নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: জাতীয় ভলিবল দলের খেলোয়ার প্রেমিকার মুণ্ডু আলাদা করে দিয়েছিল ধড় থেকে। তারপর জেলবন্দি। কেউ পারিবারিক বিবাদে খুন করে দাদাকে। বন্দি সংশোধনাগারে। হাড়হিম করে দেওয়া সে সব ঘটনার ব্যক্তিরা খুনে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাবজ্জীবনের জন্য সাজাপ্রাপ্ত। সেই বন্দিদের হাতে সেজে উঠছে দমদম জেল লাগোয়া পুজোমণ্ডপ। থিমের মাধ্যমে তাঁরা ফুটিয়ে তুলছেন অতীতকালের ভয়াবহ জেলজীবন থেকে সংশোধনাগারের বর্তমান অবস্থার রূপান্তরের ছবি।
থিমের মাধ্যমে জেলের অভ্যন্তরের ছবি সাধারণ মানুষের সামনে শুধু তুলে ধরা হবে প্যান্ডেলে। এখন দিনরাত কাজ করছেন বন্দিরা। কেউ তৈরি করছেন দুর্গার বেদী, কেউ চালচিত্র। এই ঘটনায় কার্যত একটি ইতিহাস তৈরি হতে চলেছে। কারণ কয়েদিদের হাতে তৈরি থিমের মণ্ডপ এবার প্রথম দেখার সুযোগ পাবেন সাধারণ দর্শনার্থীরা।
দমদম জেলের অভ্যন্তরে কয়েদিদের দুর্গাপুজো হয়। আবার জেলের বাইরেও জেলকর্মীদের জন্য পৃথক পুজো হচ্ছে কয়েক দশক ধরে। জেলের গেটের পাশে এই পুজো দেখতে আসে সাধারণ মানুষ। প্রত্যেকবার স্থায়ী মণ্ডপে সাবেকি ঢঙের প্রতিমা হয়। এবার জেল সুপার সুপ্রকাশ রায়ের পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে তৈরি হচ্ছে থিমের মণ্ডপ। সে থিম ফুটিয়ে তোলার প্রধান কারিগর জেলবন্দি আসামীরা। জেলের অভ্যন্তর নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বিশাল পাঁচিলের মধ্যে জেল জীবনের সে অপ্রকাশ চিত্রই ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে মণ্ডপের মধ্যে। মণ্ডপের বাইরে হচ্ছে বিশাল পাঁচিল। দুই বিশালাকার পিলারের সঙ্গে জুড়ে থাকবে পাঁচিল। পিলারের উপর থেকে নিরাপত্তারক্ষীরা নজরদারি চালাবেন। ছোট আকারের গেট টপকে মণ্ডপের মধ্যে প্রবেশ করতে হবে দর্শনার্থীদের। সেখানে একদিকে ব্রিটিশ জমানার ভয়ঙ্কর জেল জীবন ফুটে উঠবে। ছোট আকারের সেলে নেতাজি, ভগৎ সিং ও অন্যান্য বিপ্লবীদের বন্দি করে রাখার চিত্র ফুটে উঠবে। পাশে থাকবে ফাঁসির মঞ্চ। সেই মঞ্চে বিপ্লবীদের ফাঁসি দেওয়ার কাহিনিও চিত্রায়িত হবে। উল্টোদিকে থাকবে আধুনিক সংশোধনাগারের ছবি। সেখানে থাকা গ্রন্থাগার, স্কুল, হাসপাতাল ও ছোট সেল ও জেনারেল ওয়ার্ডে সাজাপ্রাপ্তদের একসঙ্গে থাকার ছবি তুলে ধরা হবে। সেখানে সাজাপ্রাপ্তরা টেলারিং, বাগান তৈরি, সুতো কাটা সহ নানা ধরনের কাজের মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করবেন। এমনকি, সংশোধনাগারের রান্নাঘর ও সাজাপ্রাপ্তদের ডাইনিং হলের চিত্রও তুলে ধরা হচ্ছে। এই মণ্ডপে মা আসছেন সাবেকি সাজে।
শহরতলির বিভিন্ন থিমের মণ্ডপে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ। এই থিম তৈরির খরচ আসছে কোথা থেকে। কয়েক দিন আগেও জলকাদায় ভর্তি মণ্ডপ চত্বর এখন ঝাঁ চকচকে। সাজাপ্রাপ্তরা বলেন, ‘পাশের মাঠে প্রধানমন্ত্রীর সভা হয়েছিল। ওই সভাস্থলে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা বালি, স্টোনচিপ, ইট ও পেভার ব্লক সংগ্রহ করে মণ্ডপ চত্বর সাজানো হচ্ছে। এছাড়া পরিত্যক্ত প্লাই, কাপড় ও লোহার রড দিয়ে মণ্ডপসজ্জা হচ্ছে। বাকি প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারের কর্মী রিক্রিয়েশন সেন্টার দিচ্ছে। সুপার নকশা তৈরি করে দিয়েছেন। সেই আদলে হচ্ছে মণ্ডপ। আমাদের মণ্ডপ দর্শনার্থীদের মনে জায়গা করে নেবে।’ মণ্ডপ সজ্জার কাজ দেখতে আসা সংশোধনাগারের জেলার সুপ্রকাশ রায় বলেন, ‘মানুষ সৃষ্টিশীল। মুহূর্তের ভুল, পরিবেশ সহ নানা কারণে কেউ অপরাধ করে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছেন এখানে। তাঁদের সৃষ্টিশীলতা ও শিল্পীসত্ত্বাকে প্রকাশ্যে আনতে সবার সহযোগিতায় জেল জীবনের বিবর্তনের ইতিহাস মণ্ডপে তুলে ধরা হয়েছে। সাজপ্রাপ্তরা মনের আনন্দে জেলের বাইরে ও ভিতরে দুই মণ্ডপের কাজই সমানভাবে করছেন।’