Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ফের যোগদান মেলা: আতঙ্কিত আদিরা

এসআইআর কি বিজেপিকে বাংলায় ‘ডিভিডেন্ট’ দেবে না! ফের যোগদান মেলার কথা বলায় এই সংশয় তৈরি হয়েছে। বিএলএ নিয়োগের পরিসংখ্যানে দিল্লি বিজেপি বুঝেছে, বোল্ড আউট করার আশায় দেওয়া ফুলটস বলটি রাজ্যের শাসক দল সপাটে পুল করে পাঠিয়ে দিয়েছে সীমানার বাইরে।

ফের যোগদান মেলা: আতঙ্কিত আদিরা
  • ১৫ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: এসআইআর কি বিজেপিকে বাংলায় ‘ডিভিডেন্ট’ দেবে না! ফের যোগদান মেলার কথা বলায় এই সংশয় তৈরি হয়েছে। বিএলএ নিয়োগের পরিসংখ্যানে দিল্লি বিজেপি বুঝেছে, বোল্ড আউট করার আশায় দেওয়া ফুলটস বলটি রাজ্যের শাসক দল সপাটে পুল করে পাঠিয়ে দিয়েছে সীমানার বাইরে। একেবারে ওভার বাউন্ডারি। এই অবস্থায় বাংলায় লড়তে গেলে অন্যের দল ভাঙানো ছাড়া গতি নেই। সেই লক্ষ্যেই বিজেপির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বনসল আসানসোলের কর্মিসভায় বলেছেন, ‘ছাব্বিশেও যোগদান মেলা হবে। দলকে বাড়াতে হবে। সেই কাজে কেউ বাধা দিলে যেন তাঁকে জানানো হয়।’ একথার অর্থ, ছাব্বিশের নির্বাচনেও ‘ভাড়াটে সৈন্য’ই বিজেপির ভরসা। 

Advertisement

একুশের নির্বাচনে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টকে দিয়ে গেরুয়া ঝড় তুলে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করলেও বিজেপির ভরসা ছিল ভাড়াটে সৈনিক। সেই উদ্দেশ্যেই তারা রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলে ব্যাপক ভাঙন ধরিয়েছিল। কারও সামনে ছিল পদের টোপ, কারও ছিল এজেন্সির ভয়। শুধু বিরোধী দলের নেতাদেরই নয়, কয়লা মাফিয়া, বালি কারবারি সবাইকে দলে নিয়েছিল। রাজ্যজুড়ে পাইকারি হারে হয়েছিল যোগদান মেলা। মেলা থেকে সস্তায় বাঁশি কিনলে যা হয় দলবদলুদের নিয়ে বঙ্গ বিজেপির সেটাই হয়েছিল। মানুষের কান ঝালাপালা করে সারা রাস্তা বাঁশি বাজিয়েছিল। কিন্তু বাড়ি পৌঁছনোর আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বাঁশির আওয়াজ। দাম দিয়ে কেনা বাঁশি তখন শুধুই ‘কাঠি’। 
বাংলায় মুখ থুবড়ে পড়ার জন্য ‘ভাড়াটে সৈনিকে’র উপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতাকেই দায়ী করেছিল বিজেপির একাংশ। আদিদের বাদ দিয়ে টিকিট দেওয়া হয়েছিল দলবদলুদের। তবে, বেশিভাগই জিততে পারেননি। কিছু দিনের মধ্যেই কেউ জিতে, কেউ জিততে না পেরে ফের তৃণমূলে ঢুকেছেন। তাতে বিজেপির জাত গিয়েছিল, কিন্তু পেট ভরেনি। সেই কারণেই চব্বিশের লোকসভা ভোটের আগে বঙ্গ বিজেপি যোগদান মেলা করেনি। কিন্তু এবার হবে। সেই মতো দলীয় নেতৃত্বকে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন বিজেপির বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। আর এব্যাপারে কেউ বাধা দিলে যে তাকে রেয়াত করা হবে না, সেটাও তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। 
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ছাব্বিশের ভোটের আগে বিজেপি হঠাৎ করে ‘যোগদান মেলা’ করতে চাইছে কেন? পরিসংখ্যানে স্পষ্ট, ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য বিজেপি সর্বত্র বুথ লেভেল এজেন্ট দিতে পারেনি। বুথ সশক্তিকরণের হোমটাস্ক দিয়েছিল দিল্লি বিজেপি। সেখানেও কারচুপি করেছিল অধিকাংশ সাংগঠনিক জেলা। জল মিশিয়েও সদস্যপদ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছে বঙ্গ বিজেপি পৌঁছতে পারেনি। তখন গোটা বিষয়টিই ছিল বিজেপির ভিতরের ব্যাপার। কিন্তু বিএলএ দিতে বঙ্গ বিজেপি ব্যর্থ হওয়ায় বাংলায় সংগঠনের হাল কী, সেটা বুঝেছে দিল্লি। 
এসআইআর শুরু হতেই বহু বুথে বিএলও-র সঙ্গে থাকছেন কেবলমাত্র তৃণমূলের বিএলএ। এই অবস্থায় নির্বাচন কমিশন বিএলএ দেওয়ার নিয়মের বদল এনেছে। এতদিন নিয়ম ছিল, সংশ্লিষ্ট বুথের ভোটারকেই বিএলএ করতে হবে। কমিশনের নতুন নিয়মে বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার হলেই বিএলএ করা যাবে। অভিযোগ, বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিতেই নিয়ম বদলানো হয়েছে। নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে বিজেপির সুবিধে হবে, এমন অনেক সিদ্ধান্ত যে কমিশন নেবে, তাতে কোনও সংশয় নেই। 
বাংলায় বিজেপিকে লড়তে হবে তৃণমূল কংগ্রেসের মতো তিনবারের ক্ষমতায় থাকা একটা দলের সঙ্গে। দুর্বল সংগঠন দিয়ে যে সেটা সম্ভব নয়, তা বনসলজি খুব ভালো করেই বুঝেছেন। তাই ফের যোগদান মেলাকেই আঁকড়ে ধরতে চাইছেন। কারণ লোকসভা ও বিধানসভার ভোটের প্রেক্ষিত ভিন্ন। লোকসভায় নরেন্দ্র মোদিকে সামনে রেখে ভোট করে বিজেপি। ইন্ডিয়া জোটের কোনও বলিষ্ঠ মুখ তৈরি হয়নি। তারই সুবিধে পায় বিজেপি। একই কারণে বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে অ্যাডভান্টেজ তৃণমূলের। এখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে টক্কর নেওয়ার মতো কোনও মুখ এখনও তৈরি হয়নি। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির ভোটের ফারাক দূর করার একটাই রাস্তা, অন্যের দল ভাঙিয়ে নেতা আনা। বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছে, শাসক দলের সাংগঠনিক এবং পুরসভার চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান বদল তাদের সামনে দল ভাঙানোর একটা সুযোগ এনে দিতে পারে। 
লোকসভা নির্বাচনে এ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল সাফল্য পেলেও অধিকাংশ পুরসভা এলাকায় বিজেপির থেকে তারা পিছিয়ে রয়েছে। তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই বলেছিলেন, যে সমস্ত নির্বাচিত প্রতিনিধিকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে তাঁদের কাজের পর্যালোচনা করা হবে। যাঁরা মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন না, তাঁদের সরে যেতে হবে। তখন অনেকে সেটাকে কথার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু, এখন সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। মূলত ভোটে হেরেছে-এমন এলাকার নেতাদের সরানো হচ্ছে। সাংগঠনিক পদে রদবদল আগেই হয়েছে। এখন চলছে পুরসভার মুখ বদলের কাজ। 
তৃণমূল নেতৃত্ব মনে করছে, সরকারের কাজে সাধারণ মানুষ সন্তুষ্ট। কৃষকবন্ধু ছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধিকাংশ সামাজিক প্রকল্পের সুযোগ গ্রাম এবং শহর উভয় এলাকার মানুষই পাচ্ছে। গ্রামের মানুষ তৃণমূলকে ঢেলে ভোট দিচ্ছে, কিন্তু শহরে সেটা হচ্ছে না। তার অনেকগুলি কারণ আছে। সবচেয়ে বড় কারণ শহরের কিছু নেতার দুর্ব্যবহার। এছাড়া পুকুর ভরাট, রাস্তাঘাট মেরামতি, যত্রতত্র বহুতল নির্মাণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলিতে যথাযথ পদক্ষেপ করছে না। তবে, পদ ভাঙিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির ব্যাপারে কেউ কারও চেয়ে কম যাচ্ছে না। তাতে মানুষের মধ্যে স্থানীয় নেতৃত্বকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার একটা মানসিকতা তৈরি হয়েছে। দলকে তারই খেসারত দিতে হচ্ছে। 
ইতিমধ্যেই বেশকিছু পুরসভার চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান বদল হয়েছে। তৃণমূল সূত্রের খবর, সেই তালিকায় রয়েছে রাজ্যের ৪২টি পুরসভা। রাজ্য থেকে জেলা সভাপতিদের কাছে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান বদলের  তালিকা পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যাঁদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাঁরা সকলে অযোগ্য, এমনটা নয়। কারও কারও বিরুদ্ধে গোপনে বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও রয়েছে। তাই দলের ভিতরে থেকে সাবোতাজ করার রাস্তাটা বন্ধ করে দিতে চাইছে। কারণ যাই হোক না কেন, যাঁদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাঁরা যে ক্ষুণ্ণ হবেন, তাতে কোনও সংশয় নেই। তবুও দলের নির্দেশ মেনে তাঁরা পদত্যাগপত্র জমা দিচ্ছেন। এখনও পর্যন্ত বনগাঁ, এগরা, ডালখোলা পুরসভায় দলীয় নির্দেশ অমান্য করার ঘটনা সামনে এসেছে। ‘বিদ্রোহী’রা হয়তো শেষপর্যন্ত দলীয় নির্দেশ মানবেন। তবে, যাঁদের সঙ্গে গেরুয়া শিবিরের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে তাঁরা দলবদলু হতে পারেন। 
একথা ঠিক, দীর্ঘদিন প্রশাসনিক এবং সাংগঠনিক পদে থাকলে অনেকের মধ্যে কাজ করার উদ্যম কমে যায়। তাঁদের বিরুদ্ধে তৈরি হয় ক্ষোভ। রদবদলে সেই ক্ষোভের ক্ষতে অনেক সময় প্রলেপও পড়ে। সম্ভবত সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই রাজ্যের শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা দরকারও ছিল। তবে টাইমিংটা নিয়ে দলের অনেকের প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, এটা আরও আগে করলে ভালো হতো। কারণ ক্ষমতাচ্যুত হলে কিছু পাওয়ার লোভে দলবদলু হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। আপাতত বিজেপির লক্ষ্য, সেই ক্ষমতাচ্যুত ও ক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতৃত্ব। 
বিহারের নির্বাচনে বিজেপি জোট বিপুল সাফল্য পেয়েছে। তাই কিছুদিনের জন্য বাংলায় বিজেপির লাফালাফি বাড়বে। এর আগে ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশায় জেতার সময়েও একই ঘটনা ঘটেছিল। এবারও বঙ্গে বিজেপি একটা গেল-গেল হাওয়া তোলার চেষ্টা করবে। কেউ কেউ প্রভাবিত হয়ে বিজেপিতে নামও লেখাবেন। কিন্তু তাতে বিজেপির খুব একটা সুবিধে হবে না। কারণ এখানে মানুষ তৃণমূলকে ভোট দেয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে। 
যোগদান মেলার খবরে তৃণমূলের কপালে ভাঁজ না পড়লেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে পদ্ম শিবিরে। কারণ শুধু পাকিস্তানেই নয়, ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ হয় বিজেপির অন্দরেও। আর সেটা সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারছেন দিলীপ ঘোষ। একদা বিজেপির মধ্যমণি দলবদলুদের দাপটে সাইড লাইনেও জায়গা পাননি। স্থান হয়েছে গ্যালারিতে। তিনি এখন শুধুই ‘দর্শক’।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ