যম, নিয়ম হল যোগের সর্বসাধারণ ভিত্তি। সমস্ত জীবন হল একটি যোগ। আর এর সিদ্ধি যম-নিয়মের সাধনার দ্বারা সম্ভবপর হতে পারে। যম, নিয়ম হল আদি সাধন। প্রথম অবস্থায় যেটি সাধনরূপ—সেটিই পরে সাধ্য হতে পারে। প্রথমে চেষ্টার দ্বারা এদের আয়ত্ত করতে হয়, আবার যখন এগুলি স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন যোগসিদ্ধি সহজ হয়। অন্য সমস্ত অঙ্গকে বাদ দিয়েও কেবল যম, নিয়মের সাধনার দ্বারাও সিদ্ধি সম্ভবপর হতে পারে। যম নিয়ম চরিত্র গঠন বা character building-এর জন্য বিশেষ উপযোগী। এর দ্বারা সাধকের ব্যক্তিত্ব বা personality পরিমার্জিত হয় আর তখন অন্তরে প্রবেশ সহজসাধ্য হয়। এই অন্তরপ্রবেশ হয় দেহ, প্রাণ ও মনকে আশ্রয় করে যার অনুক্রম আসন, প্রাণায়াম ও প্রত্যাহারকে অবলম্বন করে হয়। সত্যকার যোগ আরম্ভ হয় একাগ্রভূমিতে পৌঁছবার পর। সেই একাগ্রভূমিতে পৌঁছবার জন্য এই সাধন পঞ্চককে প্রস্তুতি পর্ব মানা যেতে পারে। একাগ্র ভূমি আরম্ভ হয় ধারণা থেকে। এটি দৃঢ় হয় ধ্যানে, আর তার culmination হয় সমাধিতে। প্রত্যাহার হল যোগের এক সুন্দর technique। এর সাধনা থেকেই যোগের আরম্ভ হয়েছে—এমনও বলা যেতে পারে।
পাঁচটি যম আর পাঁচটি নিয়মের বর্ণনা করা হয়েছে। যমের সাধনায় বহির্জগতের সাথে সম্পর্ক থাকে। ইন্দ্রিয় ব্যাপারকে অবলম্বন করে যোগের ভূমিকা তৈরী করা হয়। যখন এই প্রস্তুতি অন্তর্মুখীনতা লাভ করে তখন তা নিয়মের সাধনায় পরিণত হয়ে যায়।
যম পাঁচটি—অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য্য, অপরিগ্রহ। এই যমপঞ্চক হল মুনিপন্থার সাধারণ সাধনা। বৌদ্ধ, জৈন, ন্যায়, বৈশেষিক, যোগ সবার সাধনায় এগুলি পাওয়া যায়। বৌদ্ধরা একেই ‘পঞ্চশীল’ বলেছেন। এদের মধ্যে অপরিগ্রহের স্থানে মদ্যাদি পান বিরতির নিয়ম রাখা হয়েছে।
যম—নিয়মের ব্যাপারে সূত্রকার কেবল অহিংসাদির সিদ্ধিলাভ করলে যে বিভূতিগুলি জাগ্রত হয়, তার বর্ণনা করেছেন। এই বিষয়ে অন্য কোন বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা বিবরণ পাওয়া যায় না। যম পাঁচটি বাইরের জগৎকে নিয়েই পালন করা হয়। তাছাড়া একলা হয়ে গেলে হিংসার প্রশ্নই ওঠে না। অবশ্য হিংসার মূল কারণ রয়েছে নিজের ভিতরে। হিংসা জন্মায় স্বার্থ আর লোভ থেকে, যার মূল কারণ হল রাগ, আসক্তি। প্রতিপক্ষ বা শত্রুকে বাধা দিতে বা বিনষ্ট করবার বৃত্তিই হল হিংসা। কাউর অনিষ্ট করবার ইচ্ছাও হিংসা মানা হয়েছে। এই সব হতে দূরে থাকাই অহিংসা। সূত্রাকার বলছেন যে সব যম, নিয়ম আংশিক বা পূর্ণ দুইভাবে পালন করা যেতে পারে। যোগীর লক্ষ্য এদের পূর্ণ পালন। যখন এইগুলি পূর্ণভাবে পালন করা হয়, তখন একে মহাব্রত বলা হয়। জাতি, দেশ, কাল, অবস্থা নির্বিশেষে যখন এইগুলি পালন করা হয়, তখন এইগুলি সার্বভৌম হয়, তখন এইগুলিকে মহাব্রত মানা হয়। এর সাধনা যখন অবিচ্ছিন্নভাবে করা হয়, তখন এর বিভূতি স্ফুরিত হয়। গীতাকার অহিংসার rigid ভাবে পালনে পক্ষপাতী নন। তাঁর বক্তব্য হল, অন্তরে হিংসার ভাব না থাকাই যথেষ্ট। কিন্তু একে মহাব্রত মানা যেতে পারে না।
শ্রীমৎ অনির্বাণ রচিত ‘অনির্বাণ আলোয় পাতঞ্জল যোগ-প্রসঙ্গ’ থেকে