


পরমেশ বন্দ্যোপাধ্যায় (ভূতত্ত্ববিদ): কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন নেপালে রয়েছি। কিন্তু এই নেপাল আমার অচেনা। এত বছর যে শহরকে চোখের সামনে দেখেছি, এক লহমায় তা যেন আমূল বদলে গিয়েছে। কাঠমাণ্ডুর বাড়ির বারান্দায় বসে দেখলাম, গোটা শহর জ্বলছে।
গত ৯ তারিখ সকালে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার কথা ছিল। বিমানবন্দরও খোলা ছিল। সেইমতো সকালে কাঠমাণ্ডু বিমানবন্দরেও পৌঁছে গিয়েলাম। বোর্ডিং পাসও দিয়েছিল। হঠাৎ খবর এল, কোনও ফ্লাইট নামতে দিচ্ছে না। তখন থেকেই উত্তেজনার শুরু। একে একে সমস্ত বিমানসংস্থাগুলি পরিষেবা বাতিল করতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এল সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার। গুজব ছড়াল, ওলি ওই কপ্টারে চেপেই চলে যাচ্ছেন। সত্যি-মিথ্যে জানি না। আমার উড়ান ছিল নেপাল এয়ারলাইন্সের। ওদের তরফে কোনও ঘোষণা করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিকেল পাঁচটা নাগাদ আমি নিজেই বেরিয়ে এলাম। তখন বিমানবন্দরের বাইরে আন্দোলনকারীদের দৌরাত্ম্য শুরু হয়েছে। কিছু প্রতিবাদী বিমানবন্দরেও প্রবেশ করেছে। পরে আবার তাঁরা বেড়িয়েও যায়।
কোনওমতে একটি বাইক ভাড়া করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। রাস্তায় দেখলাম, আন্দোলনকারীরা বাইকে চেপে স্লোগান দিচ্ছে। কোনওমতে বাড়ি পৌঁছলাম। খবর পেলাম, পুলিস গুলি চালিয়েছে। বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী প্রাণ হারিয়েছেন। সারা সন্ধ্যে কাটল ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে বসে। দেখলাম, প্রতিবাদের আগুনে গোটা শহর জ্বলছে। বড় বড় বিল্ডিং, মূলত সরকারি দপ্তরগুলিকে ধ্বংস করেছেন আন্দোলনকারীরা। তবে সাধারণ কোনও মানুষকে কেউ আক্রমণ করেছেন, এমনটা কোথাও দেখিনি। শুনলাম, কোনও এক মন্ত্রীর সঙ্গে সংযুক্ত শপিং চেইনও ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি জটিল বুঝে একজন ট্রাভেল এজেন্টের কাছ থেকে নেপাল সীমান্তে ভদ্রপুরের জন্য ডোমেস্টিক ফ্লাইটের টিকিট কাটলাম। বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দেখি গোটা শহর সেনার দখলে। রাস্তাঘাট অনেকটাই পরিস্কার। কিন্তু বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য কোনও গাড়ি পাচ্ছিলাম না। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীকে অনুরোধ করায় তাঁরাই ব্যবস্থা করে দেন। সেই গাড়িতে বিমানবন্দরে এসে বিমানে ভদ্রপুর পৌঁছলাম। প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেছি নদীর উপরের সেতু হেঁটে পার হলাম। ওপারে ভারতের চেকপয়েন্ট। সেখানেও লম্বা লাইন পড়েছে। প্রায় দু’ঘণ্টা সময় লাগল। ওখানে কাজ শেষে গাড়িতে চেপে বাগডোগরা বিমানবন্দরে এলাম। সেখান থেকে শ্রীলঙ্কা যাব। কাজের সূত্রে আবার নেপালে ফেরার কথা রয়েছে। কিন্তু সীমান্ত না খুললে তো সেটা সম্ভব নয়। আপাতত শান্তি ফেরার অপেক্ষায়।