Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দেশজুড়ে এসআইআর: অন্তর্বর্তী নির্বাচনের প্ল্যান?

বিহারে নির্বাচন হবে। তার আগে ভোটার তালিকা সংশোধন করতে  চায় নির্বাচন কমিশন। এ পর্যন্ত যুক্তি বোঝা গেল। ধরে নেওয়া যেতেই পারে সেই কারণেই স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন হয়েছে। আগামী বছর অসম, পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, তামিলনাড়ুতে নির্বাচন।

দেশজুড়ে এসআইআর: অন্তর্বর্তী নির্বাচনের প্ল্যান?
  • ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: বিহারে নির্বাচন হবে। তার আগে ভোটার তালিকা সংশোধন করতে  চায় নির্বাচন কমিশন। এ পর্যন্ত যুক্তি বোঝা গেল। ধরে নেওয়া যেতেই পারে সেই কারণেই স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন হয়েছে। আগামী বছর অসম, পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, তামিলনাড়ুতে নির্বাচন। এটাও মেনে নেওয়া যায় যে, ওইসব রাজ্যেও ভোটার তালিকা সংশোধন করতে চায় কমিশন। অর্থাৎ ভোটের আগে জাল ভোটার, ভুয়ো ভোটার ঝাড়াই বাছাই করে সংশোধিত তালিকা নির্মাণ। কিন্তু নির্বাচন কমিশন হঠাৎ গোটা দেশেই ভোটার তালিকা সংশোধনের লক্ষ্যে দেশজুড়ে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআ‌ইআর)  করতে এতটা মরিয়া কেন? 

Advertisement

এটা কি অস্বাভাবিক? অবশ্যই অস্বাভাবিক। কারণ হল, এই তো বিগত দেড় দু’বছরের মধ্যে কতগুলি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়ে গেল? ২০২৩ সালে ৯টি রাজ্যে। ত্রিপুরা, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, কর্ণাটক, মিজোরাম, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, তেলেঙ্গানা। এরপর ২০২৪ সালে লোকসভা ভোট। পাশাপাশি আরও ৮টি রাজ্যে হয়েছে ভোট। ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, জম্মু-কাশ্মীর, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশেও হয়ে গেল বিধানসভা ভোট। অর্থাৎ এর মধ্যে একাধিক রাজ্য আছে যেখানে ভোট হয়েছে, তারপর এখনও ১২ মাসও কাটেনি। ২০২৫ সালে ভোট হল দিল্লিতে। সবেমাত্র ৬ মাস আগে। তার মানে বিগত দেড় দু’বছরের মধ্যে দেশের ১৮টি রাজ্যেই ভোট হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ এদের ভোটার তালিকায় এত স্বল্প সময়ের মধ্যেই কী এমন গোলমাল হয়ে গেল? এসব রাজ্যের পরবর্তী ভোট আবার ২০২৮ সাল থেকে শুরু হবে। অনেক দেরি। তাহলে এইসব রাজ্যেও আবার সবেমাত্র ভোট হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় গোটা দেশের সঙ্গেই ভোটর তালিকা সংশোধন হবে কোন যুক্তিতে? কেন কমিশন হঠাৎ গোটা দেশেই এভাবে এসআইআর করতে চাইছে? 
ঠিক এখানেই সন্দেহ দৃঢ় হচ্ছে যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কি আদতে অন্তর্বর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন? বিহারের ভোট আগামী দিনে রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় পরিবর্তন ঘটিয়ে দেবে। এনডিএ জয়ী 
হলেও রসায়ন বদলাবে। এনডিএ পরাজিত 
হলেও সমীকরণ বদলে যাবে। আগামী ৫ বছর ধরে আবার নীতীশকুমারকে মুখ্যমন্ত্রী পদে রেখে দেওয়া বিহার বিজেপির পক্ষে হজম করা মুশকিল।  তার উপর আবার নীতীশকুমার নিজের পুত্রকে এগিয়ে নিয়ে আসছেন ক্রমেই। সুতরাং তাঁর পর পুত্রকে সিংহাসনে বসাতে হবে, এই দাবি ও আবদার করতেই পারেন ভবিষ্যতে। 
যতদিন তাঁর সমর্থনে কেন্দ্রীয় সরকার চলবে, ততদিন নীতীশকুমারের যাবতীয় দাবি মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আর তাই প্রকৃতপক্ষে বিহার এবং এসআইআর, এই দুইই আগামী দিনে অন্তর্বর্তী নির্বাচনের পদধ্বনিকে জোরালো করতে চলেছে। 
ঠিক সেভাবেই চন্দ্রবাবু নাইডুর একের পর এক দাবি কেন্দ্র মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। ২০২৫ সালের বাজেটে শুধু এই দুই রাজ্যকে ১ লক্ষ ২৪ হাজার কোটি 
টাকার প্রকল্প দিতে হয়েছে বাকি সব রাজ্যকে 
বঞ্চিত করে। একটি বছরেই এই। এখনও চার বছর বাকি। এই যে দুই আঞ্চলিক নেতাকে খুশি করে সরকার বাঁচাতে ক্রমাগত তুষ্টিকরণ মোদির চরিত্রের সঙ্গে কি মানানসই? 
২০২৯ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারের শেষ পর্বে এভাবে দীর্ঘকাল ধরে মহাশক্তিধর থাকা নরেন্দ্র মোদি কি চন্দ্রবাবু নাইডু এবং নীতীশকুমারের উপর ভরসা করে ভয়ে ভয়ে সরকার চালাবেন? ওই দুই প্রাণভোমরাকে  সারাক্ষণ তুষ্ট রেখে  চলবেন, সংখ্যালঘু বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অবসর নিয়ে বিদায় নেবেন? এটা বিশ্বাস করা শক্ত। ২০০১ সাল থেকে  গুজরাতই হোক অথবা কেন্দ্রে, সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার চালিয়ে এসেছেন মোদি। তিনি জোটশরিকদের নিয়েছেন। জোটের নাম এনডিএ রেখেছেন। কিন্তু সরকারের নাম মোদি সরকার। জোটশরিকদের কোনও গুরুত্ব ও মর্যাদা ছিল না। ক্ষমতার সামান্য কিছু প্রসাদ তাদের যেমন তেমনভাবে প্রদান করা হতো। তারা বাধ্য হয়ে সন্তুষ্ট থাকত। কিন্তু কোনও চাপ, কোনও দাবি, কোনও ব্ল্যাকমেলের প্রশ্নই ছিল না।  
এখন ঠিক উল্টো। মোদি নিজে জানেন, যতই 
তাঁর দল কিংবা সরকার তাঁর নামে জয়ধ্বনি দিক, বিরোধীদের দুর্বল হিসেবে আখ্যা দিক, বিজেপি সর্বশক্তিমান ইত্যাদি আত্মবিশ্বাসী প্রচার করুক, ২০২৪ সালে বিজেপি যে ২৪০ আসনে নেমে 
এসেছে এই সত্যটা তো আর মিথ্যা হচ্ছে না! 
এবং মোদি যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে তখনই মোদি গ঩রিষ্ঠতা হারিয়েছেন। আগামী চার বছরে মোদির জনপ্রিয়তা আবার শিখরে পৌঁছবে— এরকম কোনও সম্ভাবনা আর আছে? নেই। রামমন্দিরই যেখানে অযোধ্যায় বিজেপিকে জেতাতে পারেনি, কেন্দ্রে গরিষ্ঠতা দিতে পারেনি, তখন হিন্দুরাষ্ট্বর প্রতিশ্রুতি অথবা ঘোষণাও পারবে না। 
কিন্তু ২০২৯ সালে লোকসভা ভোট হলে 
নরেন্দ্র মোদি আবার প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হবেন এই সম্ভাবনা কম। তাঁর বয়স হবে ৭৯ বছর। সুতরাং সেক্ষেত্রে মোদিকে বিদায় নিতে হবে তাঁর শেষতম সরকারের সংখ্যালঘু দলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই। যা মোদির মতো আত্মগর্বী মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। তিনি চাইবেন একক গরিষ্ঠ সরকারের ছাপ রেখে যেতে। 
নীতীশকুমার এবং চন্দ্রবাবু নাইডু— এই দুজন একাধিকবার এনডিএ জোটে ছিলেন। আবার এনডিএ জোট ছেড়েও দিয়েছেন। সুতরাং এখন যতই বিজেপি এবং এই দু‌ই ঩নেতার মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থরক্ষাকারী একটি সমীকরণ কাজ করুক, এই দুজন যে চিরস্থায়ী বন্ধু হবেন, এই আশা বিজেপিও করে না। চন্দ্রবাবু নাইডু এবং নীতীশকুমার দুজনেই মোদির সমান বয়সি। নীতীশকুমার ৭৪।  চন্দ্রবাবু ও মোদি ৭৫। মোদির একটাই লক্ষ্য, একটি সম্মানজনক এক্সিট। আর পুনরায় নিজের নেতৃত্বে গরিষ্ঠতা দেখে যাওয়া। 
দলকে পাইয়ে দেওয়া। হৃতসম্মান পুনরুদ্ধার করা। নরেন্দ্র মোদি গরিষ্ঠতা হারানো এবং আঞ্চলিক 
দলের দুই নেতার দাক্ষিণ্যে সরকার চালানো প্রধানমন্ত্রী, এই তকমা সঙ্গে নিয়ে অবসর নেবেন, 
এটা বিশ্বাস্য? একবার শেষ চেষ্টা করবেন না 
হারানো মাটি ফেরানোর? আর সেটা কীভাবে সম্ভব? অন্তর্বর্তী নির্বাচন।  
আবার নীতীশকুমার ও চন্দ্রবাবুরও এটা শেষ সক্রিয় রাজনৈতিক ইনিংস। চন্দ্রবাবু নিজের 
পুত্রকে ইতিমধ্যেই গদিতে বসিয়ে দিয়েছেন। ভবিষ্যৎ মুখ্যমন্ত্রী অথবা দলের সুপ্রিমো হবে সেই পুত্র। নীতীশকুমার এখনও খোলাখুলি সেই পথে হাঁটছেন না। তবে আভাস দিতে শুরু করেছেন। তিনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে, তাঁর তৈরি করা দল তাঁর অবসরের সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক? ইতিহাস থেকেই তাহলে তিনি মুছে যাবেন। অতএব সংঘাত আজ নয় কাল হতেই পারে। বিহার ভোটের ফলাফল সেই সম্ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করবে। 
গোটা দেশে এসআইআর করার পিছনে অতএব বৃহৎ কোনও উদ্দেশ্য আছে।  দেশজোড়া এসআইআর সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার মধ্যেই ২০২৬ সালে শুরু হয়ে যাবে সেন্সাসের কাজ। এখনও পর্যন্ত কিন্তু ডিলিমিটেশন নিয়ে কেন্দ্র কোনও উচ্চবাচ্য করছে না। অথচ ২০২৬ সালের আগেই ডিলিমিটেশন নিয়ে একটি কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ নিয়ম অনুযায়ী ২০২৬ সাল পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে ডিলিমিটেশন। ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছেন মোদি। প্রথমে দেশজুড়ে এসআইআর। পাশাপাশি সেন্সাস। সব ঘুঁটি সাজানো হয়ে গেলেই অন্তর্বর্তী নির্বাচন। নচেৎ ১৮টি রাজ্যে সবেমাত্র দেড় বছরের মধ্যে যে ভোটার তালিকায় ভোট হয়েছে, সেটার আবার সংশোধনের কী দরকার পড়ল? 
 রাজনৈতিকভাবে মোদির পরিকল্পনা সহজ করে দিচ্ছে বিরোধীরা। বিশেষ করে কংগ্রেস লোকসভা ভোটের পর সম্পূর্ণ ওয়ান ম্যান শো দেখাতে শুরু করেছে। ইদানীং আর ইন্ডিয়া জোটের কোনও কর্মসূচি দেখতে পাওয়া যায় না। জোটের বৈঠক, জোটের মহাসমাবেশ, জোটের আন্দোলন কোনও চিহ্ন নেই। নিজেদের এজেন্ডা সব এখন কংগ্রেস একা একা করে। ইন্ডিয়া জোটের সকলেই যে যার নিজের মতো করে নিজেদের রাজ্যে রাজনীতি করছে। রাহুলের সব এজেন্ডায় সকলে একমতও নয়। বিরোধীদের ছত্রভঙ্গ অবস্থা যাতে আরও বেশি করে হয় সেই অপেক্ষা করছেন মোদি। 
তবে প্রশ্ন হল, রাজনৈতিকভাবে আবার নির্বাচনে গরিষ্ঠতা পাওয়া কি মোদির পক্ষে সম্ভব? নাকি এসআইআরের মাধ্যমে কোনও ভোটঅঙ্কের নয়া স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা হচ্ছে? অন্তর্বর্তী ভোট কি সেক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতেই অপেক্ষা করছে? এমন কোনও পরিকল্পনা কি হচ্ছে যাতে মোদি স্বমহিমায় আবার বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে ফিরতে পারেন? প্রাথমিক পদক্ষেপ এসআইআর? 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ