শিবাজী চক্রবর্তী, কলকাতা: শাল-মহুয়ার জঙ্গল। লাল কাঁকুরে মাটি। সারাদিনে দু’একটা বাস কিংবা ম্যাজিক গাড়ির ভটভট শব্দ ছাড়া পুটুলিয়া নিস্তব্ধ। ভোরে বনমোরগের ডাক। সন্ধ্যায় জঙ্গল জুড়ে ভেসে বেড়ায় জোনাকির ঝাঁক। বাংলা-ওড়িশা সীমান্ত লাগোয়া এই ছোট্ট গ্রামই এখন জঙ্গলমহলে চর্চার কেন্দ্রে। দুই মহিলা রেফারি মাহি টুডু ও রাজশ্রী হাঁসদা যেন পুটুলিয়ার আগুনপাখি। ময়দানের চেনা মুখ। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে প্রথম ডিভিশনের ম্যাচ খেলাচ্ছেন নিয়মিত। ইন্ডিয়ান উওমেন্স লিগ, বেঙ্গল সুপার লিগেও প্রবল দাপট। এখন ঘরোয়া লিগের প্রিমিয়ার ডিভিশনে বাঁশি হাতে অভিষেকের অপেক্ষায় জঙ্গলমহলের দুই কন্যা।
কথায় বলে, যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। রাজশ্রী ও মাহির সংগ্রাম ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ঝড় তুলতে পারে। দু’জনের বাড়ির ব্যবধান মেরেকেটে ১০০ মিটার। জীবন সংগ্রামের চিত্রনাট্যও প্রায় এক। অভাবের সংসারে দু’বেলা খাবার জোটানোই দায়। খেতের কাজ, ধান রোয়া, জঙ্গলে ছাগল চরানো থেকে বাঁশি হাতে ম্যাচ পরিচালনা। লম্বা রাস্তায় নাটকীয় বাঁক। ঝাড়গ্রামের নয়াগ্রাম থানা বালিকা বিদ্যাপীঠই রাজশ্রীর টার্নিং পয়েন্ট। মাহি সারিয়া ট্রাইবাল হাইস্কুলের ছাত্রী। ফুটবলে পা দেওয়া। তারপর খেলার টানেই রেফারিং জগতে প্রবেশ। আইএফএ’র সহযোগিতায় গোপীবল্লভপুরে রেফারি প্রশিক্ষণের আয়োজন করে ফেডারেশন। রাজশ্রী ও মাহিরা তারই ফসল।
পরিবেশ, পরিস্থিতি একেবারে আলাদা। দর্শক, চাপ, বেয়াড়া ফুটবলারকে বাগে আনা, সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলেই হুলস্থুল কাণ্ড। সমস্যা হয়নি কি? রাজশ্রীর জবাব, ‘নিজের কাজে সৎ থাকলে কোনো সমস্যাই বাধা হয় না।’ আর মাহি? বেঙ্গল সুপার লিগে বিদেশি ফুটবলারদেরও কড়কে দিয়েছেন। বললেন, ‘লড়তে হবে নিজের মতো করে। মেয়েরাও পারে। আত্মবিশ্বাসটাই আসল।’ উদীয়মান দুই মহিলা রেফারিকে আশীর্বাদ করে গাঁয়ের মোড়ল বলে ওঠেন, ‘তোরা অনেক বড় হ। গ্রামের নাম আরও উজ্জ্বল কর।’ সত্যিই তাই। গাঁয়ের আটচালায় মাহি, রাজশ্রীই উত্থান কাহিনি যথার্থ অর্থেই বাংলার গর্বের আসল ‘কন্যাশ্রী’।