সোহম কর, কলকাতা: এসআইআর শব্দটি মানুষের কানে আসার পর তার সঙ্গে লেজুর হয়ে জুড়ে গিয়েছে ‘২০০২ সাল’। ২০০২ সালের ভোটার তালিকা মিলিয়ে দেখতে হবে, তাতে নিজের নাম রয়েছে কি না। নিজের নাম না থাকলে দেখতে হবে, মা-বাবার নাম আছে কি না। বাঙালি চিরকাল নস্টালজিক। বারবার অতীতে ফিরে যেতে পছন্দ। এবার ২০০২ সালের ভোটার তালিকা ডাউনলোড করতে গিয়ে বাঙালি আবার ‘জিয়া নস্টাল’। অনেকেরই বক্তব্য, ‘শুধু তো ভোটার লিস্ট ডাউনলোড করছি না। শৈশবও ডাউনলোড করছি। ফিরে আসছে ছোটবেলা। ছবিতে, স্মৃতিতে, নানা ঘটনার হাত ধরে এসেই চলেছে।
ছোটবেলা শুধু নয়, মা-বাবার সঙ্গে খারাপ হয়ে যাওয়া সম্পর্কের কাটা ঘায়ে যেন নুনের অল্প ছিটেও দিয়ে যাচ্ছে এসআইআর। অনেকের মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। মৃত বাবার সঙ্গে এককালে ঘটে যাওয়া মনোমালিন্যের স্মৃতি বেদনা জাগাচ্ছে মনে। দক্ষিণ কলকাতা বিধানসভা কেন্দ্রের এক ভোটারের ছোটবেলায় মা মারা যান। বড় হন পিসির কাছে। বাবার সঙ্গে তেমনভাবে সম্পর্ক ছিল না। কয়েকবছর আগে বাবা গত হয়েছেন। এসআইআর ফর্ম ফিল আপ করতে গিয়ে সেই মহিলা ভোটার খুঁজছেন বাবার নাম। বাবা শেষবার কোন বিধানসভার ভোটার ছিলেন তা জানতে দিদিকে ফোন করলেন। তা করতে গিয়ে ফিরে এল ছোটবেলার স্মৃতি। বাবা-মা-দিদি-পিসি সবাই ভিড় করে আসছে মনে। আচমকা মন ভার। দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক বৃদ্ধা ভোটার বলেন, ‘দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। স্বামী-ভাসুর মৃত। এখন আমি একা। ২০০২ সালের তালিকায় দেখি, স্বামী-ভাসুর সকলের নাম আছে। ভোটার তালিকা নাতি এনে দিল। ওকে ওর ছোটবেলার গল্প বলছিলাম। তখন সব ছিল। সব অন্যরকম ছিল। এখন কিছুই নেই।’
আগের মতো নেই অনেক কিছুই। তবে রয়ে গিয়েছে স্মৃতি। সেই আগের সময় কেমন? দক্ষিণ কলকাতার এক ভোটার বললেন, ‘২০০২ সালে চাকরির জন্য বাবা দুর্গাপুরে থাকতেন। আজ ভোটার তালিকা আনার পর বাবা বলছেন, ওর নাম আছে কি না দেখত। এর নাম আছে কি না দেখত। তারপর সকলের গল্প শুরু করলেন। কে কোন পার্টি করত, কে কি খেতে ভালবাসত, কে ইলেকশনের দিন মারামারি করেছিল, সব বলছেন।’
এসআইআর নিয়ে সর্বত্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সংগঠিত হচ্ছে প্রতিবাদ। এরই মাঝে বাঙালি সবকিছুর মধ্যে হয়ে উঠেছে স্মৃতিমেদুরও। চলছে নির্বাচন কমিশনের ভুলভ্রান্তি নিয়ে কাটাছেড়া। চলছে প্রতিবাদ। এসআইআর কী? তাই নিয়ে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে তুফান। বিএলও কিংবা বিএলএ’দের কাছে গিয়ে কোনও বিষয় বুঝে নেওয়ার আগেই পাড়ার একাধিক স্বঘোষিত এসআইআর এক্সপার্ট বুঝিয়ে দিচ্ছেন, কী করতে হবে, কী করা যাবে না। আর এসব মিলিয়ে এসআইআর ইস্যুতে নস্ট্যালজিয়া, নলেজ আর প্রতিবাদের মধ্যে সাঁতার কাটছে বাঙালি।