


বইয়ের পাতা সব শেখায় না। জীবনের খাতা বরং অনেক কিছু শিখিয়ে নেয়। তাই ছোট থেকেই সন্তানকে শেখান সিলেবাসের বাইরের কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস। রোজনামচাতেও রাখুন ছোটখাট শিক্ষা। এতেই সন্তানের শিক্ষা সম্পূর্ণ হবে।
কালে সাঁতার, স্কুল সেরে বিকেলে ক্রিকেট বা ফুটবল। দাবা-টেনিস যা হোক একটা খেলা, ছুটির দিনে আঁকা, নাচ বা আবৃত্তি। সপ্তাহের দু’-একদিন ফাঁকফোকর গলে ঢুকে পড়েছে গিটার কিংবা নাটকের ওয়ার্কশপ। এই প্রজন্মের শিশুদের অনেকেরই চেনা রুটিন এটাই। একটা সময় ছিল, যখন পাঠ্যক্রমের বাইরে খুব একটা অন্য বিষয়ে মাথা ঘামাত না পড়ুয়ারা। স্কুল ছুটির পর দুদ্দাড় জলকাদা মেখে খেলাই ছিল একমাত্র ‘কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি’।
কিন্তু সময় বদলেছে। সন্তানের বৌদ্ধিক বিকাশ নিয়ে ধারণাও বদলেছে অভিভাবকদের। পাঠ্যক্রমেও এসেছে বদল। কর্ম ও ব্যক্তিজীবন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত গুণগুলি বড় প্রয়োজনীয়। যদিও এখনও বহু মা-বাবা মনে করেন, পড়াশোনা করেই সময় পায় না! তাই প্রথমেই তাঁরা ছেঁটে ফেলেন খেলার পাঠ। তবে পেরেন্টিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট থেকেই নানা স্কিল ও কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি সন্তানকে অভ্যস্ত করে তুললে তা নিশ্চিত ভাবে তার কর্মজীবনেও বিশেষ সুবিধা দেবে।
কেমন করে?
ব্যক্তিত্বের উন্নয়ন:
স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিগুলো শিশুর মধ্যে ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটায়। আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। আত্মনির্ভরতাও বৃদ্ধি পায়। যেমন ধরুন, সন্তান আঁকা শেখে কিন্তু ভবিষ্যতে সে আঁকাকে পেশা করবে না, তাতেও কোনও অসুবিধা নেই। সে যে পেশাতেই যাক, তার মধ্যে যে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটছে, গুছিয়ে কাজ করা, সময়ে কাজ শেষ করার অভ্যাস তৈরি হচ্ছে, তা তাকে উন্নতির পথে এগিয়ে রাখবে। আবার নাটক, আবৃত্তি এগুলো শিশুকে ভালো বক্তা করে তুলবে। অফিস মিটিংয়ে সুন্দর করে নিজের মত প্রকাশ করতে শেখাবে। স্টেজ ফ্রি হয়ে ওঠার জন্য তার মধ্যে কোনও জড়োসড়ো ভাব থাকবে না। খেলা, গানবাজনা ও নাচের ক্ষেত্রেও সে সাবলীল হয়ে, আত্মবিশ্বাসী হয়ে সকলের সঙ্গে মিশতে পারবে। নিয়মানুবর্তিতা শিখবে। টিম স্পিরিট তৈরি হবে। তালজ্ঞান তৈরি হবে। রেওয়াজের অনুশীলন ও তালিমের নিয়মানুবর্তিতা থেকে কর্মক্ষেত্রেও সময়ের কাজ সময়ে করা, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও সংস্কৃতিমনস্ক হয়ে উঠবে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আবৃত্তি ও গানবাজনা করেন যাঁরা, বিভিন্ন ভাষা বা যে কোনও কাজ শেখার ক্ষেত্রে তাঁদের বিশেষ দক্ষতা তৈরি হয়, যা কর্মজীবনে বিশেষ কাজে আসে।
সামাজিক দক্ষতা:
পড়াশোনার সঙ্গে নানা গুণ শিখতে গিয়ে শিশুর মধ্যে মাল্টি টাস্ক বা কম সময়ের মধ্যে অনেক বেশি কাজ সামলে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়। ভালোবেসে কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি শিখলে শিশুর ব্যবহারিক দিকেও নানা পরিবর্তন আসে। মনোবিদ সুতনুকা লাহিড়ীর মতে, লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা, সৌজন্যবোধ, র্যাগিং বিরোধী মানসিকতা, দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা সবই তৈরি হয় এই কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটির হাত ধরে। মা-বাবা বা স্কুলের শিক্ষকরা কিন্তু সবটা শিখিয়ে পড়িয়ে তৈরি করতে পারেন না। কিছু স্বভাব নাচ-গানের স্কুল, খেলার ক্লাস এসব থেকেই তৈরি হয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য:
স্কুলের সিলেবাস, নানা পরীক্ষার চাপ সব সামলাতে গিয়ে অল্প বয়স থেকেই ছেলেমেয়েরা মানসিক অবসাদ, স্ট্রেসের শিকার হয়। তখন পাঠ্যবই বহির্ভূত এই শিক্ষাগুলি তাদের নিজস্ব সময় কাটাতে সাহায্য করে। সৃজনশীল করে তোলে, একাকিত্বের অভাব পূরণ করে। ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য রক্ষা পায়।
শৃঙ্খলা বজায়:
মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমীক্ষা অনুসারে, কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে শেখে। সময়ের কাজ সময়ে শেষ করা, নিয়ম করে রেওয়াজ বা তালিম নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হওয়া ইত্যাদি ছোটখাট স্বভাব থেকে শিশু শৃঙ্খলাপরায়ণ
হয়ে ওঠে। পড়াশোনার ক্ষেত্রে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে।
দায়িত্ববান হওয়া:
দলগত কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসে বিভিন্ন সময় দলের সঙ্গে পারফর্ম করতে হয়। এতে নিজের কাজ ও দায়িত্ব সম্পর্কে সন্তান সচেতন হয়ে ওঠে। দলের অন্যান্য সদস্যের সুবিধা-অসুবিধা, খুঁত, গুণ, গুরুত্ব সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে গুছিয়ে নিয়ে তাকে পারফর্ম করতে হয়। ফলে একার কাঁধে দায়িত্ব নিয়ে দলকে বহন করে নেতৃত্বদানের ক্ষমতা যেমন বাড়ে, তেমনই দলের সকলকে নিয়ে চলার ক্ষমতা, নিজের সেরাটুকু নিঃস্বার্থভাবে দলের জন্য দেওয়ার স্বভাব তৈরি হয়। সকলকে নিয়ে ভাবতে শেখে।
স্বাধীনতার ছোঁয়া:
সৃজনশীল কাজের মধ্যে কখনওসখনও স্বাধীনভাবে কিছু করার প্রয়োজন পড়ে। খেলার মাঠেও আপদকালীন সময়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিজেকে নিতে হয়। ফলে এই স্বভাবের মধ্যে দিয়ে বড় হলে সন্তানের মধ্যে ইতিবাচক স্বাধীনতার প্রভাব থাকে।
এ নয় গেল পড়াশোনার পাশাপাশি কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি শেখার কিছু ইতিবাচক দিকের কথা। তবে সন্তানকে বড় করার সময় জীবনের নানা স্কিলের দিকেও নজর দিতে হবে। তবেই এই কঠিন পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকা একটু সহজতর হবে। কোন কোন দিকে খেয়াল রাখবেন? মনোবিদ দিলেন পরামর্শ।
জীবনের স্কিল, বেঁচে থাকার যুদ্ধ
রপ্ত করার ক্ষমতা:
সন্তানকে বড় করার সময় মাঝেমধ্যেই তার কমফোর্ট জোন থেকে তাকে বের করে আনুন। সবসময় তার অনুকূল পরিবেশ তৈরি না করে, বরং অস্বাচ্ছন্দ্যের পরিবেশের মধ্যেও কিছুক্ষণ রাখুন।
ধরা যাক, স্কুল থেকে ফিরে সে প্রতিদিন এসি চালিয়ে আরাম করে। এটা অভ্যাসে পরিণত না করে মাঝেমধ্যে এসি না চালিয়ে তাকে পাখার তলায় রাখুন। প্রথমদিকে বায়না করতে পারে, কান্নাকাটি করতে পারে। তবু নিজের মতে অটল থাকুন। তাকে বুঝিয়ে বলুন কেন এসি ছাড়া থাকলে পরে তার লাভ হবে। বাড়ির গাড়িতে স্কুলে না পাঠিয়ে বার কয়েক ট্রেনে বাসে পাঠান। মাছ-মাংস ছাড়া কিছু মুখে না তুললে সপ্তাহে একটা দিন অন্তত নিরামিষ খাওয়ান। রোজনামচায় একটু অস্বস্তি মিশিয়ে দিলে শিশুর মধ্যে রপ্ত করার, মানিয়ে নেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা তৈরি হবে, তা তার আজীবনের সম্পদ।
গান শোনান, বই পড়ান:
মোবাইল নয়, মিউজিক ও বইয়ে আস্থা রাখুন। এতে মানসিক বিকাশ ভালো হয়। সৃজনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভাষাজ্ঞান বাড়ে। কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীকালে কর্মক্ষেত্রে কোনও কাজের দায়িত্ব পেলে তা তার সৃজনশীল মন দিয়ে আরও সুন্দর করে উপস্থাপন করতে পারবে শিশু। কাজের মধ্যে আলাদা সাংস্কৃতিক মনেরও ছোঁয়া থাকবে।
সময়ের গুরুত্ব:
ছোট থেকেই সন্তানকে সময়ের দাম বোঝাতে হবে। সময়মতো কোথাও যাওয়া, সময়ের কাজ সময়ে শেষ করার অভ্যাস নিজেওবিজায় রাখবেন। নিজেকেই ‘উদাহরণ’ হিসেবে স্থাপন করে শেখাবেন সন্তানকে। কোন কাজে কতটুকু সময় ব্যয় করতে হবে, সে শিক্ষা তাকে ছোট থেকে দিলে সে কাজের ‘প্রায়োরিটি’ বুঝবে ও অযথা সময় নষ্ট করবে না।
টুকটাক ঘরের কাজ:
স্কুলপড়ুয়া ছেলে হোক বা মেয়ে, তাকে সংসারের টুকটাক কাজ করতে দিন। যেমন— বোতলে জল ভরা, কেউ এলে তাঁকে আপ্যায়ন করা, সামনের দোকান থেকে চট করে কিছু এনে দেওয়া, ডাইনিং টেবল গুছিয়ে রাখা, নিজের পোশাক নিজে ভাঁজ করা, এমনকী, একটা বয়সের পর খাওয়ার পর নিজের থালা নিজে অন্তত বেসিনে তুলে রাখা শেখান। ছেলে-মেয়ে উভয়কেই উঁচু ক্লাসে উঠলে টুকটাক কাজ চালানোর রান্নাও শিখিয়ে রাখা দরকার। এতে ছোট থেকেই শিশু কিছু ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হতে শিখবে। পরে দূরে চাকরি করলে বা পড়তে গেলে অসুবিধার মুখে পড়বে না।
আচরণে সচেতনতা:
ব্যবহারের মাধ্যমেই যে একজন মানুষের পরিচয় গড়ে ওঠে এটা শিশুকে যত ছোট বয়স থেকে শেখাতে পারবেন, ততই লাভ। লেখাপড়ায় তুখোড় হওয়ার পরেও যদি ব্যবহার ভালো না হয়, তাহলে যে কার্যক্ষেত্রে সে আদপে ভালো নয়, এই শিক্ষা ছোট থেকেই দিন।
শরীরচর্চায় উৎসাহ:
খেলাধুলোর জন্য অন্তত ১ ঘণ্টা দিতেই হবে। দ্রুততর জীবনে তাল মেলাতে গেলে, জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে চাইলে শরীরের যত্ন নিতে হবে। তাই ছোট থেকেই শরীরচর্চার অভ্যাস থাকলে রোগভোগ দূরে থাকবে। আজীবন সুস্থ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হবে। ছোট থেকেই ব্যায়াম ও মেডিটেশনে অভ্যস্ত করে তুলুন সন্তানকে। এতে তার মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ হবে। ধীরস্থির ও ঠান্ডা মাথার মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করবে।
মনীষা মুখোপাধ্যায়