Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

মৈপীঠের জোৎস্না যেন ‘আমার দুর্গা’ কবিতার চরিত্র, বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ে জিতলেও দারিদ্রের সঙ্গে পেরে উঠছেন না

বাঘের পিঠে চেপে বসেছিলেন। নাক, চোখ খুবলে দিয়েছিলেন। কানে হাত ঢুকিয়ে নাস্তানাবুদ করে ফেলেছিলেন কেঁদো বাঘটাকে। তারপর বিশাল প্রাণীটি প্রবল ব্যথা পেয়ে ছাড়ে স্বামীকে। প্রাণে বেঁচে যান মানুষটি।

মৈপীঠের জোৎস্না যেন ‘আমার দুর্গা’ কবিতার চরিত্র, বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ে জিতলেও দারিদ্রের সঙ্গে পেরে উঠছেন না
  • ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, বারুইপুর: বাঘের পিঠে চেপে বসেছিলেন। নাক, চোখ খুবলে দিয়েছিলেন। কানে হাত ঢুকিয়ে নাস্তানাবুদ করে ফেলেছিলেন কেঁদো বাঘটাকে। তারপর বিশাল প্রাণীটি প্রবল ব্যথা পেয়ে ছাড়ে স্বামীকে। প্রাণে বেঁচে যান মানুষটি।

Advertisement

বাঘের সঙ্গে লড়াই করে জিতে গিয়েছিলেন জ্যোৎস্না শী। কিন্তু দারিদ্রের সঙ্গে লড়াইয়ে আর পেরে উঠছেন না। চা-পাঁউরুটি বিক্রি করে যা রোজগার হয় তা দিয়ে খাওয়া ঠিক মতো জোটে না, স্বামীর চিকিৎসার খরচ জুটবে কি করে? তবু জোটাতে হয়। তবে সবসময় হয় না। এখন দু’মাস হল স্বামীর চিকিৎসা করাতে পারেননি। দুর্গা আসছে। প্যান্ডেলের দিকে তাকান জ্যোৎস্না। চোখের জল ফেলেন। ভাবেন দুর্গাকে জিজ্ৎেস করবেন, ‘দারিদ্রের আঘাত তাহলে বাঘের থাবার চেয়েও বেশি!
সেই কবে মল্লিকা সেনগুপ্ত লিখে গিয়েছিলেন, ‘আমার দুর্গা কখনও ঘরোয়া কখনও আগুন বহ্নি...’ জ্যোৎস্নাকে নিয়ে কি আলাদা কবিতা হয়? 
সুন্দরবনের মৈপীঠের গুড়গুড়িয়া-ভুবনেশ্বরীতে থাকেন জোৎস্নারা। স্বামীর নাম শংকর। দু’টি মেয়ে তাঁদের। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। আর একজন স্মাতক স্তরে পড়ছে। ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল। শংকর-জ্যোৎস্না নৌকায় আজমলমারি জঙ্গলের কাছে নদীতে যান কাঁকড়া ধরতে। শরতের নীল আকাশের নীচে মাটিতে বসে রবিবার শংকর বলেন, ‘খাঁড়িতে নেমে কাঁকড়া আছে কি না দেখছি। জোৎস্না আমার সামনে। বিদ্যুতের মতো এল বাঘটা। আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কিছু বোঝার আগেই। বাঁ কাঁধে দাঁত বসাল। আমি ততক্ষণে আধমরা। তবে বাঁচার জন্য মরিয়া। মাটিতে আমাকে ফেলতে পারেনি বাঘ। জ্যোৎস্না পিছন ঘুরে দেখে এক লাফে সামনে চলে আসে। একেবারে জন্তুটার পিঠের উপর উঠে বসে। গোঁফ ধরে টান দেয়। চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেয়। তারপর দু’হাত মুঠো করে ঢুকিয়ে দেয় বাঘের কানে। বাঘ এতটা সহ্য করতে পারেনি। আমাকে ফেলে কান নাড়তে নাড়তে জঙ্গলে ঢুকে যায়। জ্যোৎস্না আমাকে টেনে নৌকায় তোলে। গ্রামে ফেরে।’
শংকরের শরীরের বেশ কয়েকটি শিরা-উপশিরা কাটা। ভালো করে হাঁটাচলা করতে সমস্যা। ভারী কাজ করা বারণ। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। নিয়মিত থাকতে হয় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে। স্বামীর চিকিৎসা চালাতে চা বেচেন জ্যোৎস্না। সকালে বাড়তি রোজগারের জন্য বাড়ি বাড়ি পরিচারিকার কাজও করেন। সত্যেন বিশ্বাস নামে এক সহৃদয় মানুষ সাহায্য করেছেন ওঁদের। তারপর বাড়ির কাছে চা-রুটির দোকান দিয়েছেন জ্যোৎস্নারা। তাতে চা, ডিম, ঘুগনি, পাঁউরুটি পাওয়া যায়। দোকানটাই শংকরের চিকিৎসা চালানোর একমাত্র ভরসা। জ্যোৎস্না বলেন, ‘স্বামীকে বাঁচতে হলে নিয়মিত ওষুধ খেতে হবেই। দোকান চালাই দু’জনে। কোনওভাবে চলছে। ছোট মেয়ে সরকারি কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিল। কিন্তু পারলাম না।’ এলাকার প্রায় সব বাসিন্দা বলেন, ‘ওর পরিবারের একটি সরকারি চাকরির খুব দরকার। সরকার নজর দিলে খুব ভালো হয়।’
‘আমার দুর্গা ত্রিশূল ধরেছে স্বর্গে এবং মর্ত্যে/আমার দুর্গা বাঁচতে শিখেছে নিজেই নিজের শর্তে...।’  শংকর ও জ্যোৎস্না শী। -নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ