এ হল নরেন্দ্র মোদির ‘এগিয়ে যাওয়া’ ভারতের দু’টি ছবি। ভারতের অতিধনী পরিবারের হাতে রয়েছে দেশের মোট ৪০.১ শতাংশ সম্পদ। অন্যদিকে, দেশের ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মাত্র ৬.৪ শতাংশ সম্পদ। শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবারের আয় দেশের মোট আয়ের ৫৭.৭ শতাংশ। এই অতিধনীদের ‘বিলিয়নেয়ার’ বলা হয়। প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদধন্য এই অতিধনীদের সংখ্যা এখন এদেশে ২৮৪। আমেরিকা ও চীনের পর ভারতের স্থান তৃতীয়। এঁরা ন্যূনতম ১০০ কোটি টাকার মালিক। মোদি সরকারের ‘কৃতিত্ব’ হল, যত দিন যাচ্ছে এই বিলিয়নেয়ারদের সংখ্যা বাড়ছে। আর যত এঁদের সংখ্যা বাড়ছে, তত ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে। সম্পদ বণ্টনে অসাম্যের এই চেহারাটা ২০০ বছর আগের ব্রিটিশ জমানাকেও লজ্জায় ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু এঁরা হলেন দেশের মোট জনসংখ্যার সামান্য অংশ। এঁদের আর গরিবের মাঝখানে সমাজের যে অংশটাকে ভিত্তি করে ২০৪৭ সালে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়ে ওঠার লক্ষ্য স্থির করেছে মোদি সরকার সেই মধ্যবিত্তর সংখ্যাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
এই মধ্যবিত্তের আবার অনেক ধাপ। নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত। মূলত শহরের আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী মধ্যবিত্তের আর্থিক বিন্যাসের যে ছবি পাওয়া যায় তা হল, নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানে মাসে ২০-৪০ হাজার টাকা উপার্জন, মধ্যবিত্ত মানে মাসে ৪০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা উপার্জন এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত হলে মাসিক উপার্জন ১ লক্ষ টাকার বেশি। এর বাইরে আরও একটা শ্রেণি দ্রুত উঠে আসছে যারা উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মাঝামাঝি অবস্থান করছে। দুনিয়ায় এরা ‘ডলার মিলিয়নেয়ার’ হিসাবে পরিচিত। যাঁদের সম্পত্তির পরিমাণ সাড়ে ৮ কোটি টাকার বেশি। এঁদের ধনী বলা যাবে না। আবার মধ্যবিত্ত তো নয়ই। সাম্প্রতিক এক বেসরকারি রিপোর্ট বলছে, ভারতে এই মিলিয়নেয়ারের সংখ্যা গত চার বছরে ৯০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ প্রতি ৩০ মিনিটে একটি ভারতীয় পরিবার মিলিয়নেয়ার হয়ে উঠছে। ২০২১ সালে এই শ্রেণিভুক্ত পরিবারের সংখ্যা ছিল ৪ লক্ষ ৫৮ হাজার। চলতি সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ৮ লক্ষ ৭১ হাজার। রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে এই শ্রেণির রেখাচিত্রই নাকি সবচেয়ে বেশি ঊর্ধ্বমুখী। মিলিয়নেয়ারের সংখ্যায় প্রথম তিনটি স্থানে রয়েছে মুম্বই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরু। প্রথম সাতে রয়েছে কলকাতাও। অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম বলে, হাতে পর্যাপ্ত টাকা থাকলে খরচ ও সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়ে। সেই কারণেই এই উঠতি শ্রেণির হাত ধরে গত কয়েক বছরে সোনার দাম ও সেনসেক্স পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। দেশের প্রধান মেট্রোপলিটন শহরগুলিতে কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হচ্ছে দু-তিন কামরার ফ্ল্যাট। ১০ লক্ষ টাকার বেশি দামি গাড়ি বিক্রি বেড়েছে অনেকটাই। নামজাদা সংস্থার আইফোন বাজারে আসার খবরে শোরুমের সামনে লম্বা লাইনে এই শ্রেণির মুখের ছবিই বেশি।
আর্থিক বিকাশের এই ছবি দেখে আনন্দে গা ভাসিয়ে দিতে পারলে সবচেয়ে খুশি হতো আম জনতাই। কিন্তু বাস্তব হল, মোদি জমানার এই অর্থনীতিতে দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ প্রাত্যহিক জীবনের চাহিদাপূরণে হিমশিম খাচ্ছে। মহাজনের ঋণ শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন কৃষক। মাঠে-ঘাটে, কলকারখানায় দিনমজুরি শ্রমিকদের কাজ চলে যাচ্ছে। ১০০ দিনের কাজে মজুরি বাড়ছে না, কৃষক তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। দেশের ৮২ কোটি মানুষকে রেশনের মাধ্যমে আজও বিনামূল্যে চাল-গম দিতে হচ্ছে সরকারকে। মাথাপিছু আয়ে পড়শি অধিকাংশ দেশ ছাপিয়ে গিয়েছে ভারতকে। অন্যদিকে, করকাঠামোর সুবিধা লুটে নিচ্ছে সমাজের একটি বিশেষ অংশ। কর্পোরেটের একচেটিয়া আধিপত্যে পিষ্ট হচ্ছে ছোট ব্যবসা। শেয়ার বাজারের মুনাফা যাচ্ছে এই শ্রেণির পকেটে। এই অসাম্য তৈরির অর্থনীতিই নাকি মোদি সরকারের তুরুপের তাস, যেখানে মুষ্টিমেয় বিলিয়নেয়ার, মিলিয়নেয়ারের সম্পদ বেড়েই চলেছে, আর গরিবের ঘরে শুধুই আঁধার নেমে আসছে। বড়লোক তৈরির এই কারবার তাই মোদির তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে ওঠার স্বপ্ন পূরণ করতে পারলেও অধিকাংশ ভারতবাসী থেকে যাবেন সেই তিমিরেই।