শান্তনু দত্ত, কলকাতা: একদিকে এসআইআরে অনেকের নাম বাদ। অন্যদিকে ‘রূপান্তরকামী অধিকার সংক্রান্ত সংশোধনী আইন, ২০২৬’ এর নাগপাশ। এই জোড়া ফলায় জর্জরিত এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের মানুষ। এবার ভোটে ইভিএমে এর শোধ নিচ্ছেন তাঁরা। বঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফাতে জবাব দিয়েছেন। দ্বিতীয় দফার আগেও এই সম্প্রদায়ের পণ—‘নো ট্রান্স ভোট টু বিজেপি’।
পরিবার, পরিজন, সমাজ... প্রতিক্ষেত্রে লড়াই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে তাঁদের জীবনের সঙ্গে। বাংলার রূপান্তরকামী, রূপান্তরিত, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সমস্যার অন্ত নেই। তাঁদের কারও নাম পরিবর্তন হয়েছে। কেউ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করিয়েছেন। আবার কেউ পরিবার থেকে বিতাড়িত। ফলে নথিপত্রের নাম শুনলেই সিঁদুরে মেঘ দেখেন তাঁরা। তাই এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হতেই বিপদের আশঙ্কা করেছিলেন অনেকে। তাই হল বাস্তবে, কাগজে-কলমে। নির্বিচারে কাটা পড়ল এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের বহু মানুষের নাম। এই হয়রানির সঙ্গে দোসর মোদি সরকারের রূপান্তরকামী অধিকার সংক্রান্ত সংশোধনী আইন। এই আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে নিজেকে রূপান্তরকামী ঘোষণা করতে পারবেন না। ট্রান্সজেন্ডার তকমা পেতে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দাখিল করতে হবে। অর্থাৎ? কে নিজেকে রূপান্তরকামী হিসাবে পরিচয় দেবেন, তা ঠিক করে দেবে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র অর্থাৎ বিজেপি সরকার। এই হয়রানি, এই অবিচারের জবাব দিতে ফুঁসছেন রূপান্তরকামীরা। সে সুযোগ এবার পাচ্ছেন তাঁরা। ইভিএমে জবাব দিয়েছেন। ২৯ তারিখও দেবেন। সমাজমাধ্যমে লাগাতার ‘নো ট্রান্স ভোট টু বিজেপি’ প্রচার চলছে। নাগরিক অধিকার কর্মী রূপান্তরকামী অনুরাগ মৈত্রেয়ী বললেন, ‘ট্রান্স অ্যাক্ট আর এসআইআরকে বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া হিসাবে দেখার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ওটা আসলে সুরক্ষিত করার নামে রূপান্তরকামী মানুষদের বিলোপ করা, মুছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকায় যেমন নীতি নিয়েছেন, মোদি সরকারও সেই নীতির অন্ধ অনুসরণ করে চলেছে।’ এর সঙ্গে অনুরাগ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘উত্তরপ্রদেশে প্রতি আড়াই ঘণ্টা অন্তর একটি করে ধর্ষণ হচ্ছে, তারপরও বিজেপিকে ভোট দেওয়া হবে?’ রূপান্তরিত মহিলা অধ্যক্ষ মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘এখনও পর্যন্ত রূপান্তরকামীদের জন্য কী কী করেছে রাষ্ট্র? কিছুই তো করেনি।’
প্রসঙ্গত, সমকামী-রূপান্তরকামী মানুষদের প্রতি বিজেপি সরকারের বিরূপ মনোভাবের পরিচয় মেলে সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে রাখা সওয়াল থেকেই। ২০২৩ সালে সমলিঙ্গের বিয়েকে ‘শহুরে উচ্চবিত্ত ধারণা’ হিসাবে উল্লেখ করেছিল কেন্দ্র। যা অবশ্য খারিজ করেছিল শীর্ষ আদালত। সেই বিজেপির বিরুদ্ধে আওয়াজ প্রত্যেকের কাছে পৌঁছে দিতে কেবল সমাজমাধ্যম নয়, বিভিন্ন কর্মসূচিও নিয়েছেন এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের মানুষ। প্রেস কনফারেন্স থেকে পথসভা, বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য বাদ রাখা হয়নি কোনো মঞ্চই। বক্তব্য, সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁদের উপস্থিতি হয়তো অত্যন্ত নগণ্য। তবে আওয়াজ যে বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যায়। তা দিচ্ছেনও সমাজের প্রান্তিক এই মানুষগুলি। শিখণ্ডীর সামনে যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্রত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন পিতামহ ভীষ্ম। কথায় কথায় রামায়ণ-মহাভারত আওড়ানো বিজেপি নেতারা নিশ্চয় তা ভোলেননি।