তন্ময় মল্লিক: অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে বাঁচানোর ‘অস্ত্র’ হল রক্ষাকবচ। গ্রহের অশুভ প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে অনেকে মন্ত্রপূত তাবিজ ধারণ করেন। ইদানীং রাজনীতিতেও ‘রক্ষাকবচ’-এর চাহিদা ব্যাপক। আর্জি খতিয়ে দেখে বিভিন্ন সময় আদালত নেতাদের ‘রক্ষাকবচ’ দেয়। তা নিয়ে বিতর্ক হয়। তবে হইচই পড়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার নির্বাচন কমিশনারদের ‘রক্ষাকবচ’ দেওয়ায়। প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি ‘স্বশাসিত’ ও ‘নিরপেক্ষ’ সংস্থাকে রক্ষাকবচ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে। তবে এখন বাংলা বুঝছে, নিরপেক্ষ সংস্থাকে ‘স্বেচ্ছাচারী’ করাই রক্ষাকবচ দেওয়ার আসল উদ্দেশ্য। সম্ভবত সেটা উপলব্ধি করেছে সুপ্রিম কোর্টও। তাই কমিশনকে সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, মানুষের হয়রানি বরদাস্ত করা হবে না। বলতে চেয়েছে ‘ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট’।
কমিশনের কাজ কী? দেশ এবং রাজ্যের সরকার নির্বাচনের জন্য জনতার রায় নেওয়া। ভোটার তালিকা সংশোধন করা। নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য কমিশনের হাতে রয়েছে প্রচুর ক্ষমতা। শাসক দল যাতে কমিশনের উপর প্রভাব খাটাতে না পারে তারজন্য সংস্থাটি স্বশাসিত। কমিশন নিরপেক্ষতার স্বার্থে ওসি থেকে ডিজি, বিডিও থেকে মুখ্যসচিবকে সরিয়ে পছন্দের অফিসারকে বসাতে পারে। নির্বাচনের সময় কমিশনই হয়ে যায় অলিখিত প্রশাসক। মনোনীত একটি সংস্থাকে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কারণ সংবিধান বিশ্বাস করে, কমিশন নিরপেক্ষ। প্রতিটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের অভিযোগ শুনে পদক্ষেপ করাই কমিশনের আশু কর্তব্য।
এহেন কমিশনকে রক্ষাকবচের বর্ম পরিয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত নতুন আইন পাশ হয়। আগে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ কমিটিতে থাকতেন প্রধানমন্ত্রী, দেশের প্রধান বিচারপতি এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা। কিন্তু, নরেন্দ্র মোদির সরকার সেই কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়েছেন। পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর থাকার ব্যবস্থা করেছেন। তাতে বিজেপির কী সুবিধা? কেন্দ্রের শাসক দল নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে নির্বাচন কমিশনার পদে মনোনীত করতে পারবে। এখানেই শেষ নয়, নতুন আইনে নির্বাচন কমিশনার এবং কমিশনারদের দেওয়া হল বিশেষ রক্ষাকবচ। কী সেই কবচ? নির্বাচন কমিশনাররা অবসর নেওয়ার পরেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা করা যাবে না।
এই রক্ষাকবচ আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতিরও নেই। তাহলে কেন তা নির্বাচন কমিশনারদের দেওয়া হল? সরকারি ব্যাখ্যা, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে কমিশনাররা বিভিন্ন পদক্ষেপ করেন। তার সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এই রক্ষাকবচ। কিন্তু, রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা অন্যরকম। তাদের বক্তব্য, ময়দানে খেলে ম্যাচ জেতা কঠিন হবে আশঙ্কা করেই বিজেপি নেতৃত্ব ‘আম্পায়ার’ ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছে। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটি চব্বিশের ভোটের আগে ‘ইসবার চারশো পার’ স্লোগান দিলেও বাস্তবটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁরা জানেন, বিজেপির জনসমর্থন দিন দিন কমছে। তাই আম্পায়ারের হাতে এমন অস্ত্র তুলে দিতে হবে যাতে বিরোধী পক্ষকে ‘আউট’ দিলেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে না হয়। সেই উদ্দেশ্যেই মোদির সরকার নির্বাচন কমিশনারদের নজিরবিহীনভাবে রক্ষাকবচ দেওয়ার আইন করেছে। তাতে ‘থার্ড অ্যাম্পায়ার’ নেই।
সিদ্ধান্ত ভুল না ঠিক তা বিচারের জন্য ‘রিপ্লে’ দেখার সুযোগও থাকবে না। নির্বাচন কমিশন কাগজে-কলমে ‘নিরপেক্ষ’ হলেও তারা কেন্দ্রের শাসক দলের হয়েই কাজ করে। তাদের নির্দেশমতোই কমিশন অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নেয়। এই অভিযোগ বিরোধী দলগুলির দীর্ঘদিনের। ২০১৯ সালের নির্বাচনেও কমিশনের নেওয়া সিদ্ধান্তে বিজেপি বিশেষ সুবিধা পেয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মদন লেকুরের নেতৃত্বে গঠিত ‘সিটিজেন্স ফোরাম অব ইলেকশন’ কমিটির রিপোর্টে তার উল্লেখ রয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় নির্বাচন কমিশন ইচ্ছা করে ভোটের দিন ঘোষণা পিছিয়েছিল। কারণ তখনও কেন্দ্রীয় সরকারের বেশ কিছু প্রকল্পের উদ্বোধন বাকি ছিল। দেরিতে নির্বাচন ঘোষণা করায় এক মাসের মধ্যে প্রায় ১৭০টি প্রকল্পের উদ্বোধন সেরে ফেলার সুযোগ পেয়েছিল। বেশিরভাগ উদ্বোধনই করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর যিনি তার বিরোধিতা করেছিলেন তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’
একুশের নির্বাচনের সময়েও একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল বাংলার। করোনা পরিস্থিতির জেরে গোটা দেশ যখন কার্যত গৃহবন্দি তখনও আট দফায় নির্বাচন করা হয়েছিল। রাজ্যবাসী এবং রাজ্য সরকার বারবার দাবি করা সত্ত্বেও দফা কমায়নি কমিশন। কারণ তখন বিজেপি মনে করত, বেশি দফায় ভোট হলে প্রতিটি বুথ কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে মুড়ে দেওয়া যাবে। তাতে তৃণমূল কংগ্রেস ভোট লুট করতে পারবে না। সেই কারণে পূর্ব ঘোষিত সময়সূচি মেনে ভোট করাতে অনড় ছিল কমিশন। আর এবার? ক’দফায় ভোট হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে শোনা যাচ্ছে, এবার দু’ থেকে তিন দফায় এরাজ্যে ভোট করাতে চাইছে বিজেপি। কেন না তারা মনে করছে, বেশি দফায় ভোট করলে সুবিধা তৃণমূলেরই। তাই এবার ভোট গ্রহণের দফা যে কমবে, তা এখনই বলে দেওয়া যায়।
এবারও কেন্দ্রের শাসক দলের সুবিধের কথা ভেবেই কমিশন একের পর এক পদক্ষেপ করছে বলে অভিযোগ। তার জেরে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ মাত্রা ছাড়িয়েছে। কমিশন বারবার সিদ্ধান্ত বদল করছে। প্রথমে বলা হয়েছিল, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকলে শুনানিতে ডাকা হবে না। তাঁরা শুধু ইনিউমারেশন ফর্ম পূরণ করলেই তালিকায় নাম উঠে যাবে। তাতে দেখা গেল রাজ্যে ‘আন ম্যাপড’ ভোটারের সংখ্যা ৩০ লক্ষ। কেবল তাঁদের শুনানিতে ডাকলে বিজেপির নাম বাতিলের টার্গেট পূরণ হবে না। তাই চালু হল ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’। এমন বিএলও অ্যাপ চালু করল যাতে বেশি সংখ্যক মানুষকে শুনানিতে ডাকা যায়। তাতে ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল। কিন্তু ডাক পেলেন দেশের ও রাজ্যের বিশিষ্টজনেরা। এখন প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত অফিসাররাও ডাক পাচ্ছেন। সেই তালিকায় যেমন এসডিও, এডিএমরা রয়েছেন, তেমনই আছেন আইপিএস অফিসারও। অনেকে বলছেন, বিজেপিকে খুশি করতে গিয়ে কমিশন এসআইআর প্রক্রিয়াটাকেই হাসির খোরাক বানিয়ে ফেলল।
জ্ঞানেশ কুমার সাহেবের টিমের খামখেয়ালিপনার কারণে জেলায় জেলায় ক্ষোভ, বিক্ষোভ, ভাঙচুর, আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটছে। যত অঘটন ঘটছে ততই বাড়ছে বঙ্গ বিজেপির উল্লাস। বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছে, গণ্ডগোলের জেরে এবং কমিশনের নিত্যনতুন ফরমানে দীর্ঘায়িত হবে এসআইআর প্রক্রিয়া। এসব করতে করতে শেষ হয়ে যাবে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ। আর তাহলেই ভোট হবে রাষ্ট্রপতি শাসনের অধীনে। বিজেপির লক্ষ্য বাংলার ক্ষমতা দখল। তারজন্য গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরতেও পিছপা নয়। কিন্তু, সুপ্রিম কোর্ট গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। তাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থে কমিশনকে কিছুটা ঝাঁকুনি দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আর তাতেই ছুটেছে গেরুয়া শিবিরের ঘুম।
বিহারে এসআইআরের সময় সুপ্রিম কোর্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, কোনও অনিয়ম হচ্ছে দেখলেই গোটা প্রক্রিয়াটা বাতিল করে দেওয়া হবে। এবার বাংলায় এসআইআর নিয়ে মানুষের হয়রানি নিয়ে মুখ খুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা। তৃণমূল কংগ্রেসের করা মামলার শুনানি পর্বে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী কমিশনের আইনজীবীকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘সামান্য ভুল শোধরানোর নামে যেভাবে সাধারণ মানুষকে মানসিক চাপ দিচ্ছেন, তা মোটেই বরদাস্ত করা যায় না।’ তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।
এই মন্তব্য করেই তাঁরা ক্ষান্ত থাকেননি। কমিশনকে দিয়েছেন একগুচ্ছ নির্দেশ। এতদিন কমিশনের একতরফা নির্দেশে নাস্তানাবুদ হচ্ছে লক্ষ লক্ষ বাঙালি। তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ঘুরতে শুরু করেছে চাকা। এখন কমিশনকেই মেনে চলতে হবে আদালতের নির্দেশ। অন্যথায় এসআইআর বাতিলের আশঙ্কা। সেক্ষেত্রে ছাব্বিশের ভোট কি পুরানো তালিকায়? প্রশ্নটা কিন্তু উঠছে। তবে রক্ষাকবচ থাকলেও শেষরক্ষা হয় না। এই শিক্ষা মহাভারতের। কবচ ও কুণ্ডলের সুরক্ষা পেয়েছিলেন কর্ণ। তারপরেও অর্জুনের তিরে তিনি প্রাণ হারিয়েছিলেন। রক্ষাকবচ দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে ‘ঢাল’ করে বাঁচতে চাইছে বিজেপি।কিন্তু শেষরক্ষা কি হবে? নাকি অর্জুনের মতোই নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানবে ‘সুপ্রিম তির’? উত্তর দেবে সময়।