মহামায়ার নামান্তর মহাবিদ্যা, সিদ্ধবিদ্যা, ব্রহ্মবিদ্যা প্রভৃতি। ইনিই কৃপা করিয়া পুত্র-কন্যাগণকে ব্রহ্মজ্ঞান দিয়া মুক্তিলাভের যোগ্য করেন। কেণোপনিষদে মহামায়ার হৈমবতী উমারূপে দেবতাগণকে ব্রহ্মমহিমা কখন ও ব্রহ্মজ্ঞান দান একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা। শত্রু বিজয়ের জন্য শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবগণকে দুর্গাস্তোত্র পাঠ করিতে উপদেশ দিলেন এবং নমস্তে সিদ্ধ সেনানি—ইত্যাদি বিখ্যাত স্তব মহাভারতের দৃষ্ট হয়। ভাগবতে বৃন্দাবনে নন্দরাজগৃহে যশোদা গর্ভজাতা যোগমায়াকে কৃষ্ণানুজা নাম দেওয়া হইয়াছে এবং শ্রীকৃষ্ণ নিজের আবির্ভাবের পূর্বে এই মহাদেবীকে ব্রজে আবির্ভূতা হইবার জন্য সসম্মানে নির্দেশ দিয়াছিলেন—গচ্ছ দেবি ব্রজং ভদ্রে, ইত্যাদি।
শ্রীকৃষ্ণভগবান ভাদ্রমাসের কৃষ্ণাষ্টমীতে কংস কারাগারে বসুদেব দেবকীর নিকট আবির্ভূত হইলেন এবং তাঁহার নির্দেশে জগজ্জননী মহামায়া যোগমায়া নামে যশোদার জঠর হইতে দিব্য জন্মগ্রহণ করিলেন। শ্রীকৃষ্ণের যতকিছু লীলা সবই এই যোগমায়া শক্তির সহযোগিতায় সাধিত হইয়াছে। যোগমায়ামুপাশ্রিতঃ। এই যোগমায়াই বারাণসী ও কামাখ্যা প্রভৃতি ভারত-পুণ্যক্ষেত্রে নানা নামে পূজিতা হইয়া আসিতেছেন। বহুনাম নিকেতেষু বহু নামা বভুব হ। ভগবানের দ্বারা সম্মানিতা তাঁহার লীলাপুষ্টিকারিণী মহাশক্তিধারিণী এই যোগমায়ার প্রতি কেহ কেহ ভগবানের দাসী বা এইরূপ অন্য উক্তি কেন করেন, তাহা আমাদের বুদ্ধির অগম্য। একটি প্রসিদ্ধ শ্যামাসঙ্গীতে ব্রজগোপীগণের কাত্যায়নী ব্রতের দ্বারা কৃষ্ণলাভের কথা আছে, ‘কাত্যায়নী নাম ধর, অঘটন ঘটাতে পার, কৃষ্ণধনে দিতে পার, তাই পূজে মা ব্রজভূমি।’ ব্রহ্মার পৌরোহিত্যে শরৎকালে মা দুর্গার পূজা করিয়া শ্রীরামচন্দ্রের রাবণবধের উপাখ্যান এবং মায়ের আরাধনায় সুরথ রাজার হৃতরাজ্য উদ্ধার ও সাবর্ণি মনু হওয়া এবং সমাধি বৈশ্যের ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্তির ঘটনা পুরাণাদিতে প্রসিদ্ধ। ঋগ্বেদের দেবীসূক্তে জগন্মাতার কৃপার অশেষ মাহাত্ম্য বর্ণিত—‘যং যং কাময়ে তং তমুগ্রং করোমি তং ব্রহ্মাণং তমৃষিং তং সুমেধাম্।’ আমরা শরীরের রক্ষার জন্য যে খাদ্য গ্রহণ করি, কর্ণে শ্রবণ করি, চক্ষুতে দর্শন করি এবং প্রাণ ধারণ করি—সবই সম্ভব হয় সেই মহাশক্তির কৃপায়। জড় বিজ্ঞানও এখন সর্বত্র শক্তির মহিমা স্বীকার করেন। জড় বলিয়া কিছুই নাই, সবই সেই অখণ্ডা মহাশক্তির রূপ। মহামায়ার অচিন্ত্য শক্তিতে তাঁহার মধ্যে একই সঙ্গে বিরুদ্ধ ধর্মের সমন্বয় ঘটে। তিনি করুণাময়ী ও নিষ্ঠুরা, সৌম্যা ও ভীষণা—যাহা শ্রীশ্রীকালিকামূর্ত্তিতে বরাভয় এবং খড়গমুণ্ডের মধ্যে আমরা দেখিতে পাই। তবে তাঁর সন্তানগণের প্রতি শাস্তিদানও মঙ্গলের জন্য। ‘সন্তান মঙ্গলতরে জননী তাড়না করে।’ চণ্ডীতে আছে—চিত্তে কৃপা সমরনিষ্ঠুরতা চ দৃষ্টা। চণ্ডিকার অস্ত্রাঘাতে নিহত দৈত্যগণ স্বর্গে স্থান পাইল। ভগবানের একটি বিশেষণ—হতারিগতিদায়ক। করুণাসিদ্ধু মায়ের অপার কৃপার বহু সত্য ঘটনা সুপ্রসিদ্ধ। মাতৃভক্ত সাধক রামপ্রসাদের কন্যা সাজিয়া বেড়া বাঁধার কার্য্যে তিনি সাহায্য করিলেন।
জ্যোতির্ময় নন্দের ‘শক্তিপূজার মহত্ত্ব’ থেকে