


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: ক্যান্সারে নতুনভাবে ‘অ্যানসার’ খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেছে রাজ্যের অন্যতম বড়ো মেডিকেল কলেজ এনআরএস। এই চিকিৎসা তথাকথিত কোটি কোটি টাকার ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, কার টি-সেল থেরাপির মতো পরীক্ষামূলক ক্যান্সার চিকিৎসা পদ্ধতি নয়। বরং এতদিনকার প্রচলিত, প্রমাণিত রেডিয়োথেরাপির মাধ্যমেই দেওয়া হচ্ছে।
কর্কট রোগের চিকিৎসকদের একাংশের কাছে অনেক কম জনপ্রিয় হল ব্র্যাকিথেরাপি মেশিন। এই পদ্ধতিতে সেই ‘দুয়োরানি’ ব্র্যাকিথেরাপি ব্যবহার করেই কম সময়ে আক্রান্তদের ‘নীরোগ’ করবার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। এবছর থেকে এখানকার রেডিয়োথেরাপি বিভাগ শুরু করেছে ‘ইন্টারস্টিশিয়াল ব্র্যাকিথেরাপি’। যেখানে লাইন্যাকের মতো সর্বাধুনিক মেশিন দিয়ে শরীরে বাইরে থেকে নয়, বরং ব্র্যাকিথেরাপির মাধ্যমে শরীরের ভিতর দিয়ে প্রয়োগ করা হচ্ছে রেডিয়োথেরাপি।
সূত্রের খবর, প্রাথমিক থেকে তৃতীয় পর্যায় বা স্টেজ থ্রি পর্যন্ত ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর উপর প্রয়োগ করা হচ্ছে এই পদ্ধতির চিকিৎসা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, মাত্র দু-সপ্তাহেই শেষ হয়ে যাচ্ছে এই থেরাপি! সেখানে লাইন্যাক বা লিনিয়র অ্যাক্সিলারেটরের মতো যন্ত্রের মাধ্যমে শরীরের বাইরে থেকে ‘রে’ দিয়ে চিকিৎসা সম্পূর্ণ করতে সময় লাগে কমপক্ষে দেড় থেকে পৌনে দু-মাস।
বিভাগীয় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত অত্যন্ত সুফল দিচ্ছে ‘ইন্টারস্টিশিয়াল ব্র্যাকিথেরাপি’। রোগীরা ভালো আছেন। ক্যান্সারও ছড়ায়নি। এই পদ্ধতিতে রেডিয়েশন দেওয়ার পর অন্তত ১০ ধরনের ক্যান্সারে খুব ভালো ফল মিলছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। এমন কয়েকটি ক্যান্সার হল—বিভিন্ন ধরনের হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সার (ঘাড়, ঠোঁট, জিভ, মুখের বিভিন্ন অংশ ইত্যাদি), জরায়ুমুখ বা সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার, চেস্ট ওয়াল ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রভৃতি।
এনআরএসের রেডিয়োথেরাপির প্রধান ডাঃ সুমন ঘোড়াই বলেন, শুনে আশ্চর্য লাগবে, এই পদ্ধতি শরীরের বাইরে থেকে রে দেওয়ার পদ্ধতির থেকেও বেশি কার্যকর। অনেক বেশি সূক্ষ্ম। কারণ, এখানে রেডিয়োঅ্যাক্টিভ আইসোটোপটি ক্যান্সার আক্রান্তের ক্ষতের কাছেই থাকে। আশপাশের অঙ্গের ক্ষতি কম করে। তবে এক্ষেত্রে চিকিৎসকের সার্জিক্যাল দক্ষতা থাকা অপরিহার্য।
কী করা হয় এই পদ্ধতিতে? কতগুলি ক্যাথেটার টার্গেট বা রোগীর শরীরের ক্যান্সার আক্রান্ত অংশে যুক্ত করা হয়। সেই ক্যাথেটার দিয়ে প্রবেশ করানো হয় রেডিয়োঅ্যাকটিভ আইসোটোপ। বহু চিকিৎসক একে ‘ইমপ্ল্যান্ট’ও বলে থাকেন। ডোজ স্থির করা থাকেই। তা সম্পূর্ণ হলে ক্যাথেটার এবং আইসোটোপ—দুটিই বের করে আনেন চিকিৎসক।
এনআরএস সূত্রের খবর, দিনে দু-বার করে এই পদ্ধতিতে রেডিয়েশন দেওয়া হচ্ছে বাছাই রোগীদের। সকাল ৯টা-সাড়ে ৯টায় একবার। দ্বিতীয়বার ৬ ঘণ্টা পর। এভাবে দু-সপ্তাহ ধরে চলছে চিকিৎসা। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নিঃসন্দেহে এই প্রক্রিয়া প্রচলিত চিকিৎসার তুলনায় ঝুঁকির। কারণ, শরীরের বাইরে থেকে নয়, এখানে শরীরের ভিতর দিয়ে রে দেওয়া হয়। তাই চিকিৎসকের দক্ষতা আবশ্যক। না-হলে রক্তপাত এবং অন্যান্য বিপদ ঘটার আশঙ্কা থাকে। এনআরএসে এই পদ্ধতি লোকাল অ্যানিস্থেশিয়া প্রয়োগ করে করা হচ্ছে। এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, অ্যানিস্থেশিয়োলজিস্টের অভাব মিটলেই জেনারেল অ্যানিস্থেশিয়ার মাধ্যমে এই কাজ হবে। কিছুটা ঝুঁকিও কমবে। বিশিষ্ট ক্যান্সার চিকিৎসক ডাঃ সুবীর গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, সরকারি ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক কাজ হচ্ছে। এনআরএসের রেডিয়োথেরাপির টিমকে অসংখ্য অভিনন্দন।