নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে রবিবার দুপুরে রাজ্যের কর্মীদের বকেয়া ডিএ মেটানোর কথা ঘোষণা করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোট নির্ঘণ্ট ঘোষণার ঠিক ৫৫ মিনিট আগে সকলকে চমকে দিয়ে এক্স হ্যান্ডলে তাঁর একটি পোস্ট হাসি ফোটাল প্রায় ১২ লক্ষ সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীর মুখে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিলেন, মার্চ মাস থেকেই ২০০৯ সালের রোপা অনুযায়ী বকেয়া ডিএ’র টাকা দেবে রাজ্য। তবে শুধু রাজ্য সরকারি কর্মচারী এবং পেনশনার নয়, বকেয়া মহার্ঘ ভাতা পাবেন শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী, পঞ্চায়েত, পুরসভা সহ রাজ্যের অধীনে থাকা স্বশাসিত সংস্থা এবং সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত সংস্থার কর্মচারীরাও। এই ঘোষণার সঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, ‘আমাদের মা-মাটি-মানুষের সরকার সব সময় কর্মীদের স্বার্থের কথা ভেবে কাজ করে। অর্থদপ্তরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী বকেয়া মহার্ঘ ভাতা মার্চ মাস থেকে মেটানো হবে।’
বকেয়া ডিএ নিয়ে ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে স্টেট অ্যাডমিনস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনালে মামলা করে রাজ্য সরকারি কর্মচারী সংগঠন কনফেডারেশন অব স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ। দীর্ঘ ১০ বছরের আইনি লড়াইয়ে জল গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। গত ৫ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ আদালত বকেয়া ডিএ’র ২৫ শতাংশ পরবর্তী ছ’সপ্তাহ, অর্থাৎ ৩১ মার্চের মধ্যে মেটানোর নির্দেশ দেয় রাজ্যকে। বাকি ৭৫ শতাংশ কবে, কীভাবে, কত কিস্তিতে দেওয়া হবে, তা ঠিক করতে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে দেয় শীর্ষ আদালত। যদিও এসবের মাঝেই এই ২৫ শতাংশ মেটানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়েছিল রাজ্য। ফলে সব মহলই ধরে নিয়েছিল, নির্বাচনের আগে বকেয়া ডিএ পাওয়া যাবে না। আবার কয়েকদিন আগে বকেয়া ডিএ হিসাবের জন্য প্রয়োজনীয় ই-সার্ভিস বুক আপডেট করার নির্দেশ দেয় রাজ্য অর্থদপ্তর। সেই পদক্ষেপ আবার বকেয়া পাওয়ার আশা জাগিয়ে তোলে কর্মীদের মধ্যে। এমন ঘটনাক্রমের মধ্যে রবিবার, ছুটির দিনের দুপুরে মুখ্যমন্ত্রীর আচমকা ঘোষণা। অর্থাৎ, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ মতো ছ’সপ্তাহের মধ্যেই ডিএ দেওয়ার কাজ শুরু করে দিল রাজ্য সরকার। স্বাভাবিকভাবেই কর্মী-আধিকারিক মহলে খুশির হাওয়া।
নবান্নের হিসাব অনুযায়ী, এই বকেয়া মেটাতে রাজ্যের প্রয়োজন পড়বে প্রায় ৪২ থেকে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। আর ২৫ শতাংশ মেটাতে ১১ হাজার কোটি। কেন্দ্রের ঘরে পশ্চিমবঙ্গের ২ লক্ষ কোটি টাকার ন্যায্য প্রাপ্য আটকে থাকা সত্ত্বেও এই পাহাড়প্রমাণ বকেয়া মেটানোর উদ্যোগ নেওয়ায় মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছে সব মহল। রাজ্যের শাসক দল ঘনিষ্ঠ সরকারি কর্মী সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশনের তো বটেই, এদিন মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছে মূল মামলাকারী সংগঠন কনফেডারেশন অব স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজও। কনফেডারেশনের নেতা মলয় মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘আমার মতো লক্ষ লক্ষ সাধারণ কর্মচারী এবং পেনশন প্রাপকদের প্রাপ্য আদায়ের লক্ষ্যে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে টানা লড়াই চালিয়ে গিয়েছি। এখন দেখার, ২৫ শতাংশের সঙ্গে বাকি ৭৫ শতাংশের প্রথম কিস্তি বাবদ কত শতাংশ ধার্য করে রাজ্য। তবে, এই সিদ্ধান্তের জন্য আমি মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। অনেকেই বলছে, সামনে ভোট বলে এই টাকা মিটিয়েছে রাজ্য সরকার। তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। সব দলই ভোটের ইস্তাহার প্রকাশ করে। কর্মীরা তাঁদের অধিকার পাচ্ছে, সেটাই বড়ো কথা।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ফেডারেশনের চেয়ারম্যান মানস ভুঁইয়া এবং কনভেনর প্রতাপ নায়েকও। মানসবাবু বলেন, ‘আজ ফের একবার প্রমাণ হয়ে গেল যে, মুখ্যমন্ত্রী কর্মচারী দরদী এবং একেবারেই ডিএ বিরোধী নন।’ যদিও মহার্ঘ ভাতা আদায়ের পরে এবার হাজার হাজার শূন্যপদ পূরণের দাবিতে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে যৌথ মঞ্চ।