


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: তানিয়া পারভিন, ইদ্রিশ, সাবিরের পাশাপাশি দমদম জেলে বন্দি আর এক পাক জঙ্গিও এবার স্ক্যানারে চলে এল তদন্তকারী অফিসারদের। কারণ? সেই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং অ্যাপের মাধ্যমে মেসেজ। আর তা গিয়েছে দেশের নানা প্রান্তে। এমনকি দেশের বাইরেও। কাশ্মীরে যোগাযোগের সূত্র ইতিমধ্যেই হাতে এসেছে গোয়েন্দাদের। নির্দিষ্ট কোনও নম্বর নয়, বেশ কয়েকটি ফোন
ব্যবহার করেই বেশ কয়েক মাস ধরে এই ‘কর্মকাণ্ড’ শুরু করে দিয়েছে বলে তথ্য হাতে এসে গিয়েছে গোয়েন্দাদের। আর তার হদিশ মিলেছে দিল্লি বিস্ফোরণের পরই। কোন কোন নেটওয়ার্কে এবং কোন কোন রাজ্যে মেডিকেল মডিউলের জাল ছড়িয়েছে, তার শিকড় পর্যন্ত পৌঁছোতে গিয়েই গোয়েন্দাদের নজরে এসেছে শাহবাজ ইসমাইল ওরফে মহম্মদ জামাল গুলাম ফারুকের এই ‘বাড়বাড়ন্ত’। বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ এই জঙ্গিকে ২০০৯ সালের ১৯ মার্চ গ্রেফতার করা হয়েছিল। বাড়ি পাকিস্তান পাঞ্জাব ও অধিকৃত কাশ্মীরের সীমানায় ডেরা গাজি খান জেলায়। ২০১৫ সালের ৭ নভেম্বর সাজা হওয়ার পর থেকে শাহবাজ দমদম জেলেই বন্দি। কিন্তু হঠাৎ কেন এবং কীভাবে তার গতিবিধি বদলে গেল? প্রয়োজনীয় ‘সাহায্য’ই বা কোথা থেকে পেল সে? এইসব প্রশ্ন এখন মাথাচাড়া দিয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দারা জানার চেষ্টা করছেন, পাকিস্তানে কোনওভাবে সাজাপ্রাপ্ত এই লস্কর জঙ্গি যোগাযোগ করেছে কি না।
দিল্লি বিস্ফোরণের পর যে হোয়াইট কলার মেডিকেল মডিউলের পর্দা ফাঁস হয়েছে, তার নেপথ্যে মূলত রয়েছে মাসুদ আজহারের জয়েশ-ই-মহম্মদ। এমনকি সক্রিয় হয়ে উঠেছে তাদের মহিলা স্লিপার সেলও। তাহলে আচমকা লস্কর জঙ্গি শাহবাজ জেগে উঠল কেন? তার কারণ, অপারেশন সিন্দুর পরবর্তী সময়ে লস্কর-জয়েশের বোঝাপড়া। একইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইএস জঙ্গি গোষ্ঠীর খোরাসান মডিউলও। তাই ভারতের যে প্রান্তে যত ভারত বিরোধী সন্ত্রাসবাদী লিঙ্ক রয়েছে, সবই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তিন বছর ধরে মেডিকেল মডিউলের যে জাল পাতা হয়েছিল, তাতে একে একে জুড়ে গিয়েছে অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলির সমীকরণও। এই মেডিকেল মডিউলের ‘লজিস্টিকস সাপোর্ট’ পেতে তাই অসুবিধা হয়নি। দিল্লি বিস্ফোরণ কাণ্ডে ধৃত জঙ্গিদের মোবাইল ও সোশ্যাল সাইট ঘেঁটেই এমন তথ্য হাতে এসেছে গোয়েন্দাদের। এমনকি, পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে তাদের ‘এনক্রিপটেড অ্যাপে’র গ্রুপে আবিষ্কার করেছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি। গ্রুপগুলো তৈরি শুরু হয় আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। এখানে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের পড়ুয়াদের যোগাযোগ ছিলই। অনেকে একসঙ্গে স্কুলে বা কোচিং সেন্টারে পড়েছে। আবার কারও কারও সঙ্গে পরিচয় হয়েছে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে গিয়ে। পশ্চিমবঙ্গে পড়ুয়াদের যে গ্রুপে মূলত পাওয়া গিয়েছে, সেগুলি লজিস্টিকল সাপোর্ট গ্রুপ। এটি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল ফরিদাবাদ থেকেই। অ্যাডমিন ছিল শাহিন নিজেই।
তদন্তে উঠে এসেছে, ধৃত জঙ্গি শাহিন শাহিদ প্রথমে টার্গেট করত আল-ফালাহর পড়ুয়াদেরই। তাদের মগজ ধোলাই সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর নির্দেশ দিত, রাজ্যে রাজ্যে তাদের পেশার পড়ুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। টানতে হবে ‘জেহাদে’। কাজ কী হবে তাদের? শুধু লজিস্টিকাল সাপোর্ট জোগানো। তার মধ্যে কেউ যদি সরাসরি অস্ত্র তুলে নিতে চায়, সে স্বাগত। সেক্ষেত্রে তাকে আলাদা গ্রুপে অ্যাড করে নেওয়া হবে। চলবে প্রশিক্ষণ। আর অপেক্ষা সঠিক সময়ের। আল-ফালাহের গুটিকয় অধ্যাপক, যারা জয়েশের প্রতি সহানুভূতিশীল, তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, বিভিন্ন রাজ্যের হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ থেকে জঙ্গি ভাবধারায় বিশ্বাসী শিক্ষকদের জোগাড় করার। এটা হলে সবার আগে তহবিল বাড়বে। টাকায় টান পড়বে না।
পশ্চিমবঙ্গের পড়ুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বেশ কয়েকবার এরাজ্যে শাহিন, মুজাম্মিল ও উমর নবিদের গ্রুপের ‘কোর মেম্বার’রা এসেছিল বলে জেনেছেন গোয়েন্দারা। এখানে থাকার জন্য হোটেল বা ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা, বিমান-ট্রেনের টিকিট কাটা... সবটাই করেছে এই পড়ুয়ারা।