মা বলতে ভক্ত এতো মত্ত হন কেন? মার কাছে যে আবদার বেশী। ভক্ত একা থাকতে ভালবাসে না কেন? এক গাঁজা খেয়ে গাঁজাখোরের সুখ হয় না। ভক্তও গাঁজাখোরের মতো একা মার নাম করে তেমন আনন্দ পায় না। যোগী সন্ন্যাসীরা সাপের জাত। সাপ নিজের জন্য কখনও গর্ত করে না, ইঁদুরের গর্তে থাকে, একটা গর্ত ভাঙলে আর একটায় যায়। যোগী সন্ন্যাসীরাও সেই রকম নিজের জন্য ঘর করেন না। পরের ঘরে আজ এখান, কাল সেখান করে দিন কাটিয়ে দেন। গরুর দলে অন্য জন্তু ঢুকলে গরুরা তাকে গুঁতিয়ে তাড়িয়ে দেয়, কিন্তু গরু এলে সকলে তার গা চাটাচাটি করে; সেই রকম যখন ভক্তের সঙ্গে ভক্তের দেখা হয়, তখন তাঁরা উভয়ে আনন্দ পান ও সে সঙ্গ ত্যাগ করতে ইচ্ছা করেন না; কিন্তু অতক্ত এলে তার সঙ্গে মিশেন না।
সাধু হলেই সাধুকে চিনতে পারে। যে সূতোর কাজ করে, সে সূতো দেখলেই কোন্ নম্বরের সূতো বলে দিতে পারে। একজন সাধু সমাধিস্থ হয়ে রাস্তার ধারে পড়ে আছেন। এমন সময় একজন চোর দেখে আপনা-আপনি বলতে লাগলো, “এ নিশ্চয়ই চোর, সমস্ত রাত্রি চুরি করে এখন পড়ে আছে, এক্ষুনি পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যাবে, আমি পালাই।” একজন মাতাল দেখে বললে, “সমস্ত রাত্রি মদটদ্ টেনে খানায় পড়ে আছে, আমি পড়্ছিনি বাবা।” শেষে একজন সাধু দেখে চিনলো যে, ইনি সমাধিস্থ হয়ে পড়ে আছেন ও তাঁর পদসেবা করতে লাগলেন।
অন্যকে মার্তে হলে ঢাল তলোয়ারের দরকার হয়, কিন্তু নিজেকে মার্তে হলে সামান্য একটা নরুন দিয়ে হয়। লোককে শিক্ষা দিতে হলে অনেক শাস্ত্র পড়তে হয়; কিন্তু নিজের ধর্মলাভ একটা কথায় বিশ্বাস করলেই হয়। যে পুকুরে অল্প জল, তার ওপর থেকে আস্তে আস্তে জল খেতে হয়, নাড়াতে নেই। নাড়ালে তার ভিতর থেকে ময়লা উঠে জল ঘোলা করে ফেলবে। যদি পবিত্র হতে চাও, তবে তুমি বিশ্বাস করে সাধনা করতে থাক মিছে শাস্ত্র বিচার, তর্ক করো না, ক্ষুদ্র মন গুলিয়ে যাবে।
এক বাগানে দু’জন লোক বেড়াতে গিয়েছে। তার ভিতর যার বিষয় বুদ্ধি বেশী, সে ঢুকেই বাগানে কটা আম গাছ, কোন গাছে কতো আম আছে, বাগানটার কতো দাম হতে পারে, এইরকম বিচার করতে লাগলো আর একজন মালির সঙ্গে ভাব করে গাছতলায় বসে একটি করে আম পাড়তে লাগলো আর খেতে লাগলো। বলো দেখি কে বুদ্ধিমান? আম খাও পেট ভরবে, কেবল পাতা গুণে কিম্বা হিসাব কিতাব করে লাভ কি? যাঁরা জ্ঞানাভিমানী, তাঁরা শাস্ত্রীয় মীমাংসা তর্ক যুক্তি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, বুদ্ধিমান লোক ঈশ্বরের সঙ্গে ভাব করে এ সংসারে পরমানন্দ ভোগ করেন।
কাঁচা ময়দা গরম ঘিয়ে ফেলে দিলে কল্কল্ করে শব্দ হয়, কিন্তু ময়দা যতো ভাজা হতে থাকে তত শব্দ কম হয়ে আসে। ভাজা হলে আর শব্দ হয় না। অল্প জ্ঞান পেয়ে মানুষ বক্তৃতা দিতে ও বাহ্য আড়ম্বর করতে থাকে, কিন্তু পুরো জ্ঞান হলে তখন আর আড়ম্বর থাকে না। সংসারের মধ্যে বাস করে যিনি সাধনা করতে পারেন, তিনিই ঠিক বীর সাধক।


