সংবাদদাতা, রামপুরহাট: মঙ্গলবার নববর্ষকে স্বাগত জানতে যখন উৎসব মুখর বাঙালি, ঠিক তখনই রামপুরহাট পুরসভার ১ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের রেলের জায়গায় থাকা বস্তিবাসীদের ঘরে নেমে এল কালো আঁধার। এদিনই রেলের পক্ষ থেকে এলাকায় নোটিস সাঁটিয়ে বৃহস্পতিবারের মধ্যেই জায়গা খালি করার জন্য বলা হয়েছে। নচেৎ শুক্রবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে। সেক্ষেত্রে বস্তিবাসীদের মালপত্রের ক্ষয়ক্ষতির জন্য রেল দায়ী থাকবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই নিয়ে রেলের এই চূড়ান্ত অমানবিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা শুরু হয়েছে সর্বস্তরে। কালবৈশাখীর এই সময়ে ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে দিশাহারা অবস্থা হয়েছে বস্তিবাসীদের। এমত অবস্থায়, আগে পুনর্বাসন পরে উচ্ছেদের দাবিতে সরব হয়েছেন তাঁরা।
বেশ কিছুদিন ধরে রামপুরহাটে রেল জায়গা খালি করতে অভিযান জারি রয়েছে। ইতিমধ্যে স্টেশন চত্বর এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে তারা। এবার স্টেশন সংলগ্ন রেলের জায়গায় বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করার লক্ষ্য তাদের। রামপুরহাট পুরসভার ১ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ড লাগোয়া রেলের জায়গায় দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে বসবাস করছেন প্রায় ২৫০ দুঃস্থ পরিবার। এঁদের কেউ পরিচারিকার কাজ করেন। কেউবা ঘুরে ঘুরে মহিলাদের হাতের চুড়ি বিক্রি করেন। কেউবা হোটেল সহ নানা দোকানে দিনমজুরের কাজ করেন। এর আগে গত আগস্ট মাসে রেলের জায়গা খালি করতে নোটিস সাঁটানো হয়। পুনর্বাসন না দিয়ে উচ্ছেদ নয়, এমন দাবি করে বিক্ষোভ ও স্টেশন ম্যানেজারের মাধ্যমে রেলের একাধিক দপ্তরে স্মারকলিপি জমা দেয় তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি, কংগ্রেস ও সিপিএম। কিন্তু রেল উচ্ছেদের পক্ষেই অনড় থাকে। সকলে মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুললে পিছু হটে রেল। ঈদের আগেও একইভাবে উচ্ছেদের নোটিস দিয়েছিল রেল। এবার বৃহস্পতিবারের মধ্যেই জায়গা খালি করার জন্য নোটিস দেওয়া হল।
সোমবার রাত থেকে বৃষ্টি হয়েছে। তার উপরে কালবৈশাখীর এই সময় উচ্ছেদের নোটিসে ঘুম উড়েছে তাঁদের। ট্রেনে হকারি করেন পঙ্কজ সিনহা। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবারের মধ্যেই জায়গা খালি করতে বলেছে রেল। এখন যাব কোথায়? সাধ্যের মধ্যে ঘর ভাড়াও পাচ্ছি না। সাত হাজার টাকার নীচে কেউই ভাড়া দিতে চাইছে না। সামান্য আয়ে সংসার চালানোই দায়, তার উপরে এত ভাড়া কোথায় পাব? আমাদের থাকার ব্যবস্থা তো রেলকেই করতে হবে। মাটির ভাঁড় বিক্রি করে সংসার চালান সন্তোষ পণ্ডিত, বিজয় পণ্ডিত, দিলীপ পণ্ডিতরা। তাঁরা বলেন, বহু বছর ধরে রেলের জায়গায় ঝুপড়ি বানিয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে বসবাস করে আসছি। আমাদের জায়গা কিনে বাড়ি বানানোর ক্ষমতা নেই। আমরা সরতে রাজি। কিন্তু রেল আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক। নইলে এখন যাব কোথায়?
অন্যদিকে নূরজাহান বিবি বলেন, এলাকায় ঘুরে ঘুরে চুড়ি বিক্রি করি। স্বামী মারা গিয়েছে। ঝুপড়ি বাড়িতে মেয়ে ও ছোট নাতি-নাতনি নিয়ে থাকি। প্রখর রোদ ও গরমের এই সময় এখন কোথায় যাব। তাই থাকার ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত আমরা উচ্ছেদ করতে দেব না। তাতে যদি আমাদের প্রাণ যায় তো যাবে। এলাকার বাসিন্দা শহর কংগ্রেস সভাপতি সাহাজাদা হোসেন কিনু বলেন, কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম— এসব জাতপাত নিয়েই সবাই ব্যস্ত। কিন্তু মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে কেউ ভাবছে না। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে ওইদিন প্রতিরোধ গড়ে তুলব। অন্যদিকে আইএনটিটিইউসির জেলা সভাপতি ত্রিদিব ভট্টাচার্য বলেন, এত মানুষ কোথায় যাবে? এরাও তো দেশের মানুষ। মানবিকতার দিক থেকে চিন্তাভাবনা করুক রেল।