সোহম কর, উত্তরপাড়া: উত্তরপাড়ার আকাশ আর নীল নেই। সেখানে লাল আর তেরঙা রঙের মেলা। এলাকার কোনো দেওয়ালেই আর জায়গা নেই। সেখানে জোড়াফুল আর কাস্তে-হাতুড়ির ছড়াছড়ি। মাঝে মধ্যে উঁকি দেয় পাকা চুলের পাকানো গোঁফ। তৃণমূলের আধিক্য থাকা স্বাভাবিক। ২০১১ সাল থেকে এই কেন্দ্র তাদেরই দখলে। বিজেপি যেন টিমটিম করছে। তবে রামের ঘরে চলে যাওয়া ভোট ফিরিয়ে আনতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে বামেরা। এক স্থানীয় টোটোচালক বলছিলেন, ‘এবার এখানে এমপি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে শীর্ষণ্যর সঙ্গে লড়াই হবে সিপিএমের মীনাক্ষীর। টক্কর তৃণমূল আর সিপিএমের। বিজেপি পারবে না।’
পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যে পালাবদলের বছরে এখান থেকে জিতেছিলেন তৃণমূলের অনুপ ঘোষাল। ২০১৬ সালে প্রবীর ঘোষাল আর ২০২১ সালে অভিনেতা কাঞ্চন মল্লিক। শেষবারও তৃণমূল প্রার্থীর জয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ৩৬ হাজার। ফলে ধারেভারে অনেকটাই এগিয়ে তৃণমূল, বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে গত বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএম হারলেও উত্তরপাড়ায় ২১ শতাংশের মতো ভোট ধরে রেখেছিল। ২০২৪ সালের লোকসভায় তারা পেয়েছিল ২৬ শতাংশের কাছাকাছি ভোট। এই ভোটব্যাংককে ভরসা করেই লড়াইয়ে নেমেছেন মীনাক্ষী।
কিন্তু কীভাবে উত্তরপাড়ায় সিপিএমের এই পুনরুত্থান? হিন্দমোটরের পার্টি অফিসে বসে মীনাক্ষী বলছিলেন, ‘উত্তরপাড়ায় ৩টি পঞ্চায়েত আর ২টি পুরসভা রয়েছে। তৃণমূলের সাংসদ, বিধায়ক সব ছিল। উত্তরপাড়ার গণপরিবহণ, চাকরি, রাস্তাঘাট কোনো কিছুর সমস্যা কি মিটেছে? খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষ কোথায় যাবে? সাড়ে তিনশোর উপর পাড়া বৈঠক করেছি। ফোন নম্বর দিয়েছি।’ সিপিএমের এই কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বলছেন, ‘সেখান থেকে আমরা সমালোচনা যেমন পেয়েছি, তেমন পরামর্শও পেয়েছি। সেগুলি দিয়েই উত্তরপাড়ার ইস্তাহার তৈরি হয়েছে।’ মীনাক্ষীর দাবি, মানুষ তাঁদের বলেছেন, যেখানে সিপিএমের প্রতিনিধি রয়েছেন, সেখানে তাঁদের কাজ করতে দেওয়া হয়নি। তাহলে উত্তরপাড়ায় সিপিএম জিতলেও তো একই সমস্যা হবে? মীনাক্ষী বলছেন, ‘উত্তরপাড়ার মানুষ লড়াই-আন্দোলনের পক্ষে ভোট দেবেন।’
লড়াই-আন্দোলনের মুখ মীনাক্ষীর ছবি গোটা উত্তরপাড়ায়। বিশালাকার ফ্লেক্সে তাঁর আর জি কর আন্দোলনের সময় অভয়ার মরদেহের গাড়ি আটকানোর মুহূর্তের ছবি। মীনাক্ষীর লড়াই কি তবে তৃণমূলের সঙ্গে? তিনি বলছেন, ‘লড়াই দক্ষিণপন্থার সঙ্গে বামপন্থার। আমরা বলছি, ১০০ দিনের কাজ, গিগ শ্রমিকদের জন্য রেস্টরুম, থিয়েটার হলের কথা। স্থায়ী চাকরি, ন্যূনতম মজুরির কথা। এগুলি আসলে মানুষেরই চাহিদা। লড়াই পলিসির সঙ্গে। বিজেপি এখানে আছে কি না, জানি না। কী করতে চায়, তাও জানি না। কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি হচ্ছে না কেন? বিজেপি শাসিত রাজ্যে চাকরি কি আছে?’ মীনাক্ষীর প্রশ্ন, ‘মানুষ গতবার বিধানসভায় বিজেপির ৭৭ জন বিধায়ককে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা বিরোধী হিসাবে কী ভূমিকা নিয়েছেন?’
মানুষ কী ‘টেস্ট’ পালটাবেন? ছোটো ব্যবসায়ী থেকে টোটোচালক সকলে বলছেন, ‘মীনাক্ষী প্রার্থী ভালো। লড়াকু মেয়ে।’ শেষে তাঁদের সংযুক্তি, ‘কিন্তু এই একটা সিট জিতে কী হবে, সরকার তো করতে পারবে না!’ মীনাক্ষী কিন্তু বলছেন, ‘বেশ কয়েকটি সিট জিতব।’