শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তিনটি শিখর: স্থিতপ্রজ্ঞ, ভক্ত ও গুণাতীত। আমরা দুটি শিখর অতিক্রম করে তৃতীয় বা শেষ শিখরে উপনীত হলাম। রাগের রক্তিমা, কামনার কালুষ্য থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি স্থিতপ্রজ্ঞের ভূমিতে, দ্বেষের দূরপনেয় কলঙ্ক থেকে নিষ্কৃতি লাভ করেছি ভক্তের অবস্থায়, এখন শেষ দূর করতে হবে অভিনিবেশ, দেহাভিমান, জীবত্বভাব। এই অভিনিবেশ, মিথ্যা অভিমান আমাদের ঘিরে ধরেছে গুণের সঙ্গে আমাদের তাদাত্ম্যের ফলে। শ্রীভগবান এখন উপসংহারে ভক্ত অর্জুনকে উপলক্ষ্য করে আমাদের নিয়ে যেতে চাইছেন গুণের পারে। আগের ষোড়শ অধ্যায়ে শ্রীভগবান দেখিয়ে দিয়েছেন কবির ভাষায় যাকে বলা যায়—
‘জগৎ জুড়ে দুইটি সেনা, পরস্পরে রাঙায় চোখ,
পুণ্য-সেনা নিজের কর্, পাপের সেনা শত্রৃর হোক্।’
দৈব ও আসুর সম্পদের বিভাগ করে চিনিয়ে দিয়েছেন বিশেষ করে আসুর সম্পদকে, যার দরুণ মানুষ ‘পতন্তি নরকেহশুচৌ’ এবং ‘জন্মনিজন্মনি মামপ্রাপ্যৈব কৌন্তেয় ততো যান্ত্যধমাং গতিম্’। আত্মোদ্ধারের জন্য তাই সর্বপ্রথম ও প্রধান প্রয়োজন দৈবী সম্পদের আহরণ এবং আসুরী সম্পদের বর্জন। সম্পদের এই দুটি বিভাগের মূলে আছে ঐ লোহিত-শুক্ল-কৃষ্ণা প্রকৃতির তিনটি গুণ। আমাদের কালোর ময়লা কাটিয়ে আলোয় ফুটে উঠতে হবে, অন্ধকার থেকে জ্যোতিতে উত্তীর্ণ হতে হবে, যার জন্য ঋষিহৃদয়ের চিরন্তন প্রার্থনা: ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়’।
তিনটি গুণকে তাই আমাদের ভালো করে চিনতে হবে। শ্রীভগবান চতুর্দশ অধ্যায়েই এর সূচনা করেছেন ‘গুণত্রয়বিভাগযোগ’ দিয়ে, ত্রিগুণের সাধারণ-লক্ষণ ও পরিচয় জানিয়ে। আমরা সেখানে শুনেছি ‘উর্ধ্বং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থাঃ’, তাই ঊর্ধ্বে আরোহণ করতে হলে আমাদের সত্ত্বকে অবলম্বন করতে হবে। তারপর শেষ শিখরে পৌঁছলে সত্ত্বকেও অতিক্রম করে গুণাতীত হওয়া যাবে। শ্রীভগবান তাই এই উপান্তিম সপ্তদশ অধ্যায়ে সেই ত্রিগুণ কেমন করে জগতের সব বস্তুতে ওভাবে ছেয়ে আছে, তার বিশদ পরিচয় দিচ্ছেন তন্ন তন্ন করে, যাতে মানুষ প্রত্যেকটি জিনিস থেকে বেছে নিতে পারে সত্ত্বকে এবং বর্জন করতে পারে রজঃ ও তমকে।
এই সপ্তদশ অধ্যায়টির নাম শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ, তার কারণ মানুষের প্রকৃতি ও স্বভাব গঠিত হয় তার শ্রদ্ধা অনুসারে এবং তা সাধারণত তিন ধরনের: ‘সাত্ত্বিকী রাজসী চৈব তামসী চ ইতি’। (২) তিনরকমের শ্রদ্ধার বর্ণনা দেবার আগে শ্রীভগবান একটি অতি মূল্যবান কথা শোনালেন অর্জুনকে তৃতীয় শ্লোকে:
শ্রদ্ধাময়োহয়ং পুরুষো যো যচ্ছ্র দ্ধঃ স এবং সঃ।।
গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়ের ‘গীতার কথা’ থেকে