাক্সারি খরচের আওতায়। সংসার খরচ কমানোর ক্ষেত্রে লাক্সারি খরচ থেকে কাটছাঁট করতে হবে। 
 প্রথম বয়সে বেড়ানোর খরচ একটু কমান। বন্ধুবান্ধব সমাগমের ক্ষেত্রে নিজের সাধ্যমতো খরচ করুন। 
 উপহার বাঙালি মধ্যবিত্তর জীবনে একটা বড় খরচ, সেটাকে আয়ত্তে রাখার চেষ্টা করুন। 
 ইলেকট্রিক বিলের ক্ষেত্রে সচেতনভাবে বৈদ্যুতিন জিনিসপত্র ব্যবহার করুন। ঘরের পাখা আলো, এসি সবই মেপে খরচ করুন। 
সবচেয়ে জরুরি কথা, অযথা খরচ করবেন না। যেটা না হলেও চলে তা বাদ দিয়েই চলুন।          
এইভাবে হিসেব কষে চললে সংসার খরচ আয়ত্তে রাখা এবং সঞ্চয় বাড়িয়ে তোলা খুব একটা কঠিন বিষয় নয়।  
অনুলিখন: কমলিনী চক্রবর্তী

সম্পর্কিত সংবাদ