


পাহাড়ে পাহাড়ে সবুজের উৎসব। আকাশে নীল-সাদা তুলির আঁচড় দেখা যায় শেষ আলোর রেখা দেখা অবধি। সন্ধেবেলায় আকাশ যেন আবির রাঙা। পাহাড়ের কোলে মিটমিট করে জ্বলছে গ্ৰাম্য বাড়ির আলো। বেশ কিছু সময়ের জন্য আমাদের মনের দুঃখ, কষ্ট, উদ্বেগগুলো নিজের থেকে হারিয়ে যায় কোন সুদূরে। মিজোরাম-এর অর্থ ‘পাহাড় জাতির ভূমি’। প্রকৃতির অকৃত্রিম ভালোবাসা ছড়িয়ে আছে এখানকার প্রতিটি জনপদে।
আইজল লেংপুই এয়ারপোর্ট খুবই ছোট। যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে। এয়ারপোর্টের অনুমোদন পেরিয়ে সেখান থেকে শহরের প্রাণকেন্দ্রে এসে পৌঁছতে সময় লাগল আরও ঘণ্টা খানেক। গাড়ি থেকে নেমেই দেখতে পেলাম এমারেল্ড হোটেল। চেক ইন সাঙ্গ হলে, ফ্রেশ হয়ে রিসেপশনে যোগাযোগ করতে ওঁরাই গাড়ি ও দ্রষ্টব্য স্থান বিষয়ে জানালেন।
পরের দিন সকালে প্রাতরাশ সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। তারপর যে দৃশ্যপট চোখের সামনে আসতে থাকল, লালমোহনবাবুর ভাষায় তাই বোধহয়,‘স্তব্ধভাষ রুদ্ধশ্বাস বিমুগ্ধ বিমূঢ় বিস্ময়’।
প্রথম গন্তব্য ছিল আইজল শহর কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে লালসাভুঙ্গা পার্ক। ১২০ একর জমির উপর তৈরি এই পার্কটি এক কিলোমিটার বিস্তৃত পাহাড়ের ঠিক মাঝখানে। দু’টি ঝুলন্ত কাঠের সাঁকো পেরিয়ে যত উপরে উঠছি ততই নিজেকে খুদে মনে হচ্ছে। জঙ্গলের গাছগুলো সূর্যের তীক্ষ্ণ আলোর সঙ্গে লুকোচুরি খেলে চলেছে। ওখানকার এক স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে আলাপ হল। তিনিই বললেন পুরাণমতে মিজোরামের উৎপত্তির গল্প। সে অনেক আগেকার কথা। দুই জনজাতির মধ্যে ভীষণ গণ্ডগোল বাঁধে। কেউ কারও আধিপত্য মানতে নারাজ। এর ফলে মিজো দেবতা ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি মনে করলেন এই বিবাদ থামাতে হলে একত্রে সকলের অবাধ প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। তা করতে উনি একটি বড় শিলা বা পাথর দিয়ে দরজা বানিয়ে ফেললেন। অনেকেই মনে করেন চিং শিলা নামের সেই পাথর থেকেই মিজোরামের উৎপত্তি।
আমাদের ড্রাইভার কাম গাইডের কথামতো আমাদের পরের গন্তব্য স্থল সলোমন টেম্পল। খাড়া পর্বত আর সবুজের সমারোহকে পিছনে ফেলে আমরা এগিয়ে চলতে লাগলাম। নীল পর্বতমালা আর তার চিত্রানুগ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে। এখানে যেন লাল, নীল, সবুজ ফুলের মেলা বসেছে। তার মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ১৯৮৪ সালে স্থাপিত চার্চটি। অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও খ্রিস্টান সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
হোটেলের উদ্দেশ্যে ফেরার পথ ধরলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল অর্ধসমাপ্ত রেললাইন। মিজোরামের নিজস্ব সীমানায় কোনও রেল যোগাযোগ নেই। আইজল থেকে ৮ ঘণ্টা ড্রাইভ করে শিলচর পৌঁছে সেখান থেকে ট্রেন ধরতে হয়।
পরের দিন ভোর থাকতেই বেরিয়ে পড়লাম। ড্রাইভার বললেন, ১৯৬৬ সালে ভারতের থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করেছিল মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট। ১৯৮৬ সালে ভারত সরকারের সঙ্গে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে গঠিত হয় নতুন রাজ্য মিজোরাম। আমাদের ড্রাইভার সাহেবের বাবা মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পৌঁছে গেলাম মিজো গ্ৰামে। বাঁশ ও খড়ের ছাউনি দেওয়া গোটা দশেক ছোট ছোট ঘর। প্রতিটি ঘরে মিজোদের যাপনচর্চার ছবি দেখতে পাওয়া যায়। যেহেতু গ্ৰামটি জনবসতিহীন তাই এটিকে একটি সংগ্ৰহশালাও বলা চলে।
এরপর গাড়ি যতই এগচ্ছে ততই দু’পাশে দেখা যাচ্ছে পাথরের স্তূপ ছোট ছোট পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামল রাস্তার ধারে। ড্রাইভার বললেন, সামনেই ভানতাওং ফলস। দু’ধারে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বেশ কিছু সিঁড়ি নামলেই দেখা যায় পাথরের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে সফেন সতেজ জলধারা। পাহাড়প্রমাণ এক ভৃগুর উপর থেকে লাফিয়ে পড়ছে অতিকায় দানবের মতো জলরাশি। আমাদের উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনাকেও নীরব করে রেখেছে সেই উচ্ছল প্রাণবন্ত জলরাশি। শেষ প্রান্ত শান্ত সুবোধ বালকের মতো ধীর লয়ে বহমান। শিশুদের জলক্রীড়া করতে দেখে অবাক হলাম।
এর পাশে দেখা যায় খাওতলা ফলস। বিস্তৃত বনাঞ্চলের মধ্যে জল পড়ার শব্দ। নির্জনতা জমাট বেঁধেছে অরণ্যের আনাচকানাচে। পাহাড় থেকে সমতলে নামছে গাড়ি। শহরের রাজপথে নেই কোনও গাড়ির হর্নের আওয়াজ। নেই কোনও মিটিং মিছিলের কলতান। পিঁপড়ের মতো সারিবদ্ধভাবে গাড়ি চলে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকানে মিজোদের তৈরি বিভিন্ন ধরনের বাঁশের ঝুড়ি, টুপি, বাসন, গহনা, ঘর সাজানোর জিনিস বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি দোকানেই বিক্রেতা কিন্তু মহিলা। পাশাপাশি কাঠের বাড়ির প্রতিটি ঘরের জানলাই অর্কিড দিয়ে সুশোভিত। সারাদিন কাটানোর পর শরীর জানান দিল এবার বিশ্রামের প্রয়োজন।
মিজোরামে উপরি পাওনা বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিবার জিওনা চানার সদস্যদের সঙ্গে আলাপ পরিচয়। তিনি ৩৯ জন স্ত্রী, ৯৪ জন সন্তান ও ৩৩ জন নাতি-নাতনি নিয়ে একটি বিশাল বাড়িতে থাকতেন। ২০২১ সালে জিওনা চানা মারা যান। বাড়ির অন্যান্যরা রয়েছেন তবে ওঁরা ক্যামেরাবন্দি হাতে নারাজ।
ওইদিনই সবুজে ঘেরা ফকল্যান্ড পার্ক, কর্কটক্রান্তি রেখার ভিউ পয়েন্ট, রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামও দেখেছিলাম। এবার ফেরার পালা। মনে তৈরি হল ভালোলাগার কোলাজ। ঘন সবুজ উপত্যকা, মেঘে ঢাকা পাহাড় চূড়া, কোলাহলহীন নীরব শহর, ভারতের উত্তর পূর্বের আইজল তৎসহ গোটা মিজোরাম এক আদর্শ গন্তব্যের রূপ নেয়।
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে বিমানে সরাসরি আইজল পৌঁছতে পারেন। অথবা ট্রেনে শিলচর নেমে সেখান থেকে গাড়িতেও যেতে পারেন। এছাড়া এখন অবশ্য আইজলের কাছে সাইরাং পৌঁছনো যায় ট্রেনে।
তবে সপ্তাহে রোজ এই ট্রেন পরিষেবা নেই। কবে যাত্রা করছেন তার উপর নির্ভর করবে। থাকার হোটেল রয়েছে অনেক।
রাখি মজুমদার
ছবি: লেখক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা