বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির বোর্ড অব ডিরেক্টরস বা পরিচালন পর্ষদে একজন করে কর্মী ও অফিসার প্রতিনিধি থাকেন। ব্যাঙ্কের নীতি নির্ধারণে তাঁদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকে। তাঁরা মূলত কর্মী ও গ্রাহকদের দাবিদাওয়া তুলে ধরেন ও সেই মতো পদক্ষেপে সহায়তা করেন পর্ষদকে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নরেন্দ্র মোদির সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির পরিচালন পর্ষদে কর্মী ও অফিসার রাখতে রাজি নয়। তাই ধাপে ধাপে তারা ডিরেক্টর পদে এঁদের জায়গা খালি করে দিয়েছে। কর্মচারী সংগঠনগুলির বক্তব্য, সরকারের কর্তারা মুখে বলছেন ব্যাঙ্কগুলিকে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেওয়ার কথা মুখে বলছেন সরকারের কর্তারা। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং দাবি করেছেন, ‘সিংহভাগ মালিকানা সরকারের হাতে থাকলেও ব্যাঙ্কগুলির দৈনন্দিন নীতি নির্ধারণে নাক গলাবে না কেন্দ্র।’ কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি যে স্রেফ কথার কথা, কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত তারই প্রমাণ বলে অভিযোগ কর্মচারী সংগঠনগুলির।
কর্মচারী সংগঠনগুলির মতে, এমন সিদ্ধান্তের একাধিক কারণ রয়েছে। ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ হোক বা গ্রাহকদের স্বার্থবিরোধী কোনও পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে সরাসরি কোনও বিরোধিতা যাতে না আসে, তার জন্যই পর্ষদ থেকে কর্মী ও অফিসার প্রতিনিধিদের সরানো হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। শেয়ার বা মালিকানার অংশীদারিত্ব না থাকলেও ব্যাঙ্কের পরিচালন পর্ষদে থাকার অধিকার আছে কর্মী-অফিসারদের। এই নিয়ম চালু হয়েছে ৫০ বছরেরও আগে থেকে। ব্যাঙ্ককর্মী সংগঠন অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি রাজেন নাগর বলেন, ‘ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের পর আমাদের সংগঠনের অন্যতম দাবি ছিল, ব্যাঙ্কের পরিচালন পর্ষদের শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি রাখতে হবে। কারণ, গ্রাহকদের সঙ্গে কর্মী ও অফিসাররাই প্রত্যেকদিন সম্পর্ক বজায় রাখেন। সরকার আমাদের দাবি মেনে নিয়ে ১৯৭০ সালে প্রত্যেকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের পরিচালন পর্ষদে একজন কর্মী ও একজন অফিসারকে নিয়ে আসে। বছরের পর বছর এই প্রথা চলে এলেও বাধ সাধে মোদি সরকার। ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ এবং সংযুক্তিকরণের মতো সিদ্ধান্তগুলির তীব্র বিরোধিতা করে এসেছে কর্মী সংগঠনগুলি। পরিচালন পর্ষদে আমরা যাতে বেঁকে না বসি, তাই কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নয় কেন্দ্র।’
তথ্য বলছে, স্টেট ব্যাঙ্ক, ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া এবং ব্যাঙ্ক অব মহারাষ্ট্রে ২০১৪ সাল থেকে পরিচালন পর্ষদে কর্মী প্রতিনিধি নেই। ২০১৫ সাল থেকে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব নেই ইউকো এবং ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ায়। পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক, ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্ক, সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে নেই ২০১৬ সাল থেকে। ধাপে ধাপে প্রতিনিধিত্ব সরিয়ে নেওয়া হয় ব্যাঙ্ক অব বরোদা, কানাড়া ব্যাঙ্ক, ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্ক থেকেও। একই কায়দায় ২০১৪ সাল থেকে আধিকারিক প্রতিনিধিও সরিয়ে নেওয়া হয় এসব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে। শূন্যপদগুলিতে নতুন কাউকে আনা হয়নি। অফিসারদের সংগঠন ‘অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক অফিসার্স কনফেডারেশন’র রাজ্য সম্পাদক শুভজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘আমরা মনে করছি, শুধু বেসরকারিকরণ বা সংযুক্তিকরণের বিরোধিতা নয়, বোর্ডে গৃহীত কোনও গ্রাহকবিরোধী সিদ্ধান্ত বাইরে ফাঁস হয়ে যাওয়ার আতঙ্কও তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাদের। এর বিরুদ্ধেও আন্দোলন চলবে।’