নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: পাড়ায় দুষ্কৃতীদের লাগাতার দৌরাত্ম্য। মদ্যপদের দাপট। মহিলাদের কটূক্তি। ‘কেন লোকে লক্ষ্মীছাড়া কুকর্ম প্রভাবে...’ —মহিলারা পাঁচালি পড়তেন আর মা লক্ষ্মীর কাছে সুদিন ফেরানোর প্রার্থনা করতেন। হঠাৎ একদিন মনে হল, নিজের ঘরেই তো লক্ষ্মী আছে! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারই তো নিজেদের নিরাপত্তায় কাজে আসতে পারে। এরপর মহিলাব্রিগেড একসঙ্গে বসলেন। ঠিক করলেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকায় পাড়ায় সিসি ক্যামেরা বসাবেন। নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হবে রাস্তাঘাট, অলিগলি।
অভিনব এই সিদ্ধান্ত নড়িয়ে দিল। এগিয়ে এলেন কয়েকজন বৃদ্ধাও। বৃদ্ধ বয়সের অন্যতম ভরসা বার্ধক্য ভাতার টাকা তুলে দিলেন পাড়ার নিরাপত্তার স্বার্থে। এরপর রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সুকান্তপল্লিতে বসল ১২টি আধুনিক মানের সিসি ক্যামেরা। প্রমীলাবাহিনীর চমকপ্রদ পদক্ষেপ সাড়া ফেলল সোনারপুরজুড়ে। ক্যামেরা বসানোর ফলে আরও একটি কাজ হল। পাড়ার অনেকে নিজের ঘরদোর সাফসুতরো রাখতে পোষ্যকে প্রতিবেশীর বাড়ির সামনে নিয়ে গিয়ে শৌচকর্ম করাতেন। খাবার খাওয়াতেন। ফলে নোংরা হতো। ক্যামেরা বসার পর সে প্রবণতা বন্ধ হল।
কিছুদিন আগেও দুষ্কৃতীদের দাপটে টেকা দায় হয়ে গিয়েছিল সুকান্তপল্লির মহিলাদের। রাস্তায় বেরলে কটূক্তি। কিশোরী-যুবতীদের টিটকিরি যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাত বাড়লে মদ খেয়ে উৎপাত হয়ে উঠছিল অসহ্য। এরপরই সিসি ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্ত। কিন্তু গৃহবধূরা এত টাকা পাবেন কোথায়? সম্বল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। আগে এই টাকায় অনেকে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা চালিয়েছেন। সংসারে খরচ করেছেন। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্বাবলম্বী করেছে রাজ্যের মহিলাদের। তবে নিরাপত্তায় ক্যামেরা বসিয়েছেন, এমনটা শোনা যায়নি। এবার সেই চমকে দেওয়ার কাজটাই করলেন সুকান্তপল্লির মহিলারা।
এখন এ পাড়ায় ঢুকলে চোখে পড়বে ‘আপনি সিসি ক্যামেরার নজরদারির আওতায় রয়েছেন।’ এই সতর্কবাণী স্বাগত জানাবে সুকান্তপল্লিতে। পাড়ায় কে ঢুকছেন, কে বেরচ্ছেন, কী করছেন, সবটাই থাকবে নজরবন্দি। পাড়ার গলিগুলির মুখে বসানো হয়েছে ক্যামেরা। পাড়ার একটি বাড়িতে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। সেখানে পালা করে নজরদারি চালান মহিলারা। তাছাড়া সবারই মোবাইলে রয়েছে ক্যামেরার লিঙ্ক। কেউ না কেউ সর্বদা চোখ রাখেন ফুটেজে। স্থানীয় বাসিন্দা জয়তী সাহা, গোপা চক্রবর্তী, অনন্যা নন্দী বলেন, ‘তিনমাস ধরে পরিকল্পনা হয়েছিল। কাউন্সিলার সন্দীপ নস্করের সঙ্গেও কথা হয়। এরপর সিসি ক্যামেরা লাগানোর সিদ্ধান্ত। কেউ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের, কেউ দু’মাসের বার্ধক্যভাতা চাঁদা হিসেবে দিয়েছেন। এছাড়াও যাঁর যেমন ক্ষমতা তেমন জমানো টাকা দিয়েছেন।’ নিরাপত্তার দায়িত্ব পুলিসের। কিন্তু কখনও সাহস, সচেতনতা আর সংহতি দেখিয়ে সাধারণ মানুষই বদলে দিতে পারেন বাস্তব মানচিত্র। সুকান্তপল্লি ঠিক সেই কাজটিই করেছে বলে চর্চা চলছে সর্বত্র।