ডাঃ সুবল কুমার মাইতি: রোগ ও পথ্য— শব্দ দুটি যেন অতি সাধারণ, এবং চেনা শব্দ। একটু গভীরে ভাবতে গেলে সামনে এসে দাঁড়ায় হরেকরকম সমস্যা।
ডাঃ সুবল কুমার মাইতি: রোগ ও পথ্য— শব্দ দুটি যেন অতি সাধারণ, এবং চেনা শব্দ। একটু গভীরে ভাবতে গেলে সামনে এসে দাঁড়ায় হরেকরকম সমস্যা।
আমরা সুস্থ থাকার জন্য যা খাই, তা খাদ্য। রোগীর বেলায় সেটি হয়ে যায় পথ্য। এই পথ্য তখন ওষুধের সঙ্গে মিলে মিশে রোগ সারায়। সেই পথ্যধর্মী খাবার যদি দৈনন্দিন জীবনে খেতে পারি, তাহলে শরীর এমনিতেই সুস্থ থাকার জন্য চেষ্টা করবে। তখন আবার এও মনে হয়— দিন দিন আর রোগীর পথ্য খেয়ে বাঁচা যায় না। যেসব জিনিস প্রতিদিন সংগ্রহ করি দৈনন্দিন আহারের জন্য, সেগুলিইতো ব্যবহার করা হয় পথ্য তৈরির ক্ষেত্রে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
দেশ-বিদেশের লোভনীয় খাদ্য, যাতে অতিরিক্ত তেল-নুন-মশলা ও রাসায়নিক দ্রব্য থাকে, সেগুলিই আমাদের কাছে অত্যধিক রুচিকর হয়ে ওঠে। এছাড়া দ্রুত গতিতে খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান পাল্টে যাওয়ায় নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে শরীরে ও মনে। এই দ্রুতগতিতে জীবনধারা পাল্টাতে চাইলে আমাদের জীবনের প্রায় শুরু থেকে নানান রোগের শিকার হতে হবে। সুস্থ ও দীর্ঘায়ু লাভ করতে চাইলে সবকিছু নিয়মমাফিক করতে হবে প্রকৃতির সঙ্গে হাত মিলিয়ে।
একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। খাওয়া-দাওয়া, চালচলন, পরিবেশ, মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য ভেদে মানুষ সুস্থ অবস্থায় দীর্ঘদিন বাঁচতে পারে। প্রকৃতি সর্বশক্তি দিয়েও আমাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না। এদিকে আমাদেরও পিছিয়ে আসাটা খুব সহজ হবে না। যাঁরা সুস্থভাবে বাঁচতে চাইবেন, তাঁদের সংখ্যা নগণ্য, সুতরাং আগুনের ফুলকিতে তাঁরাও কমবেশি ক্ষত-বিক্ষত হবেনই।
এই প্রসঙ্গে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের গিলগিট-বালটিস্তানের পাহাড়-পর্বত সরু নদীনালা পরিবেষ্টিত হুনজা উপত্যকা এবং সেখানকার লাখ দশেক হুনজা উপজাতির মানুষ আমাদের প্রায় অলক্ষ্যে থেকে গেছে। তাঁদের গড় আয়ু ১০০ থেকে ১২০ বছর। ১০০ বছরেও শক্ত সামর্থ্য থাকেন। ৭০ বা ৮০ বছর বয়সেও তাঁরা তরতাজা থাকেন, চামড়ার লালিত্য নষ্ট হয় না। তাঁরা নিয়মমাফিক একইভাবে সবাই সবকিছু মেনে চলেন। প্রকৃতির প্রায় দূষণহীন পরিবেশে থাকেন। তাঁদের জীবনের অভিধানে দুঃশ্চিন্তা, অবসাদ, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, লোভ, হিংসা, মারামারি নামক শব্দগুলি নেই। তারা সব সময় কাজ নিয়ে ব্যস্ত হাসি, ঠাট্টা, তামাশায়। দিনে দু’বার অর্থাৎ সূর্য ওঠার পরে এবং সূর্য অস্ত যাওয়ার পরে তারা খান। প্রাচীন রীতি মেনে বছরের চার মাস দিনের কোনও এক নির্ধারিত সময়ে সকলেই এপ্রিকটের শরবত খায়। খনিজ পদার্থে ভরা হিমবাহের জল পান করে। সারা বছর শীতল জলে স্নানের অভ্যাস। এরা সাধারণত অসুস্থ হয় না। উদয় থেকে অস্ত পরিশ্রম করে। দৈনিক ১০-১৫ কিলোমিটার পথ হাঁটতে অভ্যস্ত। পাকিস্তানের একেবারে উত্তরে অবস্থিত পাক অধিকৃত কাশ্মীরের অংশ বিশেষে হুনজা উপত্যকা হলে সেটি তো ভারতেই অংশ বলা যেতে পারে। সুস্থ ও দীর্ঘজীবন লাভের পথ দেখিয়েছেন হুনজারা।
রোগ ও পথ্য বললে কী রোগে কী কী খাবেন, তা কিন্তু বোঝায় না। আরও অনেক কিছু আছে, একের পর এক আলোচনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
১. পথ্য বা খাদ্য তৈরির জন্য আহার্য দ্রব্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
খাদ্যশস্য: চাল, গম, ভুট্টা, ছোলা, সয়াবিন, জৌ, মুগ, মসুর, মটর, অড়হর, খেসারি, কুলত্থ কলাই প্রভৃতি সংগ্রহ করা এবং রান্নার জন্য সেগুলিকে প্রস্তুত করা।
শাক-সব্জি: যে ঋতুতে যেসব শাক-সব্জি স্বাভাবিকভাবে হয়, তা সংগ্রহ করা। অসময়ের কোনও দ্রব্য না খাওয়াই উচিত।
মরশুমী পাকা ফল: আম-জাম-কাঁঠাল, পেয়ারা-সবেদা, কুল-পানিফল, বেল, তরমুজ প্রভৃতি। সারা বছর কমবেশি পাওয়া যায়— কলা, পেঁপে, শসা, আপেল, বেদনা, কমলা, মোসাম্বি, আঙুর, ডাব-নারকেল, আখ-আনারস প্রভৃতি। শুকনো ফল— আমন্ড/ কাগজি বাদাম (সুপার ফুড), আখরোট (ব্রেনফুড), পেস্তা, কাজুবাদাম, চিনে বাদাম, কিসমিস, খেজুর, অ্যাপ্রিকট (খুবানি) প্রভৃতি। ফল পাকানোর চিরাচরিত প্রথা ত্যাগ করে বর্তমানে যেভাবে পাকানো ও সংরক্ষণ করা হয়, তা কিন্তু শরীরের পক্ষে মোটেই ভালো নয়। সেদিকে নজর রেখে সংগ্রহ করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো এগুলি থেকেই বাছ-বিচার করতে হবে রোগীর জন্য।
জল খাবারের জন্য দ্রব্যাদি সংগ্রহ ও প্রস্তুতিকরণ: খই, মুড়ি, চিঁড়ে, পান্তাভাত, গুড়-চিনি-মধু, আটার রুটি, উপমা, দালিয়া, সুজির হালুয়া, খিচুড়ি, ছোলা ও মুড়ির ছাতু প্রভৃতি সংগ্রহ করা ও নিয়মমাফিক তৈরি করা খুবই জরুরি। যার ক্ষেত্রে যেটি প্রয়োজন, সেটিই খেতে হবে।
দুধ ও দুধ থেকে প্রস্তুত দ্রব্যাদি: দুধ, টক দই, ছানা, ছানার জল, ঘি প্রভৃতি সংগ্রহ করা বা বাড়িতে তৈরি করা— সবই সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। যাতে বিষক্রিয়া না হয়, সেদিকে নজর থাকা উচিত। মিষ্টি দই শরীরের পক্ষে কোনও অবস্থাতেই ভালো নয়। তাই এটি তৈরি করা ও খাওয়া বন্ধ হওয়া উচিত।
মিষ্টান্ন দ্রব্যাদি: নানা প্রকারের মিষ্টদ্রব্য তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের তৈরি হলে কেনা উচিত হবে না। ভেজাল ছানা দিয়ে তৈরি মিষ্টিও ক্ষতিকর। বাহারি করার জন্য ব্যবহৃত রাসায়নিক রং মিশ্রিত কোনও মিষ্টি খাওয়া ঠিক নয়। রং ছাড়া তাজা সাদা রঙের মিষ্টি খাওয়া উচিত। ভাজা মিষ্টি দ্রব্যও শরীরের পক্ষে অহিতকর।
মাছ-মাংস-ডিম: মিষ্টি ও নোনা জলের মাছ যেভাবে বাজারজাত করা হচ্ছে, তা ভাবতেও অবাক লাগে। মাছে পচননিবারক ও কীটনাশক রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে। চাষের ক্ষেত্রে যেভাবে ওষুধ, হরমোন ও খাদ্য হিসেবে বিভিন্ন প্রাণীর নাড়িভুঁড়ি থেকে যেসব দ্রব্য ব্যবহার করা হচ্ছে, তা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর তো বটেই। আগেকার দিনে মাছের বাজারে ছোট ও বড় মাছির উপদ্রব লেগেই থাকত, এখন তারা অনুপস্থিত। কারণ তীব্র বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রয়োগ। মাছের রঙের ব্যবহার বন্ধ হওয়ার উপায়ও দেখা যাচ্ছে না। মুরগির ডিম ও মাংস, যেগুলি পোল্ট্রি খামারে উৎপাদিত হয়, সেগুলোর কোনওটিই শরীরের পক্ষে ভালো নয়। সাধারণভাবে পোষা হাঁস বা মুরগির মাংস ও ডিম শরীরের পক্ষে ভালো। কোনটি কত মাত্রায় খেতে হবে, তা চিকিৎসকই বলে দেবেন। কচি পাঁঠা বা খাসি বা ভেড়ার মাংস একটা বয়স পর্যন্ত খাওয়া যেতে পারে। ৪০-৪৫ বছরের পর কম করে খেতে হবে। একটা সময় বন্ধ করে দেওয়া উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শমতোই চলতে হবে। ডিম বা মাংস ছোট থেকে বড়দের একই পরিমাণে খাওয়া উচিত নয়।
মশলাপতি: কাঁচা ও পাকা বা শুকনো মশলা পাওয়া যায়। যেমন— পেঁয়াজ-রসুন, আদা, হলুদ, কাঁচা ও শুকনো লঙ্কা, জিরা, কালো জিরা, মৌরি, রাঁধুনি, মেথি, গোলমরিচ, লবঙ্গ, ছোট ও বড় এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতা, কারিপাতা, ছাড়ানো তিল, তিসি, পোস্ত, মগজদানা, সূর্যমুখী বীজ, কুমড়োর বীজ প্রভৃতি কমবেশি ব্যবহৃত হয়। এগুলি সংগ্রহ করার সময় সতর্ক হবেন। অনেককিছুর তেল বের করে তারপর বাজারজাত করা হয়। মশলার দ্রব্য ঠান্ডা ও শুকনো স্থানে রাখা উচিত। কাচের পাত্র ব্যবহার করতে পারলে খুবই ভালো। সবকিছুই ভেবেচিন্তে সংগ্রহ করতে হবে।
ভোজ্য তেল: সর্ষের তেল ও রাইস ব্রান অয়েল রান্নার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো। অলিভ অয়েল ভালো হলেও অধিক তাপে রান্না করা উচিত নয়। যেকোনও তেলের সঙ্গে তিসির তেল ১০ শতাংশ হারে মিশিয়ে খেলে খুবই উপকারী। চিনে বাদামের তেল ও সূর্যমুখী বীজের তেল কমবেশি ব্যবহার করা যেতে পারে। তেলে-ভাজা সর্ষের তেলে হলে খুবই ভালো।
নিত্য ব্যবহার্য কয়েকটি দ্রব্য: কাঁচা হলুদ, থানকুনি, নিমপাতা, তুলসী পাতা, পাতি ও কাগজি লেবু, গোঁড়া লেবু, বাতাবি লেবু, কাঁচা আমলকী, পাকা তেঁতুল (পুরাতন হলে উৎকৃষ্ট), আদা, রসুন, কাঁচা লঙ্কা, শসা প্রভৃতি অবস্থা বিশেষে ব্যবহার করতে হবে।
শাক-সব্জি, ফলমূল, মশলাপাতি— যা আমরা নিত্য ব্যবহার করে থাকি, সেগুলির অধিকাংশই অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ এবং জীবাণুনাশক। এছাড়া আমাদের শরীরে যেসব খনিজদ্রব্য, ভিটামিন, অ্যামাইনো অ্যাসিড ও অন্যান্য দ্রব্যের প্রয়োজন হয়, সেগুলির প্রায় সবগুলিই কমবেশি পাওয়া যায়। ব্যবহারের ভুল আমাদের শরীরের ক্ষতি করতে পারে। সেজন্য জেনে বুঝে প্রত্যেকটি দ্রব্য ব্যবহার করতে হবে।
পানীয় জল: বোতল বন্দি হলেই যে ভালো হবে তা নয়। শহরে কিংবা গ্রামে যে পানীয় জল দেদার বিক্রি হচ্ছে, সেগুলির অধিকাংশই উন্নত পর্যায়ে পড়ে না। বাছ-বিচার করে সংগ্রহ করতে হবে।
খাদ্য দ্রব্যে ভেজাল অহরহ চলছে। আমরা বুঝেও না বোঝার ভান করে যাচ্ছি। কাঁচা শাকসব্জিতে বিষের ছোঁয়া। তাজা রাখার জন্য একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বিষাক্ত দ্রবণ মিশিয়ে থাকে। কপার সালফেট বা তুঁতের জলে শাকসব্জি চুবিয়ে রাখাটা এখন আর চুপিসাড়ে করার দরকার হয় না।
পারলে শুকনো হলুদ সংগ্রহ করে ভালোভাবে ধুয়ে শিলনোড়ায় পিষে নিন। অত কষ্ট করতে না পারলে মিক্সিতে গুঁড়ো করে রাখুন। ডাল প্রস্তুতি ও সংরক্ষণে নানা রকমের কারচুপি চলে। সেজন্য চাল ও ডাল ১২ ঘণ্টা ৫ গুণ জলে ভিজিয়ে রাখার পর ভালোভাবে ধুয়ে রান্না করুন। চায়ে ভেজাল। বুঝে-সুজে কিনুন। সস্তার চা কিনবেন না। ভেবেচিন্তে পানীয় জলের ব্যবস্থা করুন। সস্তায় বড় বড় জার কিনে তৃপ্তিতে খাবেন না।
ডাল এবং চা ভালো স্টেনলেস স্টিলের বা কাচের পাত্রে রাখুন। মশলাপাতি এভাবে রাখতে পারেন। বোতলবন্দি ঠান্ডা পানীয়, ফলের রস, প্যাকেটজাত ভাজাভুজি, নোনতা খাবার যতই সুস্বাদু ও মুখরোচক হোক না কেন শিশুর পক্ষে ক্ষতিকর। বড়রাও খাবেন না। ঘরের তৈরি সাবেককালের জলখাবারে নিজেরা অভ্যস্ত হন এবং বাচ্চাদের অভ্যস্ত করান। শাকসব্জি লবণ মিশ্রিত জলে ভালোভাবে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখুন। খবরের কাগজে বা প্লাস্টিকে মুড়ে ফ্রিজে রাখবেন না। আনাজের ঝুড়িতে (বাঁশের) ফলজাতীয় সব্জি ও আলু ধুয়ে রাখুন। কাটা ফল বা সব্জি কোনওভাবেই রাখা উচিত নয়। ফাঙ্গাস হতে পারে। এমনকী ফ্রিজে রাখলেও। শাক-সব্জি ভেজা পাতলা কাপড়ে জড়িয়ে রাখতে পারেন। এতে শাক ও ডাঁটা জাতীয় সব্জি ভালো থাকে।
সর্ষে তেল ও রাইস ব্রান (RBO) অয়েল— এই দুটো তেল কমবেশি ব্যবহার করুন। মাছ ভাজার পর অতিরিক্ত তেল দিয়ে কোনও রান্না করবেন না। ওটি ফেলে দিয়ে পাত্রটি ভালোভাবে ধুয়ে অন্য তরকারি রাঁধুন। মাঝে মাঝে পরিমাণমতো ঘি ব্যবহার করবেন। মাসে মাথাপিছু গড়ে একজন বয়স্ক মানুষ তেল-ঘি সমেত ৫০০-৬০০ গ্রামের বেশি খাবেন না। মধুতেও ভেজাল। ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে বোতলে রাখা দ্রব্যাদি ভালো রাখতে চাইলে ঢাকনা বন্ধ করুন। নানা ধরনের সস বাজারে পাওয়া যায়। বাচ্চাদের দেবেন না। বড়রা মাঝে মধ্যে খেতে পারেন।
খাদ্য প্রস্তুতের পূর্বে আরও কিছু সতর্কীকরণ
১) সিদ্ধ চাল ভাতের পক্ষে শ্রেয়। মেশিনে চালানো কাঠের ঢেঁকি বাজারে এসে গেছে। যোগাযোগ করে আপাতত রোগীর জন্য চাল সংগ্রহ করতে পারেন। যে চালই হোক ৫ গুণ জলে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে তারপর ধুয়ে রান্না করুন।
২) আর্সেনিক ও আয়রনযুক্ত ফিল্টারের জল পান করার চেষ্টা করুন।
৩) ডিম সংগ্রহের পর ভালোভাবে ধুয়ে তারপর ঝুড়িতে বা ফ্রিজে রাখুন।
৪) বড়ি ও আচার ভালোভাবে সংরক্ষণ করুন। ঢাকনা ঠিকমতো বন্ধ করুন। মাঝে মাঝে রোদে দিন। ঢাকনা খুলে বেশিক্ষণ রাখবেন না। ছাতা পড়ে গেলে সবটাই ফেলে দিন।
৫) শুকনো লঙ্কার ভেতরে ছাতা পড়ে। রান্নার আগেই ভেঙে দেখে নেবেন। ছাতা ধরা শুরু হয়েছে বুঝতে পারলে সবটাই ফেলে দিন।
৬) শুঁটকি মাছ খেতে চাইলে বাড়িতে টাটকা মাছ এনে কেটেকুটে ধুয়ে নুন মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে নিন। বিশেষ গুণ না থাকলেও অরুচিনাশক।
৭) স্যালাড খেলে তা নুন ও লেবুর রসে মিশিয়ে রেখে খাবেন। গোঁড়া লেবুর রস সবচেয়ে ভালো, না পেলে পাতি বা কাগজি লেবু নেবেন।
৮) আপেল, শসা, নাসপাতি প্রভৃতি ভালোভাবে ধুয়ে খাবেন। খোসা ছাড়াবেন না।
৯) ভালোভাবে না পাকলে কলা খেতে নেই। দুধ বা দইয়ের সঙ্গে কলা খাবেন না। দুটো ঘণ্টাখানেকের ব্যবধানে খান।
১০) ডাবের জলে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম খুব বেশি থাকায় যাঁদের প্রেশার কম কিংবা রক্তে এ দুটি কমমাত্রায় আছে, তাঁরা খাবেন। একবারে ২০০-২৫০ মিলির বেশি খাবেন না। কিডনির রোগে আক্রান্ত হলে ডাবের জল নিষিদ্ধ। কিডনির সাধারণ রোগে খাওয়া যেতে পারে চিকিৎসকের পরামর্শমতো। জলটি খুব মিষ্টি হলে মধুমেহ আক্রান্ত রোগীরা খাবেন না।
১১) ওল, কচু, মানকচু, জলকচু, খামালু খেতে হলে নুন দিয়ে ভালোভাবে সিদ্ধ করে জল ফেলে রান্না করুন। কিন্তু সর্ষে বাটা দেবেন না। পরিবর্তে মগজ দানা, কুমড়োর দানা, পোস্তদানা প্রভৃতি সামান্য পরিমাণে মেশাতে পারেন। কাজু বা চিনেবাদাম না মেশালে ভালো। ডায়াবেটিসের রোগী এবং যাঁরা ইউরিক অ্যাসিডে আক্রান্ত, তাঁরা খাবেনই না।
১২) শাক-সব্জি হালকা ভাপিয়ে জল ফেলে রান্না করা উচিত। তবে থোড়, লাল নটে, বেতো শাক, সজনে পাতা, গাঁদাল পাতা, ব্রাহ্মীশাক, থানকুনি, তেলাকুচা শাক, মেথিশাক, হেলেঞ্চা, শুষনি শাক প্রভৃতি সিদ্ধ করে জল ফেলতে নেই। ভালোভাবে ধুয়ে নিন কাটার পূর্বে। ব্রাহ্মীশাক বাড়িতে টবে তৈরি করে খেতে পারলে ভালো। শাকটি মাটিতে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক (আর্সেনিক প্রভৃতি) সহজে টেনে নিতে পারে। পালংশাক কাটার পর গরম জলে আধ মিনিটের মতো ডুবিয়ে ঝেড়ে রান্না করবেন। কুমড়ো, মোচা, কলা, বেগুন হালকা ভাপিয়ে নেবেন। যেকোনও প্রকারের কপি নুন ও হলুদ জলে ভাপিয়ে জল ফেলে রান্না করা দরকার। শীতের শাকসব্জি সবকিছুই খেতে পারেন নিয়ম মেনে। রাস্তার ধারে বসা দোকান থেকে শাক-সব্জি কিনলে এক বারের জায়গায় দু’বার ধোবেন লবণাক্ত জল দিয়ে। কারণ পেট্রল, ডিজেল চালিত গাড়ির ধোঁয়া লাগার ফলে সেগুলি বিষাক্ত হয়ে যায়।
১৩) রান্নায় যাতে মাথার চুল না পড়ে সেজন্য খুব সতর্ক থাকবেন। চুলে থাকে অতিরিক্ত মাত্রায় আর্সেনিক। স্নানের সময় চুলধোয়া জল পেটে গেলে বা রান্নায় পড়া চুল খেলে পেট খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি থাকে।
২. রান্না করার জন্য প্রস্তুতিকরণ ও খাদ্য বা পথ্য প্রস্তুত করা
প্রথমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রান্নাঘর দরকার। আলো-বাতাস যেন ভালোভাবে বিচরণ করতে পারে। রান্নার স্থানটি করার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা এবং রান্নার পর বাকিটা পরিষ্কার করা উচিত। রান্নায় ব্যবহৃত বাসনপত্র তখনই ধুয়ে রাখুন। বেশিক্ষণ ফেলে রাখা ক্ষতিকর। মাঝে মাঝে ফ্রিজ পরিষ্কার করে রাখুন। হাতলটি প্রতিদিন ধুয়ে মুছুন। যেকোনও দ্রব্য পাত্রে রেখে ঢাকা দিয়ে ফ্রিজের মধ্যে রাখবেন। প্লাস্টিক বা খবরের কাগজে মুড়ে রাখবেন না। মাছ বা মাংস ২৪-৪৮ ঘণ্টার বেশি ফ্রিজে রাখা উচিত নয়। কোনও খাদ্যদ্রব্যই ডিপ ফ্রিজে রাখবেন না। বের করার পর কাঁচা দ্রব্য ভালোভাবে ধুয়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এলে তারপর রান্নার কাজে লাগান।
আনাজ একটু লম্বা লম্বা করে কাটবেন। আলুর খোসা ফেলবেন না। খাওয়ার সময় খোসা ফেলে আলু খেতে পারেন। খোসাটিও উপকারী, তবে পেটের গোলমাল থাকলে ছালটি ফেলে দেবেন। অবশ্য পেটের যেকোনও প্রকার গোলমালে আলু না খাওয়াই উচিত। কাঁচা কলার আঁশ তুলে দেবেন, খোসা ছাড়াবেন না। কিছু আনাজ ধুয়ে কাটুন, কাটার পর ধোবেন না, যেমন ঢেঁড়শ। তবে অল্প জলে হালকা ভাপিয়ে জলটি ফেলে রান্না করা ভালো। কোন টকজাতীয় দ্রব্যের সঙ্গে রান্না করলে ভাপানোর দরকার নেই। কিছু আনাজ কাটার পর ধোবেন— যেমন আলু, বেগুন, উচ্ছে, কাঁচাকলা, কপি প্রভৃতি। তেল-ঘি প্রভৃতি সারাদিনে একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের রান্নায় ২০ গ্রামের বেশি দেবেন না। নুন ৫ গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ করুন। ভাতের পাতে নুন খাবেন না। জংলি শাকপাতা (তেলাকুচা, হেলেঞ্চা, কুলেখাড়া, পুনর্নবা, শানচে, গিমে, শুষনি, থানকুনি, গাঁদাল, বেতো, ব্রাহ্মী প্রভৃতি) নিয়মিত কমবেশি খাওয়ার অভ্যেস করুন। শিশুদেরও অল্প অল্প করে খেতে শেখান। নিরামিষ আহারে পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ডাল, গাজর প্রভৃতি ব্যবহার করতে পারেন। লোকাচার, দেশাচার কিংবা কোনও ধর্মীয় সতর্কীকরণ থাকলে সেটা অন্য কথা। তবে এগুলি আমিষজাতীয় দ্রব্য নয়। শুকনো করা খাবার, যেমন বাঁধাকপি, ফুলকপি, মুলো, আলু, উচ্ছে, মাশরুম প্রভৃতি রান্না করে না খাওয়াই শ্রেয়। তবে শুকনো মেথিশাক খেতে পারেন। সজনেপাতার অনেকগুণ। শরীর গঠনের সমস্ত উপাদান এর মধ্যে রয়েছে। সজনে পাতার ভাজা খাবেন। অন্য শাকের সঙ্গে মিশিয়েও (কলমি, নটে, শানচে প্রভৃতি) খেতে পারেন। সজনে পাতা ডালে, অন্য তরকারিতে মিশিয়েও খাওয়া যায়। ফুলকপি, পালং, টম্যাটো, শসা, বেগুন, কুমড়ো প্রভৃতি অতি প্রয়োজনীয় সব্জিতে ইউরিক অ্যাসিডের উপস্থিতি। যার ফলে গাউট, গলব্লাডার ও কিডনিতে পাথর হতে পারে। এগুলো ভাপিয়ে জল ফেলে খাবেন।
জ্যান্ত মাছ সংগ্রহ করতে পারলে খুবই ভালো। রং করা সামুদ্রিক মাছ খাবেন না। পোনা জাতীয় মাছ, ভেটকি, শোল, ল্যাটা, চ্যাং, পমফ্রেন্ট, ইলিশ, ভোলা, শিঙি, মাগুর, মৌরলা প্রভৃতি খাদ্য তালিকায় থাকা ভালো। এই মাছগুলি সকলেই খেতে পারেন। অন্য মাছ যে একেবারেই খাবেন না তা নয়। মাঝে মধ্যে খেতে পারেন। হালকা করে মাছের ঝোল বা টক করে খাবেন। মাছে রসুন ব্যবহার করবেন না।
নুন, ময়দা, চিনি- অতি অল্প মাত্রায় খান। না খেলে খুবই ভালো।
৩. রান্নার প্রস্তুতি ও রান্না করা এবং সংরক্ষণ
রান্নার জন্য নানা প্রকারের পাত্র ব্যবহার করতে পারি। মাটির পাত্রে এককালে রান্না হতো। তারপর এল অ্যালুমিলিয়াম ও স্টেনলেস স্টিলের পাত্র, প্রেশার কুকার ও ননস্টিক পাত্র, আরও কত কী। কাঠের কিংবা খড়-পাতাপুতির জায়গায় গোবর গ্যাস বা বায়োগ্যাস, এলপিজি গ্যাস, ইলেকট্রিক হিটার কিংবা ইনডাকশান প্রভৃতি রান্না ঘরে স্থান করে নিয়েছে। গ্রামাঞ্চলে এগুলির সঙ্গে কাঠ-খড়-পাতাপুতির ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু মাটির হাঁড়ি-কড়ার সংসার প্রায় অচল। পুজোয় ব্যবহৃত মাটির দ্রব্যাদির জন্য কুমোরের ব্যবসা কোনওরকমে টিকে আছে। পরীক্ষামূলকভাবে দেখেছি— যেকোনও আগুনের তাপে মাটির হাঁড়ি বা কড়াইতে স্বচ্ছন্দে রান্না করা যায়। একটু সাবধানে রান্না করলেই হঠাৎ ভেঙে যাওয়ার ভয় নেই।
কিছুদিন রান্না করা কিংবা দুধ গরম করার পর মাটির কড়াই ননস্টিকের মতো হয়ে যায়। গ্যাসে মাটির পাত্রের রান্না খুবই সুস্বাদু হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ভাজাভুজির ক্ষেত্রে অল্প তেলে ঢাকা দিয়ে রান্না করলে পুড়ে যায় না, সুস্বাদু তো হয়ই। অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-কড়াই বা কম দামি স্টেনলেস স্টিলের পাত্রে রান্না করা খাবার শরীরের পক্ষে ভালো নয়, বিশেষত অ্যালুমিনিয়াম।
রান্না করা দ্রব্য কাচের, চীনামাটির কিংবা স্টিলের পাত্রে রাখা যেতে পারে। মাটির পাত্রেও রাখা যায়। ননস্টিক পাত্রে রান্নার সময় যেসব কাঠের খুন্তি-হাতা-চামচ ব্যবহৃত হয়, রান্নার ঠিক পরে রান্নাঘরের কিংবা রান্না করার সময় পরিত্যক্ত দ্রব্যাদি একটা পাত্রে রাখুন এবং সেটি প্রত্যহ পরিষ্কার করুন। প্লাস্টিকের ফেলে দেওয়া দ্রব্যাদি আলাদা পাত্রে রাখবেন। কাঁচা শাকসব্জির ফেলে দেওয়া অংশ থেকে পাতাপচা সার তৈরি করে বাগানে ব্যবহার করতে পারেন। এর সঙ্গে চায়ের খোয়াও মিশিয়ে নেবেন, ভালো জৈবসার তৈরি হয়ে যাবে। টবের গাছের গোড়ায় দিয়ে প্রত্যহ সামান্য পরিমাণে জল দিলেই যেমন গাছ, তেমনই ফুল-ফল হবে।
চাল ও ডাল ১০-১২ ঘণ্টা ৫ গুণ জলে ভিজিয়ে রেখে তারপর ভালোভাবে ধুয়ে ৫ গুণ জল দিয়ে রান্না করুন। খেসারির ডাল আমরা খাই না ল্যাথারিজমের (কলায়খঞ্জ রোগ) ভয়ে। ডালটির গর্ভপত্র এর জন্য দায়ী, অথর্ববেদে তা প্রমাণিত সত্য। অথচ খেসারির বেসন দিব্যি খাচ্ছি! ডালটিকে ভালো করে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে রাখুন। ডাল রান্না করে মাঝে মাঝে খেতে পারেন অথবা মিক্সিতে ভালোভাবে গুঁড়ো করে বেসন তৈরি করতে পারেন। বেসন বেশি খেতে নেই। মাঝেমধ্যে এটির ব্যবহার করা যেতে পারে। ডালের মধ্যে মুগডাল শ্রেষ্ঠ। তবে এটির আবার বহু ভাগ। সোনামুগ ভালোই।
রান্নায় পাঁচফোড়ন, গরম মশলা, তেজপাতা প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়। গুঁড়োমশলা ব্যবহার না করাই ভালো। কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজ, রসুন, আদা প্রভৃতি ধোয়ার পর কাটবেন, কাটার পর ধোবেন না। পাঁচফোড়নের ৫টি দ্রব্য ফোড়ন হিসেবে ব্যবহার ছাড়া ভেজে, বেটে কিংবা গুঁড়ো করে না খাওয়াই ভালো। বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া জিরে বাটা বা জিরেগুঁড়ো (এখনই অথবা ভেজে) রান্নায় ব্যবহার না করতে পারলে শরীরের পক্ষে হিতকর। তেজপাতা, কারিপাতা, দারচিনির পাতা, রাধুনি পাতা, ধনেপাতা প্রভৃতি দিয়ে ফোড়ন দিতে পারেন। কোলেস্টেরল-হাইপ্রেশার-ডায়াবেটিস-স্থূলতা থেকে বাঁচতে চাইলে অতিরিক্ত তেল-ঘি-চর্বি-মাংস-ডিম বর্জন করুন। কথায় আছে— কম খেয়ে কেউ মরে না, বেশি খেয়েই মরে। আধুনিক বিজ্ঞানের বহু সূত্র ধরে তৈরি শাক-সব্জি শরীরের পক্ষে খুব যে একটা ভালো নয়, তা জৈব প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ার জীবনের প্রথম পাঠটা কী দিতে পারেনি! বিশাল খাদ্য তালিকা, প্রোটিন, ক্যালোরি, দুধ, কলা, তেল-ঘি-চর্বি, প্রত্যহ ডিম, মাংস খাওয়ার ফিরিস্তি নিয়ে বার বার ভাবুন। দেশের কত শতাংশ তা খেতে পারেন? আর যাঁরা খাচ্ছেন, তাঁরা কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন। পুরাতন সবই খারাপ, অবৈজ্ঞানিক, নতুন সবই ভালো— এই মনোভাব নিয়ে যাঁরা দিন কাটাচ্ছেন, তাঁরা মূল মূল ৮-১০টা রোগের কয়েকটিতে আক্রান্ত হননি তো? আমাদের আদি পুরুষ, সেই বন্যপ্রাণীদের শরীর খারাপ হলে তারা কী ধরনের ব্যবহার করে, সেই একদা চিন্তাভাবনার ভেতরে রেখে যে পথ্য বিজ্ঞানের শুরু করেছিল, আজ তা থেকে আমরা বহুদূরে সরে এসেছি। এখন কেবল সুস্থ-অসুস্থ সবারই খাই খাই ভাব। সংযত না হলে বিপদ ভয়াবহ আকারে আসতে চলেছে।
ভাজা না হলে পেট ভরে না। ভাজা, পোড়া, বাসি খাবার, দীর্ঘদিন রাখা ফ্রিজের খাবার ত্যাগ করুন। যেমন একটা উদাহরণ— মাছ কড়া করে ভাজতে নেই। হলুদ তেলে পোড়াতে নেই। দীর্ঘ ব্যবহারে এই ধরনের খাদ্য ক্যান্সারকারক। আজিনোমোটা কাদের উদ্ভাবন? আধুনিক বিজ্ঞানের জয়যাত্রার ফসল? এটির খারাপ প্রভাব জেনেও কেন ব্যবসায়িক মুনাফার জন্য বিক্রি করতে দেওয়া হচ্ছে।
পথ্যের গোড়ার কথা
চরক-সুশ্রুত-বাগভট-চক্রদত্ত প্রভৃতি আকারগ্রন্থে বায়ু-পিত্ত-কফের বিচারে রোগ-ওষুধ-পথ্য নির্বাচিত হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল— স্থান-কাল-পাত্র-বয়স-প্রকৃতি-রোগের প্রাদুর্ভাব রোগীর জীবনীশক্তি প্রভৃতির বিচার-বিশ্লেষণ করে পথ্যাপথ্য বিচার করতে হবে। এভাবেই দীর্ঘকাল চলছিল। ভালোমন্দ বিচার করে অদল-বদল হচ্ছিল। আধুনিক পথ্য বিজ্ঞানের নাচানাচি শুরু হল ১৯২৮ সালের পর। এখনও ১০০ বছর হয়নি। কিন্তু পেনিসিলিন আবিষ্কারের পর থেকে শুরু হয়ে গেল আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জয়যাত্রা। বিশ্বের জন্য এই আবিষ্কারের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা মানুষকে সতর্ক করতে পারিনি, পারিনি ধূর্ত ব্যবসায়ীদেরকে ঠেকিয়ে রাখতে, পারিনি কৃষিবিজ্ঞান, প্রাণীবিজ্ঞান প্রভৃতির আবিষ্কারের সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটাতে, এলোমেলো হয়ে গেল সবকিছু, তারই খেসারত দিতে হচ্ছে সারা বিশ্বকে। মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, খাদ্য কুখাদ্যে পরিণত করেছি আমরা। গড় আয়ুবৃদ্ধির আস্ফালন নানা রোগে ভুগে ভুগে বেঁচে থাকা বোঝাচ্ছে না কি?
সার্বিক আহার যদি করতে পারতাম, তাহলে পথ্য নিয়ে অতটা মাথা ঘামাতে হতো না। বায়ু-পিত্ত-কফের যে সূত্রটা ধরে গাছপালা-আহার্যদ্রব্য— প্রাণীকুল-দৈনন্দিন জীবনযাত্রা- মানুষের সুস্থতা ও অসুস্থতা-রোগ ও রোগীর ঔষধ ও পথ্য প্রভৃতির বিচার-বিশ্লেষণ করে একটা সমন্বয়সূত্র তৈরি হয়েছিল কয়েক হাজার বছর ধরে, সেটাকেই অবলম্বন করে অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির জন্ম হয়েছিল, বলা যায়— বিশ্বের প্রায় সমস্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের, সেটিকে আমরা ফালতু, অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিলাম।
খাদ্যাখাদ্য বিচার, খাদ্য বা পথ্য নির্বাচনের নানা কথা, রান্না প্রভৃতি সম্বন্ধে অনেক কথা বলা হল, এবার কয়েকটি বাছাই করা রোগের পথ্য নিয়ে আলোচনা করা যাক। আগে কী ছিল, বর্তমানে কী হয়েছে, কী হতে পারত, তা নিয়ে দু’চারটি রোগের ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করার ইচ্ছা নিয়ে পথ্যের আলোচনায় আসছি। মনে রাখতে হবে— একই রোগে ভোগা মানুষের বয়স হিসেবে খাদ্য বা পথ্যের হেরফের হবে বা করতে হবে।
রোগ ভেদে পথ্য নির্বাচন
১. জ্বর: আয়ুর্বেদে এটি দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সংক্ষেপে বলা যায়— অখাদ্য-কুখাদ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে, নিয়মমাফিক দৈনন্দিন জীবনচর্চা না মানলে শরীরে যে উত্তাপের সৃষ্টি হয়, তাকে নিজ রোগ বলা হয়।
আরও একপ্রকার হল— অন্য কোনও কারণে বা কোনও রোগের লক্ষণ হিসেবে আসতে পারে, সেটিকে আগন্তু রোগ বলা হয়েছে।
প্রতিটি ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক পথ্যের ব্যবস্থা আছে। আগন্তু রোগ অত্যধিক পরিশ্রম, আঘাত লাগা, মানসিক অস্থিরতা থেকে যেমন হতে পারে, তেমনই শরীরে/ রক্তে অবাঞ্ছিত কোনও কিছু ঢুকলে আগন্তু জ্বর হতে পারে। এটিকেই জীবাণুঘটিত জ্বর (ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, প্রোটজোয়া প্রভৃতি) বলা যায়।
জ্বরের বিভিন্ন অবস্থা মোতাবেক পথ্য নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। প্রথমেই উপবাসের কথা। ‘জ্বরাদৌ লঙ্ঘনম্ পথ্যম্।’ তবে ক্ষুধা থাকলে হালকা খাবার দিতে হবে, উপবাস নয়। যবের মণ্ড, খই, চিঁড়ে, মুড়ি, পালো, মসুরের তুষ, ভাতের মাড়, যবের চাল ও পটলের মণ্ড চিনি, মিছরি বা মধুসহ খেতে হবে। জ্বর একটু পুরনো হলে নানা ফল— আঙুর, বেদানা, ডালিম, কমলালেবু, পানিফল, পাকা পেঁপে, ডাবের শাঁস, খেজুর, পাকা আম, আনারস প্রভৃতি পথ্যের সঙ্গে যোগ হবে। জ্বর ছাড়লে ভাতের মাড় ও দুধ, গলা ভাত ও মাছের ঝোল প্রভৃতি খেতে পারবে। জ্বরান্তিক দুর্বলতায় হালকা খাবার সুসিদ্ধ ভাত, মাছের ঝোল (জ্যান্ত মাছ হলে ভালো), বিভিন্ন প্রকার ফল, সব্জি, সেইসঙ্গে আদার কুচি, সৈন্ধব লবণ, গরম জল প্রভৃতি প্রয়োজন মতো খেতে হবে। এই সময় অতিরিক্ত খাওয়া চলবে না। মল-মূত্র যাতে ঠিকমতো হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। এখানে প্রথম অবস্থায় যা খেতে বলা হয়েছে, তাতে হালকা খাবার ও ফলমূলের তালিকা প্রাধান্য পেয়েছে। এর দ্বারা দ্রুত হজমশক্তি ফিরে আসবে, দুর্বলতা কমতে থাকবে। রোগের কারণমুক্ত হলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন।
রোগীর শরীরকে একটু বিশ্রাম দিতে হয় প্রথমের দিকে। তাতে জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পর শরীর দ্রুত সেরে উঠবে। বর্তমানের লাগামছাড়া পথ্যের ব্যবস্থা সম্ভব হয়েছে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে। প্রথমে সহজপাচ্য জলীয় অথচ পুষ্টিকর পথ্যের ব্যবস্থা করলেই ভালো হতো। পরে পরে তার সঙ্গে নানাপ্রকার খাদ্য যোগ করলেই সুব্যবস্থা হতো। তা সে যেকোনও জ্বর হোক না কেন। রোগীর বয়স, হজম ক্ষমতা, রোগের আক্রমণের মাত্রা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা প্রভৃতি বিচার করে শুধু পথ্য নয় তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সুব্যবস্থা করতে পারলেই ভালো।
২. অজীর্ণ, আমাশা, পেটফাঁপা, অম্ল, কোষ্ঠবদ্ধতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে
সুসিদ্ধ ভাত, যব-বার্লি-পালোর তৈরি দ্রব্য, পেঁপে, ঝিঙে, কাঁচাকলা, উচ্ছে, পটল, কচি বেগুন, কাঁকরোল, চালকুমড়ো, (মাটির তলার জিনিস— আলু, ওল, কচু প্রভৃতি অবস্থা বিশেষে কম পরিমাণে খাওয়া) ছোট ছোট বা মাঝারি ধরনের মাছ, মুগের তুষ প্রভৃতি খেতে হবে। চিঁড়ে, মুড়ি, খই, ছাতু, ডালিম, কিসমিস, পাকা আম, পেঁপে, বেতো শাক, পুদিনা, থানকুনি, হেলেঞ্চা, নিমপাতা, কচি মূলো প্রভৃতি খাওয়া যায়। এগুলি দিয়ে দিনে চারবারের খাওয়ার তৈরি করতে হবে। ডিম বা মাংস অবস্থা বিবেচনা করে হালকা মশলা দিয়ে রান্না করে অল্পমাত্রায় খেতে পারেন। কোষ্ঠবদ্ধতার রোগীরা ওল সিদ্ধ (৫০ গ্রাম আন্দাজ) ভাতের পাতে প্রথমে খেলে ভালো কাজ হয়। রাতে খাওয়ার শেষে ইসবগুলের ভূষি খাবেন ১চা চামচ মাত্রায়। পাকা তেঁতুল, চালতা, আমড়া, কাঁচা আম, কামরাঙ্গা, পাতিলেবু প্রভৃতি দিয়ে টক জাতীয় খাবার তৈরি করে খেতে পারেন।
সহজে হজম হবে, আহারে তৃপ্তি থাকবে, তেল, মশলা, নুন প্রভৃতি কম দিয়ে রান্না করা খাবার খেতে হবে। খাওয়ার পর হজমকারক ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শমতো খাবেন। টোটকা হিসেবে সামান্য মৌরি ও জোয়ান বা আমলকী বা হরীতকী বা যষ্টিমধু খেতে পারেন। সুস্থতা বোধ করলে সবকিছুই পরিমাণমতো খেতে পারেন। তবে সহজে হজম হবে না এমন গুরুপাক দ্রব্য, ময়দার খাবার, অতিরিক্ত তেল-ঘি-চর্বি-নুন-চিনি দিয়ে রান্না খাবার, বাসি, পোড়া খাবার না খাওয়াই ভালো।
৩. অর্শ রোগে: কোষ্ঠ পরিষ্কার হবে, ক্ষুধা ও হজমক্ষমতা ঠিক থাকবে, এমন ধরনের পথ্য বিশেষ উপকারী।
পুরনো লাল ধানের চাল, যব, কুলত্থ কলাই, মুগ, ঘোল, মাখন, রসুন, পুনর্নবা শাক, বেতো শাক, কাঁচা পেঁপে, ওল, মানকচু, পটল, কাঁচা পেঁপে, লেবু, জাম, বেল, কিসমিস, আমলকী, কয়েত বেল, আঙুর, সর্ষের তেল, কচ্ছপ ও ছাগ মাংস, হরীতকী, লঙ্কা বর্জিত তরকারি, মাখন তোলা দুধের দই প্রভৃতি খেতে পারেন। এগুলি দীর্ঘকাল ধরে শাস্ত্র মতে আহারের মোটামুটি একটা তালিকা।
ওল ভাতে দিয়ে দুপুরে খাওয়ার প্রথম পাতে ভাতে মেখে খেতে হবে। পাকা পেয়ারা বিকেলে টিফিনের সময় মাঝারি ধরনের একটা করে খেলে কোষ্ঠসাফ থাকবে। অর্শরোগীর পেট পরিষ্কার না থাকলে সমস্যা বাড়তে থাকবে। শুধু অর্শরোগী নয়, সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য— বাথরুমে গিয়ে দীর্ঘ সময় থাকবেন না। ৫-৭ মিনিটের মধ্যে কাজ সেরে চলে আসতে হবে। দাস্ত পরিষ্কার না হলে বারে বারে যান, কিন্তু একটানা দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না। ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। পছন্দের শাক-সব্জি বেশি পরিমাণে খেতে হবে। অধিক চাপ দিয়ে মল ত্যাগ করবেন না। দিনে অন্তত আড়াই-তিন লিটার জল খাবেন। খুব বেশি তেল-ঘি-মশলা দিয়ে গুরুপাক রান্না না খাওয়াই উচিত। কফি-পোস্ত-সর্ষে চিকিৎসার সময়টুকুতে না খেতে বা কম খেতে পারলে ভালো।
৪. অতিসারে (ডায়েরিয়া): বার বার পাতলা পায়খানা হওয়ার ফলে শরীর থেকে জলীয় অংশ বেরিয়ে যায়। এক গ্লাস জলে এক চা-চামচ, চিনি ও এক চিমটে নুন মিশিয়ে প্রতিবার মল ত্যাগের পর খাওয়াতে হবে। ওআরএস এর ব্যাপক ব্যবহার স্যালাইনের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে। নুন-চিনির শরবত খুবই ভালো। তবে তৈরি করা সম্ভব না হলে ওআরএস তখন প্রাণ বাঁচাবে।
জীবাণুঘটিত কারণে ডায়েরিয়া বা অতিসারের অস্তিত্ব যখন প্রমাণ হয়নি, সেই তখনকার দিনে অতিসারের প্রথমের দিকে লেবুর শরবত, পালোর শরবত, বার্লি, পরে খই-চিঁড়ে-ভাতের মণ্ড প্রভৃতি অবস্থা ভেদে দেওয়া হতো। অতিরিক্ত দাস্ত থেমে গেলে এবং ক্ষুধার উদ্রেক হলে সুসিদ্ধ ভাত বা মণ্ড, কাঁচাকলার মণ্ড; মাগুর, শিঙি ও ছোট ছোট মাছের ঝোল; কচি পটল, কাঁচাকলা, গাঁদালপাতা প্রভৃতি আনাজ, মসুরের তুষ, খোল প্রভৃতি খেতে দেওয়া হতো। আনাজ অল্প খাবে। তার মধ্যে কচি বেগুন, মোচা, কচি মুলো, ডুমুর, থানকুনি, আমরুল শাক, গাজর, কচি ঝিঙা, থোড়, কচি চালতা প্রভৃতি ভালো। ফলের মধ্যে জাম, কয়েতবেল, কাঁচা বেল (পোড়া), ডালিম, কচি তালের শাঁস, কমলালেবু, পাতিলেবু, কাগজি লেবু, মশলার মধ্যে জিরা, ধনে ও হলুদ প্রভৃতি, জলখাবারের সময় বেলের মোরব্বা বা কাঁচা বেল পোড়া গুড় সহ খাওয়ার নির্দেশ আছে। এই রোগে দিবানিদ্রা উপকারী।
ক্রনিক ডায়েরিয়া বা অতিসার দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তখন সেটি পথ্য নির্ভর চিকিৎসাতে নিরাময় হতে পারে। খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। সব খেতে পারেন— এই মন্ত্র আওড়াতে থাকলে কোনওদিনই তা সারবে না। পরিণতিতে সেটি গ্রহণী বা ক্রনিক ডায়েরিয়া অ্যান্ড ডিসপেপসিয়াতে রূপান্তর হবে। তখন এটি সারা জীবনের সঙ্গী হলেও হতে পারে।
৫. উচ্চ রক্তচাপ (হাইপার টেনশন) নিয়ন্ত্রণে
উচ্চ রক্তচাপ, রক্তচাপাধিক্য, ব্যানবায়ু বৈষম্য, হাইপারটেনশন, হাই ব্লাডপ্রেশার প্রভৃতির অর্থ কিন্তু একই, তবে সংক্ষেপে হাইপ্রেশার। কিছুকাল আগে পর্যন্ত ১৬০/৯৫ রক্তচাপ বা প্রেশারকে স্বাভাবিক বলা হতো, এর অধিক হলে হাইপ্রেশার হয়েছে চিকিৎসকরা নিদান দিতেন। তারপর ১৪০/৮০ হল, এখন নাকি ১৩০/৭০ এর একটু উপরে গেলেই প্রেশার বেড়ে গেছে বলে। প্রথমেই ওষুধ ব্যবহার না করে জীবনযাত্রার ধারাটিকে অদল-বদল করে দেখুন।
পথ্যের গোড়ার কথা হল— প্রথমে মানসিক পথ্যের কথা বলা যাক। সামান্য যেসব উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, অবসাদ, বিষণ্ণতা, অশান্তি প্রায় ক্ষেত্রে সকলের জীবনে এসে থাকে, সেগুলিকে বাড়তে দেবেন না, নিজেই কমাতে চেষ্টা করুন অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শকে অবহেলা করলে মুশকিল।
সাধারণ খাবার সাধারণভাবে রান্না করে খান। একবেলা আমিষ তো অন্যবেলা নিরামিষ খান। সপ্তাহে এক বা দু’দিন পুরো নিরামিষ রান্না খেতে পারেন। রাতে মাংস বা ডিম না খেতে পারলে ভালো। মাছ-মাংস-ডিমের যে কোনও একটি খাবেন, একসঙ্গে দুটি বা তিনটি খাবেন না। আমিষ আহারের সঙ্গে দুধ বা দুধ জাতীয় খাদ্য না খেয়ে ৩-৪ ঘণ্টা পরে খান। মাছের সঙ্গে রসুন বা দই দেবেন না। মাংসেও দই পরিত্যাজ্য। স্টু করে খেতে পারলে সবচেয়ে ভালো। তবে নুন ও নোনতা খাবার একেবারেই বর্জন করুন। এছাড়া কমাতে হবে ময়দা ও চিনির ব্যবহার।
একটা কথা বলে রাখা দরকার— একা হাইপ্রেশার কখনওই আসে না। আগে পিছে ৩-৪টি রোগ আসে। মধুমেহ, স্থূলত্ব, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, হাইপ্রেশার প্রভৃতি একসঙ্গে জড়িয়ে ভয়ানক সমস্যা সৃষ্টি করে। প্রথম থেকেই নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও অহেতুক টেনশন না করা এসব সমস্যাকে অনেকটা ঠেকিয়ে রাখতে পারে। লোভ সংবরণই প্রধান ওষুধ ও পথ্য বলতে পারেন। আগে পিছে কেউ এর মতো কিডনি ও থাইরয়েডের সমস্যা কারওর কারওর জীবনটাকে বিষিয়ে তোলে।
খাদ্য বা পথ্য হিসেবে কচি বেগুন, কাঁচা কলা, উচ্ছে, পটল, ঝিঙে, কাঁকরোল, ক্যাপসিকাম, টম্যাটো, থোড়, ডুমুর, লাউ, চালকুমড়ো, থানকুনি, হেলেঞ্চা, তেলাকুচা, কুঁদরি, ব্রাহ্মীশাক, সুষনি শাক, সজনে পাতা, পটলপাতা, কারিপাতা, পুনর্নবা শাক, কচি মূলো, ঢেঁড়শ প্রভৃতি দিয়ে তরকারি খাবেন।
চাল ও ডাল ১০/১২ ঘণ্টা ৫ গুণ জলে ভিজিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে পুনরায় ৫ গুণ জল দিয়ে রান্না করবেন। সর্ষে তেল ও রাইস ব্রান অয়েল ভোজ্য তেল হিসেবে ব্যবহার করুন। যেসব রান্নায় তাপ বেশি লাগে, সেখানে সর্ষে তেলই ব্যবহার করবেন। পোড়া তেল কোনও রান্নায় ব্যবহার করতে নেই। মশলা হিসেবে ধনে, কালোজিরে, মৌরি, মরিচ, মেথি, জিরে, দারুচিনি প্রভৃতি ব্যবহার করবেন। কমবেশি অন্য সব্জি, মশলা প্রভৃতি ব্যবহার করতে পারেন। জল ২-৩ লিটার খাবেন।
তৈলাক্ত মাছ না খাওয়াই উচিত। পোনা মাছ (মাঝারি সাইজের), শিঙি, মাগুর, মৌরলা, শোল, ভেটকি, ইলিশ, ভোলা, পমফ্রেট প্রভৃতি মাছ খাবেন। অন্য মাছ মাঝে মধ্যে খেতে পারেন। দেশি মুরগির হালকা ঝোল সপ্তাহে একদিন ও দেশি মুরগির বা হাঁসের ডিম সপ্তাহে ২-৩টি খাবেন। অন্য সময় মাছ খেলেই হবে।
এ ধরনের পথ্য উল্লেখিত চারটি রোগে খেতে পারেন। তবে থাইরয়েডের সমস্যায় (হাইপো কিংবা হাইপার), কিডনির সমস্যায় পথ্যের আরও একটু বদল ঘটাতে হবে।
৬. কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে
শরীর আপনা থেকেই বেশিরভাগ কোলেস্টেরল তৈরি করে নেয়। বাকি খাওয়া-দাওয়া ও জীবন পরিচর্যার সমস্যা থেকে আসে। এইচডিএল কোলেস্টেরল বাদে বাকি সবগুলোর আধিক্য খুবই খারাপ। আমাদের দেশে এইচডিএল কোলেস্টেরল খুব সহজে বৃদ্ধি পায় না। কোলেস্টেরল ভেদে খাদ্যাখাদ্য বিভাজন এই রকম—
ক) এল.ডি.এল— রিফাইন্ড চাল, সাদা আটা, ময়দা, ওটস, আলু, মাটির তলার সব্জি প্রভৃতি এবং অন্যান্য শর্করাপ্রধান খাদ্য বেশি খেলে এর বৃদ্ধি ঘটে। তেল ও চর্বি জাতীয় দ্রব্য বেশি খেলে টোটাল কোলেস্টেরল ও অন্যান্য কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এলডিএল ততটা বাড়ে না। শর্করাপ্রধান খাদ্য না কমালে এটি হঠাৎ কমবে না। লাল সিদ্ধ চাল, লাল আটা খাওয়া খুবই জরুরি। শরীর মোটা হলে তা কমাবার জন্য এগুলি করতে হবে। যেসব শাকসব্জি এলডিএল কমিয়ে এইচডিএল (ভালো কোলেস্টেরল) এর বৃদ্ধি ঘটায় তা খাওয়া উচিত। ত্রিফলা ভেজানো জল, কাঁচা হলুদ, রসুন, পেঁয়াজ, আমলকী, কচি নিমপাতা, সয়াবিনের দুধ (হাইপোথাইরয়েডিজম থাকলে খাওয়া নিষেধ), মাখন তোলা টক দই বা ঘোল (মাছ-মাংস-ডিমের পাতে নয়), লেবুজাতীয় সব লেবু, সপ্তাহে দু’দিন গরমভাতে আধ চা-চামচ করে গাওয়া ঘি পাতিলেবুর রস দিয়ে মেখে খেতে পারেন। তখন তাতে এইচডিএলের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। দানা শস্য, সবুজ শাকসব্জি— সজনে পাতা, সুষনি শাক, তেলাকুচা, হেলেঞ্চা, কারিপাতা, তেজপাতা, ধনেপাতা, লেটুস, পেঁয়াজ, মরিচ, কালোজিরে, লবঙ্গ, জায়ফল, দারুচিনি, সায়াবিনের ও ছোলার অঙ্কুরিত দানা, মাখন তোলা দই, কম চর্বির মাংস ও হাঁস-মুরগির ডিম সপ্তাহে ২/৩ বার খাদ্য তালিকায় থাকলেই হবে। পেট ভর্তি করে খাবেন না। যা খাবেন তৃপ্তি করেই খাবেন।
এছাড়া পাকা তেঁতুলের টক, কাঁচাআম, আমড়া, চালতা, কয়েতবেল, কামরাঙা, পাতিলেবু, গোঁড়া লেবু, তেঁতুল বা তেঁতুল পাতা, আমরুল শাক, টোপাকুল প্রভৃতির টক বা চাটনি সারা বছর কমবেশি খেতে পারেন। ঝোলে ধনে ও মরিচবাটা ব্যবহার করুন। ফোটার সময় দেবেন। তেলাকুচা শাক ও কুঁদরি, কচি বেগুন ও ঢেঁড়শ একত্রে রান্না করে খেতে পারেন। বেগুন খাওয়া নিষেধ থাকলে খাবেন না। ঢেঁড়শ টক বা চাটনিতে খেলে শরীরে ঢেঁড়শের ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না।
ভাজাভুজি কম খান। বয়স অনুপাতে সহজে হজম হবে সেইরকম রান্না করা খাদ্য খাবেন। পেট ভর্তি করে কখনওই খাবেন না। শত অনুরোধে মাছ-মাংশ-ডিম একত্রে কিংবা এসবের পাতে দই/ আইসক্রিম/ নরম পানীয়, অন্যসময় মিষ্টি দই, সস, জেলি, চকোলেট প্রভৃতি না খেতে পারলে এবং নিজেকে শৃঙ্খলার মধ্যে রেখে অলসতা ত্যাগ করলে হেসে-খেলে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন লাভ করবেন। শুয়ে বসে কাটালে শুধু কোলেস্টেরল নয়, হাজার ব্যাধির আসতে পারে।
ফলের মধ্যে দেশীয় সাধারণ ফল বেশি করে খান। বেশি দামি ফল খাওয়ার প্রয়োজন নেই। শুকনো ফলের মধ্যে আমন্ড, আখরোট, পেস্তা প্রভৃতি অল্প পরিমাণে খেতে পারেন। কুমড়োর বীজ, মগজদানা, ছাড়ানো তিল, পোস্তদানা কমবেশি রান্নায় ব্যবহার করবেন। ময়দা ও বেসন দিয়ে তৈরি খাবার খুব অল্পমাত্রায় খান। একদিন নিজেই বুঝতে পারবেন কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ। মদ্যপান-ধূমপান, এ ব্যাপারে নীরবতা ভালো।
খ) ট্রাইগ্লিসারাইড: অতিরিক্ত আলু, মাটির তলার দ্রব্য, মিষ্টি খাবার, বার বার পালিশ করা চাল, আতপ চাল, ময়দা ও বেসনের তৈরি খাদ্য খেলে এটি বাড়ে। শর্করাজাতীয় খাদ্য ও ট্রান্সফ্যাট রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বৃদ্ধি করে। খাবার দাবারের কথা পূর্বে বলা হয়েছে। শসা ও পেয়ারা, পেঁয়াজ ও কাঁচা লঙ্কা, লেবুজাতীয় ফল নিয়মিত খান। অল্প খরচে লাভ বেশি। সেই সঙ্গে একটু শরীরচর্চা করে মেদ আর ভুঁড়িটা কমাবার চেষ্টা করুন।
কোনওপ্রকার প্রসেসড ফুড, চিপস, পিৎজা, বার্গার, ভাজাভুজি, ফাস্ট ফুড ও জাঙ্কফুড একেবারে বাতিল। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে মুখ বদলের জন্য ন-মাসে ছ-মাসে এক-আধ দিন খাবেন।
জল খাবারে খই, চিঁড়ে, মুড়ি, সুজি, ফাইবার যুক্ত খাবার খান। ময়দাজাতীয় দ্রব্যের খাদ্যদ্রব্য ঘরে বাইরে ছড়াছড়ি, তার উপরে মিষ্টি-নোনতা খাবারের উপদ্রব— সব বয়সের সকলের জন্য এগুলি ক্ষতিকর। আবার একেবারে নিষেধের তালিকায়ও ফেলা যাচ্ছে না। আপনারা নিজেরা ভেবেচিন্তে খাবেন, বাচ্চাদের দেবেন।
সর্বপ্রকার কোল্ডড্রিংকসে, প্রক্রিয়াজাত খাবারে, চুইংগামে মেশানো হয় অ্যাসপার্টেম যুক্ত কৃত্রিম মিষ্টি। সাধারণ চিনির তুলনায় ২০০ গুণ বেশি মিষ্টি। রাসায়নিকভাবে তৈরি করা ওই মিষ্টিতে থাকা এই যৌগটি ক্ষতিকর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন— অ্যাসপার্টেম মেশানো খাদ্য দীর্ঘদিন খেলে মাথার যন্ত্রণা, অস্থিরতা, বুকধড়পড়, ওজনবৃদ্ধি, হতাশা, স্নায়ুর সমস্যা থেকে ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এখন পর্যন্ত মাত্র ৯২ রকমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ধরা পড়েছে।
গ) এইচডিএল: ভারতীয়দের ক্ষেত্রে এটি খুবই সমস্যার। শীতপ্রধান দেশের লোকেদের এটি স্বাভাবিকমাত্রা বেশি। ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড এই ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। সেজন্য রান্নায় কোনওপ্রকার সাদা তেল ব্যবহার করবেন না। অতিরিক্ত তাপে এইসব তেলের মধ্যে থাকা চর্বি জাতীয় পদার্থ স্যাচুরেটেড ফ্যাটে বা ট্রান্সফ্যাটে রূপান্তরিত হয়ে যায়। সেজন্য অলিভ অয়েলেও রান্না করতে নেই। রান্নার পর হালকা গরম অবস্থায় তার উপর সামান্য মাত্রায় ছড়িয়ে দিতে পারেন। সর্ষে তেল বা ধানের তুষের তেল অল্পমাত্রায় মৃদুতাপে রান্না করে খেতে পারলে ট্রান্সফ্যাট শরীরে ঢুকতে পারবে না।
৭. মধুমেহকে বাগে আনতে
সময়মতো হালকা খাবার পরিমাণমতো খেতে হবে।
সকালে দীর্ঘসময় খালিপেটে থাকা যাবে না। (এটা অবশ্য সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।) অল্প অল্প করে বারে বেশি খেতে হবে।
বাইরের খাবার খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
নিয়মিত ব্যায়াম, হাঁটা-চলা করা দরকার।
সুস্থ মনের অধিকারী হতে হলে যা যা করণীয়, তা অতি সাবধানে করা উচিত। ক্রোধ, লোভ, অহঙ্কার, যতটা পারেন কমান।
সবক্ষেত্রেই লোভ সংবরণ করতে হবে, বিশেষত খাওয়া-দাওয়া।
খাদ্যদ্রব্য নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে।
বিরুদ্ধ আহার ত্যাগ করা। একটি সঙ্গে একটি মিশলে যেখানে শরীরে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, সেখানে একসঙ্গে দু’টি দ্রব্য খাওয়া উচিত নয়। উদাহরণ—মাছ-মাংস-ডিম একসঙ্গে খাওয়া, দুধ বা দই এর সঙ্গে কলা এবং টক ফলের সঙ্গে মিষ্টি ফল খাওয়া, উচ্ছে ও পেঁপে একসঙ্গে খাওয়া, মাছের সঙ্গে দই বা রসুন খাওয়া, আদা-রসুন একসঙ্গে খাওয়া, মাছ-মাংস-ডিমের সঙ্গে দুধ বা দই অথবা দুধ থেকে তৈরি দ্রব্যাদি একত্রে খাওয়া প্রভৃতি। এসব না করতে পারলে শরীর সুস্থ থাকবে।
কোল্ড ড্রিংকস (যে কোনও নরম পানীয়), আইসক্রিম, অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য, রেস্টুরেন্টের নানাবিধ মুখরোচক খাবার, নোনতা খাবার একেবারেই না খেতে পারলে ভালো। তবে এসব মাঝেমধ্যে সামান্য খেলেও কোল্ড ড্রিংকস মদ ও ধূমপানের মতো একেবারেই পরিত্যাগ করা উচিত।
প্রসাধন দ্রব্য (নেলপলিশ, লিপস্টিক, কাজল, নানাবিধ ক্রিম ও লোশন, হেয়ার রিমুভার, চুল কালো করার দ্রব্যাদি, দাড়ি কাটার ফেনাযুক্ত সাবান প্রভৃতি) খুব সতর্কভাবে ব্যবহার করুন বিশেষজ্ঞের পরামর্শমতো। এগুলির মধ্যে এমনকিছু যৌগ (কেমিক্যালস) ও প্রিজারভেটিভ থাকে, যা মধুমেহ, চর্মরোগ, অ্যালার্জি, ক্যান্সার প্রভৃতির কারণ হতে পারে।
চিনির চেয়ে বহুগুণ মিষ্টি এমন দ্রব্যে বাজার ছেয়ে গেছে, ভুলেও সেসব ছোঁবেন না।
দীর্ঘসময় রাতের আলোতে থাকা ও মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার মধুমেহকে নিয়ন্ত্রণে আসতে দেয় না। রাতে শোওয়ার সময় মাথার কাছ থেকে ৮-১০ ফুট দূরে মোবাইল রেখে শোওয়া উচিত। রাতে জাগা দিনে ঘুমানো দীর্ঘদিন করতে থাকলে মস্তিষ্কের সমস্যা আসে।
বেশকিছু অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে মধুমেহ সৃষ্টি করে।
অলস জীবনযাত্রা, বর্তমানের খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, স্থূলতা প্রভৃতি মধুমেহ রোগটিকে শরীরের মধ্যে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।
মধুমেহ রোগটি শরীরের নানাবিধ রোগের মিটিং-মিছিল-ধর্মঘট প্রভৃতির আহ্বায়কপদে বিরাজ করছে। মধুমেহ ডাকলে কোনও রোগ চুপ করে থাকতে পারে না। সুগভীর ভালোবাসার টানে কেউ আগে, কেউ পরে সবাই হাজির হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ সুস্থ অবস্থায়েও মেনে চলতে হবে।
ছোলা ভিজানো জল ও ছোলা, সিদ্ধ ছোলা, অঙ্কুরিত ছোলা, সোয়াবিনের দানা থেকে তৈরি দই, মেথি শাক, তেলাকুচা শাক, লেটুস শাক, নটে শাক, গিমে শাক, বেতো শাক, থানকুনি, গাঁদাল, হেলেঞ্চা, কুলেখাড়া, পুনর্নবা শাক, ব্রাহ্মী শাক, লাউ শাক, ধনেপাতা, মেথি ও পিড়িং শাক, সজনে পাতা, যজ্ঞডুমুর, থোড়, লাউ, চালকুমড়ো, বেগুন, উচ্ছে, ঢেঁড়শ, কুঁদরি, কাঁকরোল, কাঁচাকলা, কাঁচা পেঁপে, করলা, পটল, ঝিঙে, টম্যাটো, কচি নিমপাতা, শসা, বাতাবিলেবু, মুসাম্বি, পেয়ারা, কমলালেবু, আপেল, নাসপাতি, জাম ও অন্যান্য মরশুমি দেশি ফল প্রভৃতি কমবেশি খাবেন।
লাল চাল, লাল গমের আটা অথবা সাধারণ সিদ্ধ চাল ও আটা, সুজি, চিঁড়ে-মুড়ি-খই প্রভৃতি হিসেব করে খাবেন। বেশি মাত্রায় খাবেন না। অত্যধিক তৈলাক্ত মাছ না খাওয়াই ভালো। মাছের মাথা ও মাছের ডিম-পারতপক্ষে খাবেন না।
অনেক ভাবনা-চিন্তা-সমীক্ষা দীর্ঘদিন ধরে করার পর মধুমেহ রোগীদের জন্য একটা সার্বিক খাদ্যতালিকা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রয়োজনমতো অদল-বদল করে নেওয়া যেতেও পারে। সব বয়সের রোগীরা, এমনকী যাঁরা হাইপ্রেশার, কোলেস্টেরল, হার্টের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁরাও এই তালিকা অনুসরণ করতে পারেন। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজের মতো করে খাদ্য তালিকা তৈরি করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাওয়া যেতে পারে।
শরীরে তৈরি ইনসুলিনকে কাজ করতে দেয় না— অতিরিক্ত অলস জীবনযাত্রা, বর্তমানের খাদ্যাভ্যাস ও খামখেয়ালি জীবনযাপন, অতিরিক্ত মদ্যপান ও ধূমপান, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মন, আতঙ্ক প্রভৃতি।
এক্ষেত্রে কচি ও মাঝারি নিমপাতা খাওয়া ও চিবিয়ে পেস্ট তৈরি করে দাঁতমাজা এবং রান্নায় বেশির পরিমাণে কারিপাতা ব্যবহার করা, এছাড়া তুলসীপাতা জল দিয়ে গিলে খাওয়া— সকালের যেকোনও সময় ৮/১০টি পাতা ভালো করে ধুয়ে, না চিবিয়ে জল দিয়ে গিলে খান।
অলসতা কাটিয়ে, নেশার দ্রব্য কমিয়ে, বাইরের খাবার পারতপক্ষে না খেয়ে, হালকা ব্যায়াম করতে পারলে— শরীরে তৈরি ইনসুলিন কাজে লেগে যাবে, রক্তবাহী শিরা-ধমনীকে প্রসারিত করে রক্তপ্রবাহকে স্বাভাবিক করবে। প্যানক্রিয়াসের বিটা-সেলকে পুনরুজ্জীবিত করবে।
খাদ্যতালিকা
সকালে— লিকার চা, বিস্কুট, আমন্ড বাদাম।
সকালে টিফিন— মুড়ি, চিঁড়ে, ছোলাভাজা, পেঁয়াজ ও কাঁচালঙ্কা সহযোগে বড় কাপের এক কাপ পান্তা ভাত (আমানি সহ), বাসিরুটি ও দুধ, উপমা প্রভৃতির যে কোনও একটি। লেবুর রস দিয়ে ছাতুর শরবত মাঝে মাঝে খেতে পারেন। পরে যে কোনও ফল একটি।
দুপুরের আহার— ভাত-ডাল-মাছ/ ডিম/ দেশি কচি মুরগির মাংস সপ্তাহে ৪-৫ দিন। বাকি দিনগুলো নিরামিষ। সঙ্গে থাকবে পাঁচমেশালি তরকারি ঢেঁড়শ+ কুঁদরি+ তেলাকুচা পাতার তরকারি (৪-৫টি ঢেঁড়শ, ৪-৫টি কুঁদরি, তেলাকুচার পাতা ২০-২৫টি, এছাড়া অ্যালার্জি না থাকলে কচি বেগুন ১টি)। অন্যান্য সব্জি-বেগুন, উচ্ছে, কাঁচাকলা, শিম, বরবটি, কাঁকরোল, বিনস, নিমপাতা, কারিপাতা, তেজপাতা, বাঁধাকপি, লাউ, থানকুনি, সজনে পাতা প্রভৃতি দিয়ে পছন্দের সব্জি তৈরি করে খাবেন। পাতিলেবু, শসা, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা প্রভৃতি প্রথম পাতে থাকলে খুবই ভালো।
দুপুরে মাছ ১ পিস (৭০-৭৫ গ্রাম) অথবা ডিম ১টা বা মাংস ১০০ গ্রাম হালকা রান্না। একটা পাতিলেবুর রস যেন প্রত্যহ যে কোনওভাবে খাওয়া চাই— কারণ এটি মধুমেহ ও প্রেশার দুটোকেই নিয়ন্ত্রণ করে।
বিকেলে— টক দই-এর শরবত বা ডাবের জল বা যে কোনও একটি ফল।
সন্ধ্যার প্রাক্কালে— মুড়ি, চিঁড়ে ভাজা, খই প্রভৃতির যে কোনও একটি অল্প পরিমাণে।
রাতের আহার— লাল গমের আটার রুটি (আটা ১৫০ গ্রাম আন্দাজ), মাছের ঝোল, পাঁচমেশালি তরকারি প্রভৃতি। অবশ্য ডিম ও মাংস যেভাবে খেতে বলা হয়েছে তাই খেতে পারেন— তবে যে কোনও একটি। সপ্তাহে ৪-৫ দিন। বাকি দিনগুলো নিরামিষ। আটার রুটি (পাঁচমেশালি) তৈরি করতে পারেন। সেখানে গমের আটা ১ কিলো, ছোলা-রাগী-বাজরা-যব মিলিয়ে ৫০০ গ্রাম আটা, মোট দেড় কিলো হবে। দিনেরাতে ভাত/রুটি খাওয়ার পর এক চা-চামচ করে ইসবগুলের ভূষি (মিহিচূর্ণ করে) জলে গুলে খেতে হবে।
দিনে ও রাতের খাবারের মধ্যে ব্যবধান যেন ঘণ্টা দশেক হয়।
চা: আদা, গোলমরিচ, তুলসীমঞ্জরী ফুটিয়ে তাতে চা পাতা মিশিয়ে লিকার চা খাবেন। এতে গ্রিনটিও খেতে পারেন।
৮) ব্রেন ও নার্ভের বিভিন্ন অসুখে
মধুমেহ, কোলেস্টেরল, হাইপ্রেশার প্রভৃতি ক্ষেত্রে যেভাবে পথ্যাপথ্যের বিশ্লেষণ করা হয়েছে, সেভাবেই খাওয়া-দাওয়া করতে হবে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে বার বার যেসব সতর্কীকরণ করা হয়েছে, সেটা মেনে চললেই হবে। অতিরিক্ত রুক্ষ্ম ও গুরুপাক দ্রব্য। লবণ-তিক্ত-কটূ-কষায় রসযুক্ত খাদ্য কম খাবেন। সুষনি শাক, থানকুনি, ব্রাহ্মীশাক, তেলাকুচা শাক প্রভৃতি নিয়মিত খেতে হবে। অবস্থাভেদে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতেই হবে। মাংস বা ডিম বেশি না খেয়ে নানা প্রকারের মাছ খান। শোল মাছ নিয়মিত নানাভাবে রান্না করে খেতে পারেন। আমন্ড, আখরোট, পেস্তা, কুমড়োর বীজের শাঁস, মগজদানা প্রভৃতি মাত্রামতো খান।
৯) অপুষ্টি ও রক্তহীনতায়
দু’টোই অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। পুষ্টিকর খাদ্য খেতে হবে। যেসব দ্রব্য অধিক পরিমাণে ব্যবহার করা যেতে পারে, সেগুলি হল— ভাত, আটার রুটি, ঋতুজ শাক-সব্জি ও ফলমূল। পাকাকলা, সবেদা, কাঁঠাল, তরমুজ, শসা, কাঁচা ও পাকা আম, ফলসা, আঁশফল, লিচু, যে কোনও প্রকার লেবু, কুলেখাঁড়া, ডুমুর, মোচা, রাঙালু, কাঁকরোল, থানকুনি, হেলেঞ্চা, গিমে শাক, বেতো শাক, যেকোনও প্রকার নটে শাক, সজনে পাতা ও ডাঁটা, বিট, গাজর, টম্যাটো (সময়ের), তেলাকুচা শাক, ব্রাহ্মীশাক, নিমপাতা, পুদিনা পাতা, বেগুন-উচ্ছে বা করলা, কাঁচাকলা, শিম, বিনস্, বরবটি, কাঁচা ও পাকা পেঁপে, কুঁদরি, ঝিঙে, পটল, ঢেঁড়শ প্রভৃতি হিসেব করে খাবেন। কাঁচা হলুদ, কচি নিমপাতা, কাঁচা আম, ভীমরাজ শাক, কুলেখাঁড়া, আমন্ড (কাগজি) বাদাম, কারিপাতা, মেথি, মরিচ, খাঁটি খেজুরের গুড়, সয়াবিনের দই, টক দই প্রভৃতি রান্নায় ব্যবহার করবেন।
১০. অ্যালার্জি
এই রোগে পথ্য নির্বাচন খুবই কঠিন। মূলত: যেসব খাদ্য খেলে অ্যালার্জি হওয়ার সম্ভাবনা বা হয়ে থাকে, সেগুলো বাদ দিতে হবে। সার্বিকভাবে খাদ্যের বিধান মেনে চলুন।
১১. কিডনির সমস্যায়
প্রোটিন জাতীয় খাদ্য, নুন, চিনি, তেল যতটা সম্ভব কম খেতে হবে।
প্রাণিজ প্রোটিন একেবারেই নিষিদ্ধ। তবে চর্বিহীন মাংস ও মাছ সামান্য খাওয়া যেতে পারে। পাঁঠা বা খাসির মাংস একেবারেই নয়। এটি প্রোটিন স্টোন তৈরিতে সাহায্য করে।
ইউরিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার অধিক খাওয়া যাবে না। খাদ্যে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস নিয়ন্ত্রিত হলেও ক্যালশিয়াম বেশি পরিমাণে দিতে হয়।
পাথুরি হলে ক্যালশিয়াম নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।
টক জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া যাবে না।
পটাশিয়াম ও ফসফরাস সমৃদ্ধ খাদ্য (যেমন ডাবের জল, ফলের রস, কাজু, কলা, কিসমিস, গুড় প্রভৃতি) না খাওয়াই ভালো।
বয়স ৬০ পেরলে ভাত, রুটি কম খান। অতিরিক্ত তেল, মশলা, মশলাযুক্ত ভাজা ও তেল-মশলা দিয়ে তৈরি নিরামিষ ও আমিষ আহার, একসঙ্গে মাছ-মাংস-ডিম খাওয়া, ছানার মিষ্টি, মিষ্টি দই প্রভৃতি পরিত্যাগ করতে হবে।
ওল, কচু, মানকচু, আমলকী, টম্যাটো, পালং শাক, দুধ, অতিরিক্ত ক্যালশিয়াম প্রভৃতি কিডনি স্টোনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। প্রস্রাবে অ্যাসিডের মাত্রা বেশি হতে থাকলে মাছ-মাংস-ডিম (এমনকী ডিমের সাদা অংশও) খাওয়া বন্ধ করতে হবে। দুধ ও ছানার পরিবর্তে ঘরে-পাতা মাখন তোলা টকদই খাবেন।
প্রোটিন, শর্করা, ফ্যাট, নুন, পটাশিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম, ভিটামিন, জলীয় দ্রব্য, পানীয় জল প্রভৃতি সবসময় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। সেজন্য চিকিৎসক বা ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নিতে পারেন।
ওজন, মানসিক চাপ ও অবসাদ কমাতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম ও শরীরচর্চা করা উচিত। প্রাণায়াম করতে পারলে খুবই ভালো। ছোটখাট বাগান তৈরি, পত্রপত্রিকা-বই প্রভৃতি পড়া, গান শোনা, কিছু লেখালেখি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। অতিরিক্ত আলোতে থাকবেন না। সময়ে খাওয়া, ঘুমানো ও ভোরে ওঠা অভ্যাস করা উচিত। মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার ও রাতজাগা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর।
চা ও কফি কম খাবেন।
শাক-সব্জি ফলমূল খাবেন, কয়েকটি যেমন— পুনর্নবা শাক, পুদিনা পাতা, জোয়ান পাতা, টক পালং, ব্রাহ্মী শাক, লাউ ও লাউ শাক, তেলাকুচা শাক, মেথি শাক, চালকুমড়ো, কাঁকুর, গাজর, খোসা সমেত মসুর ডাল, মুগডাল ও কুলঞ্চ কলাইয়ের ডাল, ডালিম, আনারস, কমলালেবু, পানিফল, আখ, আঙুর, ভুট্টা, আদা ও শুঁণ্ঠ প্রভৃতি নিয়ম মেনে খেতে পারেন। সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও লবণের সমন্বয় রক্ষায় এবং অ্যামাইনো অ্যাসিডের ঘাটতি পূরণে মেথি শাকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। মেথি শাক সারা বছর ব্যবহার করতে পারেন। যে সময় কাঁচা পাওয়া যায় না, সে সময় শুকনো শাক খাবেন। বাজারে পাওয়া যায়।
কয়েকটি পটাশিয়াম সমৃদ্ধ শাক-সব্জি— যেমন, মুলো ও মুলো শাক, বেগুন, মটরশুঁটি, নটে, লাল নটে, বাঁধাকপি প্রভৃতি খেতে চাইলে হালকা ভাপিয়ে জল ফেলে খাওয়া দরকার। গাজর ও কমলালেবু পটাশিয়াম ও সোডিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য, তবে মাত্রা মতো খাওয়া যেতে পারে। পালং শাক, সর্ষে শাক, ছোলা শাক প্রভৃতি ভালোভাবে ভাপিয়ে জল ফেলে দিয়ে খেতে হবে। ওল, কচু, মানকচু না খাওয়াই ভালো। টম্যাটোর চাটনিতে পুরানো তেঁতুল দিয়ে ফুটিয়ে খাবেন।
১২. ক্যান্সার প্রতিরোধে
মনে ভয় ধরিয়ে দেবার মতো যত রোগ আছে, তার মধ্যে ক্যান্সার অন্যতম। খাদ্য, প্রসাধন, বিভিন্ন নেশার দ্রব্য, ওষুধ, জীবনযাত্রা, কাজের ক্ষেত্র, আবহাওয়া প্রভৃতির হেরফেরে রোগটি হতে পারে। দ্রুত পরিবর্তনশীল খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা আমাদের ধ্বস্ত করে দিয়েছে। দু’একটা উদাহরণ দেওয়া যাক— যে দুধে ভিটামিন-ডি ও ক্যালশিয়াম থাকে তাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়, ক্যান্সার প্রতিরোধে ও চিকিৎসায় সাহায্যকারীর ভূমিকা রয়েছে, সেই দুধ খাওয়ার হেরফেরে ক্যান্সার আসতে পারে। যে হলুদ আমাদের মুখ থেকে পায়ু পর্যন্ত অংশটির ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সক্ষম, সেই হলুদ তেলে পুড়ে বাদামি বা কালো রঙের হয়ে গেল, সেটিই ক্যান্সারের কারণ হয়ে যায়। প্রথমত, আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্য তৈরির পদ্ধতিতে ভুল থাকলে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
ডাল ১০-১২ ঘণ্টা ৫ গুণ জলে ভিজিয়ে রাখার পর ভালোভাবে চটকে ধুয়ে পুনরায় ৫ গুণ জল দিয়ে রান্না করুন। পলিপ্যাক ও খবর কাগজে মুড়ে মাছ-মাংস, ভেজা- শাক-সব্জি, তেলতেলে দ্রব্য রাখবেন না। শাক-সব্জি, মাছ-মাংস-ডিম, ঘি, মিষ্টি দ্রব্য, দুধ-দই, পানীয় জল, ফলমূল, মশলাপাতি সবেতেই বিষাক্ত দ্রব্য মিশে আছে। তারপর ভেজাল দ্রব্যের ছড়াছড়ি। বিরুদ্ধ আহার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, মেটাবলিক কর্মকাণ্ডকে তছনছ করে দিতে পারে। যেমন আদার সঙ্গে রসুন, মাছের সঙ্গে দুধ-দই-রসুন, মাংসের সঙ্গে দুধ বা দই, পেঁপের সঙ্গে উচ্ছে, দুধের সঙ্গে কলা, টক ফল-মিষ্টি ফল একসঙ্গে খাওয়া, আমিষ খাদ্য খাওয়ার ঠিক পরে পরেই দুধ বা দুধ জাতীয় কোনও খাদ্য খাওয়া যাবে না, খেতে পারেন ঘণ্টা চারেক পরে। মিষ্টি দই না খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
ক্যান্সার প্রতিরোধ/ প্রতিকারে নির্বাচিত দ্রব্যাদি
১. নটে/ চাঁপানটে, মেথি শাক, পালং শাক, লেটুস, ব্রকোলি, কচি মুলো ও মুলো শাক, পুঁইশাক ও বিটুলি প্রভৃতি অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ ও ক্যান্সার প্রতিরোধক।
২. সর্ষে শাক— প্রোস্টেট, ব্রেস্ট, কোলন ও ওভারির ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে।
৩. ফুলকপি— হলুদ জলে সিদ্ধ করে জল ফেলে রান্না করতে হবে। ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধক ও ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিকে হ্রাস করে। বাঁধাকপি হলুদ জলে ভাপিয়ে জল ফেলে রান্না করলে তখন এর মধ্যে থাকা সায়ানিন নষ্ট হয়ে যায়, কোলন ক্যান্সারের প্রতিষেধক ও প্রতিকারক হয়ে ওঠে।
৪. গাজর— কাঁচা ও রান্না করে খেতে হবে। লাল ও হলুদ উভয় রঙের গাজর ব্যবহার করবেন। এটি ফুসফুস, কোলন ও প্রস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধজ্ঞ।
৫. বিট, ব্রাহ্মীশাক, পাকাকলা, কমলালেবু, লেবুজাতীয় ফল, আম, বেল, খেজুর, নারকেল, বেদানা, নাসপাতি, পেঁপে, মুসাম্বি, আখরোট, আপেল, আঙুর, আনারস, শসা, আমলকী, আমন্ড প্রভৃতি নিয়মমাফিক খেলে ক্যান্সার প্রতিরোধ হয়।
৬. টম্যাটো, তরমুজ— এ দুটিতে যথেষ্ট পরিমাণে লাইকোপিন থাকায় ঘাড়, মাথা, ব্রেস্ট, মূত্রযন্ত্র প্রভৃতি স্থানের ক্যান্সার প্রতিরোধক। তবে সময় বুঝে টম্যাটো খাওয়া উচিত।
৭. পুদিনা: লিভার, ব্রেস্ট, প্যানক্রিয়াস, ফুসফুস, কোলন ও ত্বকের ক্যান্সার প্রতিরোধক।
৮. রসুন ও পেঁয়াজ: সর্বপ্রকার ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর। বিশেষত মুখ, যকৃৎ, পাকস্থলী, ফুসফুস, ইসোফেগাস, কোলন প্রভৃতি ক্যান্সার প্রতিরোধক। তবে খাওয়ার নিয়ম মেনে খাওয়া প্রয়োজন।
৯. হলুদ, নিম, লঙ্কা, ক্যাপসিকাম, কারিপাতা, ঝলসানো আলু, আদা, মরিচ, দারুচিনি, কালোজিরে, রাঁধুনি প্রভৃতির ক্যান্সার প্রতিরোধক গুণ রয়েছে।
১০. গোরুর দুধ, ঘরের পাতা টকদই, ছানার জল, ছাগলের দুধ প্রভৃতি ক্যান্সার নাশক।
১১. চিরতা, ত্রিফলা, আমলকী, তুলসী, মঞ্জিষ্ঠা, আলফা আলফা, যষ্টিমধু, জিন সেং, তিসির তেল, রাইসব্রান অয়েল, অলিভ অয়েল প্রভৃতি কমবেশি নানা প্রকার ক্যান্সারকে প্রতিহত করতে পারে। এগুলির সঠিক ব্যবহার ক্যান্সার ছাড়া আরও নানা প্রকার রোগ সারাতে সক্ষম।
১২. ধান/ চাল, গম/ গমের চারা, ওটস, গমের ভূষি প্রভৃতি ক্যান্সার প্রতিরোধক। ত্রিফলার সিরাপ, নিমপাতার ক্বাথ, হলুদের গুঁড়ো, চিরতা ভেজানো জল প্রভৃতি যে ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে, তা প্রমাণিত। পেঁপের পাতা নিয়ে ক্যান্সার ও ডেঙ্গুর উপর গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে। ক্যান্সার প্রতিরোধে ব্যবহৃত সবকিছুই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা-সম্পন্ন।
আমাদের সুস্থতার জন্য খাওয়া-দাওয়ার দিকে যেমন নজর দিতে হবে, তেমনই দৈনন্দিন জীবনযাত্রার দিকেও নজর দিতে হবে। যা সহজে এড়িয়ে যেতে পারেন, তা মেনে চলাটা মোটেই কষ্টকর নয়। অতিরিক্ত নেশার দ্রব্য, রাত জাগা, দিবানিদ্রা, চিকিৎসকের পরামর্শছাড়া নানা প্রকার ব্যথার, অ্যান্টিবায়োটিকস, স্টেরয়েডস, ঘুম ও অ্যালার্জির ওষুধ প্রভৃতি অনিয়ন্ত্রিতভাবে খাওয়া এই রোগটির আসার পথটিকে মসৃণ করে তোলে। মানসিক টানাপোড়েন ও অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ, অত্যধিক টিভি দেখা, মোবাইল ও ইন্টারনেটের যথেষ্ট ব্যবহার, সেইসঙ্গে পরিবেশ দূষণ-বায়ু-জল-শব্দ, আলোর দূষণ প্রভৃতি আমাদের শরীরের পক্ষে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর। পথ্যের যে নিয়ম সূত্রটা এখানে দেওয়া হল, সেটি বিবেচনা করে নানাবিধ রোগের পথ্য নির্বাচন করতে অসুবিধা হবে না আশা করি।
লেখক ভারত সরকারের আয়ুর্বেদ গবেষণা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত
চিকিৎসা বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, বনৌষধি গবেষক, আয়ুর্বেদ চিকিৎসক।
যোগাযোগ: ৯৮৭৫৫০৫৩৩৯