মৃণালকান্তি দাস: শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড, অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর নতুন করে বোঝা গেল সে-দেশের রাজনৈতিক সংকট কতটা তীব্র। এটা আরও স্পষ্ট হল, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বৈরাচারী নির্দেশিকায়। যেখানে ফতোয়া জারি করা হয়েছে, হাসিনার কোনও মন্তব্য প্রকাশ করতে পারবে না বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম।
হাসিনার বিচার প্রক্রিয়ায় বিচারপতিরা প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায় পড়ে শুনিয়েছেন। পাঁচটি অভিযোগের ক্ষেত্রে মোট তিনটি ধারায় শেখ হাসিনার দোষ প্রমাণিত হয়। পাশাপাশি, বাংলাদেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং প্রাক্তন পুলিশকর্তা চৌধুরী আবদুল্লা আল-মামুনকেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়। হাসিনা ও আসাদুজ্জামান এখন ভারতে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাই আসাদুজ্জামানকেও ফাঁসির শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তবে আল-মামুনকে কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন করেছে বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার, বিচারপতি মহম্মদ শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মহম্মদ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর ট্রাইব্যুনাল। তিনি রাজসাক্ষী হয়েছেন। তাঁকে পাঁচ বছরের কারাবাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাজা শুনে দেশান্তরী হাসিনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই রায় ‘পক্ষপাতদুষ্ট’। হাসিনার দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে আনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলির পক্ষে কোনও প্রমাণ নেই। তাঁর কথায়, ‘গত বছরের জুলাই-আগস্টে যত জনের মৃত্যু হয়েছে, সে জন্য আমি শোকাহত। কিন্তু আমি কিংবা কোনও রাজনৈতিক নেতা কখনওই কোনও আন্দোলনকারীকে হত্যা করার নির্দেশ দিইনি। আমাকে আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও সুযোগই দেওয়া হয়নি। এমনকি, নিজের পছন্দমতো আইনজীবীও বাছার সুযোগ দেওয়া হয়নি আমাকে। এই রায় অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা চরমপন্থী ব্যক্তিদের নির্লজ্জতা ও খুনি মনোভাবের প্রতিফলন মাত্র।’
যে সব বর্ষীয়ান আইনজীবী বা বিচারপতি কোনও না কোনও সময় প্রকাশ্যে পূর্ববর্তী সরকারের পক্ষ নিয়েছিলেন, তাঁদের সকলকে হয় এক এক করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইউনুস সরকারের মদতে সেই জায়গা দ্রুত দখল করেছে জামাতপন্থী-পাকিস্তানপন্থী আইনজীবী, বিচারপতিরা। তারা তো হাসিনার মৃত্যু চাইবেই? তবে হাসিনাকে নিয়ে রায় ঘোষণার পরেই একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার সংগঠনের মুখপাত্র রবিনা শামদাসানি। এই মামলার ক্ষেত্রে যে অভিযুক্তের (হাসিনার) অনুপস্থিতিতে বিচার প্রক্রিয়া চলেছে এবং মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে, তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন রবিনা। বলেছেন, ‘মৃত্যুদণ্ডের রায়ের জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা সব পরিস্থিতিতে এর (মৃত্যুদণ্ডের) বিরোধিতা করি।’
প্রশ্ন হল, বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে। ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান বাংলাদেশের এই সংকটকালীন পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লেখালিখি করে চলেছেন। সেই বার্গম্যানও লিখতে বাধ্য হয়েছেন, শেখ হাসিনার বিচারে দু’টি গুরুতর সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, আদালতের নিযুক্ত আসামিপক্ষে যে আইনজীবী ছিলেন, তিনি প্রসিকিউশনের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলি নিয়ে সাধারণ যে প্রশ্নগুলি তোলা উচিত ছিল, সেগুলিও তুলতে ‘ব্যর্থ’ হয়েছেন। কিংবা তোলেননি। দ্বিতীয়ত, বিচারপতিরাও নিজেদের উদ্যোগে প্রমাণগুলি খতিয়ে দেখেননি। প্রসিকিউশনের পেশ করা ছবি এবং তাদের দেওয়া সাক্ষী-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রসিকিউশনের অবস্থানই মেনে নিয়েছে। আসামিপক্ষের দুর্বল আইনি লড়াইয়ের কারণে বিষয়টা আরও বেশি সমস্যার হয়ে উঠেছে।
এই দুই সমস্যার ফলে আদালত বিচারের রায়ে যেসব যুক্তি নিয়ে এসেছে, তার মধ্যে বহু ত্রুটি রয়ে গিয়েছে। এর একটি দৃষ্টান্ত হল, ১৪ জুলাই সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের (ইন্টারসেপ্টেড) ফোনকল। ছাত্র আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনার কুখ্যাত ‘রাজাকার’ মন্তব্যের পর ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং এর ফলে আন্দোলন আরও উত্তাল হয়। সেই মন্তব্যেরই কয়েক ঘণ্টা পর উপাচার্যের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছিল। প্রসিকিউশন যুক্তি দিয়েছে, ওই ফোনকল প্রমাণ করে, হাসিনা ছাত্রদের হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন। শুধু তা–ই নয়, আদালত যেভাবে পড়ে শুনিয়েছে, তাতে হাসিনার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগের দু’টির ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট দাবিটি একটি ভিত্তি হিসেবে উঠে এসেছে। রায়ে ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিন্তু হাসিনার কথোপকথন বিশ্লেষণ করলে আদালতের এই ব্যাখ্যা (ইন্টারপ্রিটেশনে) ভুলে ভরা।
ট্রাইব্যুনালের দাবি প্রমাণ করতে বিচারক হাসিনার কথোপকথনের তিনটি অংশ আদালতে পড়ে শোনান। প্রথমটিতে হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, ‘রাজাকারের তো ফাঁসি দিছি, এবার তোদেরও তাই করব। একটাও ছাড়ব না, আমি বলে দিছি।’ দ্বিতীয়টিতে হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, ‘কোন দেশে বাস করি আমরা? রাজাকারদের কী অবস্থা হয়েছে দেখিস নাই, এবার তোদেরও ছাড়ব না।’ তৃতীয়টিতে হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, ‘এইগুলাকে বাইর করে দিতে হবে…আমি বলে দিচ্ছি আজকে সহ্য করার পরে অ্যারেস্ট করবে, ধরে নেবে এবং যা অ্যাকশন নেওয়ার নেবে।’ প্রথম দু’টি বক্তব্য স্পষ্টভাবে রাগের বহিঃপ্রকাশ। হিংসাত্মক ভাষা, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি যে বিষয়টি বলছেন, তা আইনত শাস্তির কথা। তা বিচারবহির্ভূত হত্যার কথা নয়। হাসিনা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামাত নেতাদের সঙ্গে ছাত্রদের তুলনা করছেন। তার অর্থ, তিনি চেয়েছেন আদালতের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাঁর বক্তব্য আক্রমণাত্মক হলেও তিনি কোথাও বলেননি, তিনি রাস্তায় আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে চান। এমনকি তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয়, হাসিনা ‘ফাঁসি’ শব্দটি ‘হত্যা’ বোঝাতে ব্যবহার করেছেন, তাহলেও কথোপকথনের কোথাও তিনি বলেননি, তিনি এমন কোনও আদেশ ইতিমধ্যে দিয়ে দিয়েছেন। অথচ, আদালতে পাঠ করা রায়ে বিচারপতি শফিউল আলম এমনটাই দাবি করেছেন।
হাসিনার শেষ উদ্ধৃতিটি, ‘আমি বলে দিচ্ছি’— এই কথাটা এসেছে কেবল তখনই, যখন উপাচার্য বলেন, ‘হ্যাঁ, এবার এই ঝামেলাটা যাক। এরপরে আমিও নিজে ধরে ধরে যারা এই অস্থিরতা সৃষ্টি করছে এদেরকে বহিষ্কার করব ইউনিভার্সিটি থেকে।’ এই পরিপ্রেক্ষিতে হাসিনার ‘আদেশ’ বলতে ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার আদেশ বোঝানো হয়েছে। এই ‘আদেশ’ মানে ছাত্রদের আটক করার আদেশ, যা কি না তিনি পরে বাস্তবে করেছিলেন। এখানে কোথাও ফাঁসি দেওয়া, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বা কাউকে হত্যা করার কোনও নির্দেশের কথা নেই। এই দাবি ভিত্তিহীন। আর যদি এই দাবির ভিত্তি না থাকে, তাহলে ১৬ জুলাই হত্যাকাণ্ডগুলিকে ‘রাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী সংগঠিত’ বলা (যা মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণ করার জন্য খুব জরুরি) এবং সেটার পক্ষে যুক্তি দেওয়া অনেক কঠিন হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড়ো কথা হল, যদি ট্রাইব্যুনাল-১ যথাযথ যোগ্য ও অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ করতে দিতেন, তাহলে তাঁরা আসামিকে বাঁচাতে জোর চেষ্টা করতেন। তাঁরা প্রায় নিশ্চিতভাবেই ১৪ জুলাইয়ের কথোপকথন–সম্পর্কিত প্রসিকিউশনের ব্যাখ্যা খতিয়ে দেখতেন। কিন্তু তা না করে তার বদলে আসামিপক্ষের আইনজীবী শুধু দাবি করেছেন, ফোনালাপগুলি এআই দিয়ে তৈরি। তাঁরা এসব ফোনালাপের কোনও পরীক্ষার আয়োজনও করেননি। আসামিপক্ষের আইনজীবীর এই ব্যর্থতা বিচারকদের দায় কমায় না। কে না জানে, হাসিনার মামলার প্রধান প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম জামাতে ইসলামির আইনজীবী, এক চরম পাকিস্তানপন্থী। যিনি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিয়েছিলেন। ফলে এই রায় বিচারের নামে প্রহসন ছাড়া কিছু নয়।
এই প্রসিকিউটররাই চান, বাংলাদেশের মাটি থেকে হাসিনার নাম মুছে ফেলতে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলতে। তাঁদের লক্ষ্য একটাই, বাংলাদেশকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া। শেখ হাসিনার রায়ের আগের দিন ঢাকায় ছিলেন পাকিস্তানের জামাত উলেমা ই ইসলাম ফজল-এর প্রধান মৌলানা ফজলুর রহমান। পাক রাজনীতির ‘ধর্মীয় ডিপ্লোম্যাট’। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ এক পা এগোলে পাকিস্তান দু’পা এগোবে।’ এটা কোনও সৌজন্য বক্তব্য নয়। এটা সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা— বাংলাদেশে মৌলবাদী গোষ্ঠীর নতুন জায়গা তৈরি হচ্ছে এবং পাকিস্তান সেই দরজা দিয়ে ঢুকে পড়তে প্রস্তুত।
গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড়ো কাজ ছিল একটাই— বাংলাদেশ থেকে চরমপন্থী ইসলামি শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। তিনি মৌলবাদকে রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই হাসিনার অনুপস্থিতিতে জামাত, হেফাজত ও পাকিস্তানপন্থী দলগুলি নতুন করে মাথা তোলা শুরু করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভিতরে ইসলামপন্থার প্রভাব বাড়ছে। যে বাংলাদেশ ১৯৭১–এ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, আজ সেই পাকিস্তানের মতাদর্শই ঢুকে পড়ছে সেখানে। আর তাতে ইন্ধন জোগাচ্ছে ইউনুস সরকার থেকে শুরু করে দেশের বিচারব্যবস্থাও। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। তরুণ ভোটাররা পাকিস্তানপন্থী দলগুলির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছে। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘ইসলামি পরিচয়’–কে রাজনৈতিক মূলধন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যে বাংলাদেশ একসময় ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যের নিদর্শন ছিল, আজ সেই দেশই ভারতবিরোধী চক্রের প্রবেশদ্বারে পরিণত হওয়ার পথে। হাসিনার মৃত্যুদণ্ড আসলে মিথ্যাচারের পটভূমিতে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা। বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রাক্তন ভারতীয় হাই কমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তীর কথায়, পাকিস্তান কার্ড অতিরিক্ত না খেলার ব্যাপারে বাংলাদেশের সচেতন হওয়া জরুরি। বাংলাদেশের মাটি থেকে তৈরি হওয়া যেকোনও নিরাপত্তা হুমকি ভারতকে প্রতিশোধের আমন্ত্রণ জানাবে!
একটি দেশের পতন কখনও একদিনে হয় না। ঘটতে থাকে ধীরে। স্তরে স্তরে। নীরবে। আজ বাংলাদেশের সামনে ঠিক সেই সংকটই দাঁড়িয়ে। হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় কেবল একটি রাজনৈতিক পরিণতি নয়— এই রায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথ কোন দিকে যাবে তারও নির্মম ইঙ্গিত!