Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রূপান্তর বিল নিয়ে মোদি সরকারের গা-জোয়ারি

মহিষাসুরকে তো বধ করেছিলেন দেবী দুর্গা। তার বোন মহিষীকে কে বধ করেছিলেন জানেন? হিন্দু মাইথোলজি অনুসারে তাঁকে বধ করেছিলেন আয়াপ্পান স্বামী।

রূপান্তর বিল নিয়ে মোদি সরকারের গা-জোয়ারি
  • ১ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রীতম দাশগুপ্ত: মহিষাসুরকে তো বধ করেছিলেন দেবী দুর্গা। তার বোন মহিষীকে কে বধ করেছিলেন জানেন? হিন্দু মাইথোলজি অনুসারে তাঁকে বধ করেছিলেন আয়াপ্পান স্বামী। কেরলের সবরীমালা মন্দিরে আয়াপ্পান স্বামীর পুজো হয়। কিন্তু এই আয়াপ্পান দেবতা কে ছিলেন জানেন? হিন্দুদের দুই পরাক্রমশালী ও আরাধ্য দেবতা হলেন শিব ও বিষ্ণু। তাঁদের মিলনের সন্তানই হলেন এই আয়াপ্পান। ভগবান বিষ্ণু মোহিনী অবতারে আবির্ভূত হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে মিলন হয় ভগবান মহাদেবের। আসলে ভগবান বিষ্ণু সৃষ্টিকে বাঁচাতে নিজেই রূপান্তরকামী হয়েছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, আজকে এই ২০২৬ সালে ভগবান পৃথিবীতে আবির্ভূত হলে কী করতেন? প্রশ্নটা করতে হল, কারণ দিন কয়েক আগেই বিরোধীদের যাবতীয় আপত্তিকে নস্যাৎ করে সংসদে পাশ হয়েছে ট্রান্সজেন্ডার সংশোধনী।

Advertisement

বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য। এটাই ভারতের অন্তর্নিহিত শক্তি। সেই কবে একথা লিখে গিয়েছেন কবিগুরু। ভারতে নানা ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের মানুষ একত্রে বসবাস করেন। এই বৈচিত্রের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলিত অংশ হল ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামী সম্প্রদায়। অথচ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখলে জানতে পারবেন, মধ্যযুগে কিন্তু এই সম্প্রদায় বহু সময়ই রাজদরবারে যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে অবস্থান করতেন। ব্রিটিশ জমানা থেকেই পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়। ১৮৭১ সালের  ক্রিমিনাল ট্রাইবস অ্যাক্ট তাঁদের কার্যত অপরাধীর তকমা দেয়। বস্তুত, এই সময় থেকেই রূপান্তরকামীদের সম্পর্কে আম আদমির দৃষ্টিভঙ্গি পালটাতে শুরু করে।
স্বাধীনতার পরেও পরিস্থিতির যে খুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে, তা মোটেও নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং বাসস্থানের ক্ষেত্রে চরম বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে তাঁদের। এই প্রেক্ষিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হল ২০১৪ সালের ন্যাশনাল লিগাল সার্ভিস অথরিটি (নালসা) বনাম ভারত সরকার মামলা।  সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে। এই রায়ে আদালত ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামীদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। শুধু তাই নয়, তাঁদের নিজস্ব পরিচয়ের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসাবে ঘোষণা করে।
এই রায়ের ভিত্তিতে ২০১৯ সালে ভারতে ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (প্রোটেকশন অব রাইটস) আইন তৈরি হয়। এই আইনের মূল লক্ষ্য ছিল,
১) ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বৈষম্য রোধ করা
২) শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা
৩) আইনি স্বীকৃতি প্রদান করা
৪) সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা
এই আইন প্রথমবারের মতো রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের জন্য একটি সুসংগঠিত আইনি কাঠামো তৈরি করে। এতদিন পর্যন্ত এই আইনের ভিত্তিতেই সব কিছু চলছিল। ২০২৬ সালের ১৩ মার্চ, কেন্দ্রীয় সামাজিক ন্যায়বিচারমন্ত্রী বীরেন্দ্র কুমার লোকসভায় ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (প্রোটেকশন অফ রাইটস) সংশোধনী বিলটি উপস্থাপন করেন। এই সংশোধনীর মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হল:
১) স্বপরিচয়ের পরিবর্তে যাচাই প্রক্রিয়া। অর্থাৎ আগে একজন ব্যক্তি নিজের লিঙ্গ পরিচয় নিজেই নির্ধারণ করতে পারতেন। কিন্তু নতুন বিল অনুযায়ী, একটি মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 
২) প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি। জেলাশাসকের মাধ্যমে সার্টিফিকেট দেওয়ার নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। এখন মেডিকেল বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া সার্টিফিকেট পাওয়া যাবে না।
৩) ট্রান্সজেন্ডার কারা, তার একটি নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন সংজ্ঞা অনেক ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিকে বাদ দিতে পারে।
৪) বিলটিতে কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যেমন শোষণ, নির্যাতন বা জোর করে পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া।
দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে বিলটি সংসদের উভয় কক্ষেই পাস হয়ে যায়। বিলটি নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছিলেন বিরোধীরা। তৃণমূল সাংসদ জুন মালিয়ার বক্তব্য, ট্রান্স শ্রেণির সঙ্গে কোনো কথা বলেনি সরকার। তাই তাঁদের বক্তব্য বিলে নেই। যাঁদের জন্য বিল, তাঁদের মতামত না নেওয়ায় এর তীব্র বিরোধিতা করছি। সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস বলেন, ‘এই পদক্ষেপ আমাদের এক শতাব্দী পিছিয়ে দিতে চলেছে।’ সমাজবাদী পার্টির সাংসদ জয়া বচ্চন বলেন,  ‘প্রাচীনকালে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা রাজা-রানিদের প্রাসাদে নারীদের সুরক্ষার জন্য নিযুক্ত থাকতেন। তখন তাঁদের নিরাপদ মনে করা হত। কিন্তু আজ হঠাৎ সরকার তাঁদের উপস্থিতিকে বিপজ্জনক মনে করছে।’ কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেছেন, এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে সরকার বিলটি সিলেক্ট কমিটিতে পাঠায়নি। যথাযথ আলোচনা ছাড়া বিলটি পাশ হলে এই সম্প্রদায়ের পরিচয় মুছে যাবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। শিবসেনা (উদ্ধব) সাংসদ প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদীও এই ‘অমানবিক বিল’ প্রত্যাহার বা সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবি জানান। কিন্তু মোদি সরকার কবে বিরোধীদের কথা শুনেছে। তাদের সবকিছুই গায়ের জোরে। বিরোধীদের আপত্তি মানতেই চায়নি সরকার। তাই যথারীতি সংখ্যাধিক্যের জোরে বিলটি সংসদের দুই কক্ষেই পাশ করিয়ে নিয়েছে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রের যুক্তি হল,
১) যাচাই প্রক্রিয়া থাকলে ভুয়া দাবির সম্ভাবনা কমবে
২) প্রশাসনিক কাজ সহজ হবে
৩) প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সঠিকভাবে সুবিধা পাবেন
সরকার আরও দাবি করেছে, এই বিলের মাধ্যমে ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের অধিকার আরও শক্তিশালী হবে। তাঁদের উন্নতির জন্য একটি সুসংহত কাঠামো তৈরি হবে। তাহলে এত সমালোচনা হচ্ছে কেন?
মূল যে জায়গায় সমস্যা সেটি হল, স্বপরিচয়। সমালোচকদের মতে, এই বিল সুপ্রিম কোর্টের নালসা রায়ের পরিপন্থী। কারণ এটি ব্যক্তির নিজস্ব পরিচয়ের অধিকার কেড়ে নেয়। এছাড়া মনে করা হচ্ছে, মেডিকেল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়াটা আদতে ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষপে করা। এটি অপমানজনক ও গোপনীয়তার স্বাধীনতাকে লঙ্ঘন করছে। নতুন বিল রূপান্তরকামীদের যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করছে, তাতে অনেকেই তালিকা থেকে বাদ যাবেন। কারণ সরকার বলছে, ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের সংজ্ঞাটি অত্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাই সংজ্ঞাটি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। বলা হয়েছে, নতুন আইন ‘যাঁদের প্রকৃতপক্ষে এই সুরক্ষার প্রয়োজন’, শুধুমাত্র তাঁদের জন্যই কার্যকর হবে। এখানেই সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বেশিরভাগ। কারণ নতুন সংজ্ঞায়, পূর্বে স্বীকৃত অনেক পরিচয়কেই বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি তামিলনাড়ু বা মণিপুরের মতো রাজ্যের কয়েকটি সম্প্রদায়ের নামও উল্লেখ করা নেই।
নীলাঞ্জন মজুমদার একজন অভিভাবক। তাঁর সন্তান উচ্চশিক্ষার জন্য ভিন রাজ্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন। ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় পত্র থাকার কারণে তাঁর সন্তান জেন্ডার নিউট্রাল হস্টেলে থাকতে পারেন। নীলাঞ্জনের প্রশ্ন, বিলটি আইনে পরিণত হলে কি তাঁকে হস্টেল থেকে বের করে দেওয়া হবে? রাহুল মিত্রের বক্তব্য আরও স্পষ্ট, তিনি বলেছেন, ‘আজ আমি রীতা মিত্র থেকে রাহুল মিত্র হয়েছি। আজ যদি সরকার বলে তুমি ট্রান্সজেন্ডার নও, আমার তো তাহলে কিছু থাকবে না। আমি তো ভোটও দিতে পারব না। আমি বলতেও পারব না আমি কী। সরকার আমাকে ঠিক করে দেবেন আমি কী! নির্বাচনের আগে কোনো বাড়ির দেওয়ালে লিখতে গেলে মালিকের অনুমতি নিতে হয়। অথচ আমার দেহে আমি মেল, ফিমেল না ট্রান্স লিখব, সেই অধিকার সরকার কেড়ে নিচ্ছে! সোজা কথায়, এই বিল ট্রান্স সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি ভয়, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার বাতাবরণ সৃষ্টি করেছে। বিলটি কোনো অর্থবহ আলোচনা ছাড়াই উপস্থাপন করা হয়, এমনকি ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস-এর মতো আইনগত সংস্থার সঙ্গেও নয়। রাজ্যসভায় বিলটি পাস হওয়ার পর, এনসিটিপি-এর সদস্য ঋতুপর্ণা নেওগ এবং কলকি সুব্রহ্মনিয়ম তাঁদের পদ থেকে ইস্তফা দেন। তাঁরা এই সংশোধনী বিলকেই কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন। বলেন, এটি ‘আমাদের স্বপরিচয় এবং মর্যাদার মৌলিক অধিকারের জন্য একটি পশ্চাদপদ  পদক্ষেপ।’ আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, যাঁরা ট্রান্সজেন্ডার হিসাবে নিজেদের চিহ্নিত করতে চান, তাঁদের অস্বীকার করা হচ্ছে। আর যাঁরা বাধ্য, তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।’ ট্রান্সজেন্ডারদের জনজীবনে অংশগ্রহণ কীভাবে বাড়ানো যায়, তা খতিয়ে দেখতে ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছিল। নেতৃত্বে ছিলেন দিল্লি হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি আশা মেনন। এই কমিটিও কেন্দ্রের বিল বাতিলের দাবি জানিয়েছে। যথারীতি কানেই তোলেনি সরকার।
বহু শতাব্দী ধরে ট্রান্স মানুষজন সমাজে প্রান্তিক, বঞ্চিত এবং বৈষম্যের শিকার। আধুনিক যুগে মানবাধিকার ও সমতার ধারণা জোরদার হচ্ছে। একই সঙ্গে এই সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে। সেই প্রেক্ষাপটেই ভারতে ২০১৪ সালের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক নালসা রায় ও  ২০১৯ সালের আইন। ২০২৬ সালে তার সংশোধনী বিল নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার যতই বলুক, এই বিল প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়াবে। স্বপরিচয়ের কার্ডের অপব্যবহার কমাবে। এমনকি সুরক্ষা বৃদ্ধি পাবে। আশঙ্কার দিকটি কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ এই বিল যে ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে এটা স্পষ্ট। এবং ট্রান্স মানুষদের আত্মসম্মান ক্ষুণ্ণ করবে। এই সূত্রেই প্রশ্ন উঠছে, আমি কোন লিঙ্গের, তা ঠিক করার অধিকার কার? কথাতেই তো আছে, ‘নো ওয়ান ক্যান ডিফাইন ইওর আইডেন্টিটি, এক্সসেপ্ট ইউ।’ একজন মানুষের পরিচয় নির্ধারণের অধিকার কি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত? কারণ মানবাধিকার বলছে, প্রতিটি মানুষের নিজের পরিচয় নির্ধারণের স্বাধীনতা থাকা উচিত। একটি সমাজ কখন উন্নত হয়? যখন প্রতিটি মানুষ তার পরিচয় নির্বিশেষে সমান মর্যাদা ও অধিকার পায়। প্রশ্ন হল, এই বিল কি সেই অধিকার দেবে? এই বিল প্রণয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত, মানবিকতা, সমতা এবং ন্যায়বিচার। আইন মানে কী? শুধুই একটি কাগজ। নাকি সেটি মানুষের বাস্তব জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ইতিমধ্যেই ৩২ হাজারের বেশি ট্রান্সজেন্ডার সার্টিফিকেট ইস্যু করেছে। এবং প্রায় দু’হাজার আবেদন পেন্ডিং। কিন্তু এই বিল তাঁদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বার্তা দেয় না। এই দ্বন্দ্বগুলিই বিলকে জটিল করে তুলেছে। বিশ্বের বহু দেশই এখন ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার নিয়ে প্রগতিশীল পদক্ষেপ নিচ্ছে। অনেক দেশ স্বপরিচয়কেই আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। সেখানে ভারত হাঁটছে উলটো পথে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ