Bartaman Logo
২ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

জামতাড়ার মতোই কুখ্যাত বঙ্গের নারায়ণদাঁড়ি, লোক ঠকানোর পাঠশালা পর্যন্ত খুলেছিল গুরুঠাকুর মণীন্দ্রনাথ

ঝাড়খণ্ডের জামতাড়ার মতো বাংলাতেও আছে একটি গ্রাম। সেখানে বংশ পরম্পরায় লোক ঠকানোর কাজ শেখে মানুষ। ঠগ বাছতে গেলে বাস্তবিকই সে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে।

জামতাড়ার মতোই কুখ্যাত বঙ্গের নারায়ণদাঁড়ি, লোক ঠকানোর পাঠশালা পর্যন্ত খুলেছিল গুরুঠাকুর মণীন্দ্রনাথ
  • ১২ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০

নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: ঝাড়খণ্ডের জামতাড়ার মতো বাংলাতেও আছে একটি গ্রাম। সেখানে বংশ পরম্পরায় লোক ঠকানোর কাজ শেখে মানুষ। ঠগ বাছতে গেলে বাস্তবিকই সে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। গ্রামটির নাম নারায়ণদাঁড়ি। পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুর থানার এই গ্রামটির মণ্ডলপাড়ার লোকজন বেশ রহস্যময়।

Advertisement

নারায়ণদাঁড়ির মণ্ডলপাড়ার গল্প শুরু করলে অবলীলায় রাত কেটে যাবে। সে গল্পের প্রধান পুরুষ মণীন্দ্রনাথ মণ্ডল। তিনি বেশ কুখ্যাত। ৬০ বছর আগে লোক ঠকানোর অভিনব সব কায়দা রপ্ত করেছিলেন। বর্তমান প্রজন্ম সেগুলি এখনও ভাঙিয়ে খাচ্ছে। মণীন্দ্রনাথ মৃত। তবে রেখে গিয়েছেন অসংখ্য শিষ্য। যাঁরা বংশ পরম্পরায় জালিয়াত তৈরি করে চলেছে। তাদের এলেম মারাত্মক। কারণ, সাধারণ মানুষ তো বটেই সমাজের তাবড় ব্যক্তিরা মণ্ডলপাড়ার জালিয়াতদের খপ্পরে পড়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খুইয়েছেন। সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, তালিকায় রয়েছেন রাজ্যের এক মন্ত্রীর ভাই। আছেন বর্ধমানের এক প্রাক্তন পুলিস সুপারের আত্মীয়। ভারতীয় সেনার প্রাক্তন ক্যাপ্টেন বাচ্চু সিং প্রমুখ। তিনি হরিয়ানার বাসিন্দা বর্তমানে থাকেন ওড়িশার গঞ্জাম জেলায়। এক কেজি সোনা অর্ধেক দামে কেনার প্রস্তাব পান। টোপ গিলে নেন। তারপর নগদ পাঁচ লক্ষ টাকা খোয়ান। 
নারায়ণদাঁড়ি গ্রামের মণ্ডলপাড়ার বহু পরিবারের কর্তা এই পেশায় যুক্ত। পুরনো নোট বদল, প্রাচীন কয়েনের বদলে টাকা, অ্যান্টিক জিনিসপত্র এবং পাথর অল্প টাকায় বিক্রি, নকল সোনা আসল বলে চালানোর নামে চলে প্রতারণা। কারবারের জাল বহুদূর বিস্তৃত। পুলিসের একাংশ দুষ্কৃতীদের মদত দিত বলেও অভিযোগ। একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টরকে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বদলি পর্যন্ত হতে হয়েছিল বলে খবর। এখানকার দুষ্কৃতীরা জামতাড়া গ্যাংয়ের মতো ‘নারায়ণদাঁড়ি গ্যাং’ নামে বিখ্যাত।
দীঘাগামী ১১৬বি জাতীয় সড়কে বাজকুল সংলগ্ন গ্রাম হল নারায়ণদাঁড়ি। মণীন্দ্রনাথ লোক ঠকানোর পাঠশালা খুলেছিলেন। বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং অন্ধ্রপ্রদেশ থেকেও লোকজন শিখতে আসত। গ্রামের অনেকে বারবার জেলেও গিয়েছেন। নারায়ণদাঁড়ি গ্যাংয়ের অপারেশন পদ্ধতিতে কিছু নয়া সংযোজন ঘটেছে। এখন বহু জায়গায় কল সেন্টার খুলে প্রতারণা চালায় তারা। এছাড়া দীঘায় হোটেল বিক্রি, অন্দরসজ্জার কাজের বরাত পাইয়ে দেওয়া, সোনার গণেশ বিক্রির টোপ, মোটা অঙ্কের স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি কমদামে বিক্রির টোপ দিয়ে ক্রেতা জোগাড় করে। তারপর কোলাঘাট, তমলুক, চণ্ডীপুর কিংবা বাজকুলে আসতে বলে। গাড়িতে চাপিয়ে অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে স্যুট-টাই পরে বসে থাকে মূল প্রতারক। তারপর কথার ফাঁদে ফেলে মোটা টাকা হাতিয়ে নেয়। সম্প্রতি শ্রীরামপুরের এক ঠিকাদারকে সাত লক্ষ টাকার বিনিময়ে পুরনো একশো টাকা নোটের ২০ লক্ষ টাকা দেবে বলে প্রতারণা করেছে। তারপর তমলুক থানা নারায়ণদাঁড়ি গ্যাংয়ের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। এবং গ্যাং সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য‌ জোগাড়ে মরিয়া পুলিস।
নারায়ণদাঁড়ি প্রাইমারি ও আপার প্রাইমারি স্কুলের জমিদাতা চন্দনেশ্বর প্রধান বলেন, ‘মানুষ ঠকানোর জন্য আমাদের গ্রামের বদনাম। এই অবস্থার পরিবর্তন হলে ভালো।’ শেখ মুস্তাফি নামে এক গ্রামবাসী বলেন, ‘এর ফলে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে পাত্রপাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না।’ গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য দেবব্রত দাস বলেন, ‘এখন আগের থেকে পরিস্থিতি একটু ভালো হয়েছে।’ স্থানীয় তৃণমূল নেতা সাধন দাস অধিকারী বলেন, ‘অনেকের টাকা উদ্ধার করতে সহযোগিতা করেছি। আগে গ্রামে পুলিস ক্যাম্প ছিল। এখন নেই।’

সম্পর্কিত সংবাদ