Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাংলায় প্রতিভার স্বল্পতা!

সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রতিবছরই পদ্মসম্মান প্রাপকদের তালিকা প্রকাশ করে। এবছরও নিয়মমাফিক সেই ঘোষণা হয়ে গিয়েছে।

বাংলায় প্রতিভার স্বল্পতা!
  • ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রতিবছরই পদ্মসম্মান প্রাপকদের তালিকা প্রকাশ করে। এবছরও নিয়মমাফিক সেই ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। ২০২৬ সালে পদ্মসম্মান দেওয়া হবে মোট ১৩১ জনকে। মার্চ-এপ্রিল নাগাদ রাষ্ট্রপতিভবনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কৃতীদের সম্মানিত করা হবে। সম্মান তুলে দেবেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু স্বয়ং। পদ্মসম্মান প্রাপকদের তালিকায় বঙ্গসন্তানদের উপস্থিতি সংখ্যার বিচারে সাধারণভাবে বরাবরই দীর্ঘ হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সম্মানিত গুণীদের মধ্যে বাংলাভাষী ও বঙ্গসন্তান ১১ জন। সংখ্যাটি ২০২৫ সালেরই সমান। পদ্মসম্মান দেওয়া হয় তিনটি নামে—পদ্মবিভূষণ, পদ্মভূষণ এবং পদ্মশ্রী। সব মিলিয়ে পাচ্ছেন মোট ১৩১ জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন পদ্মবিভূষণ এবং ১৩ জন পদ্মভূষণে ভূষিত হলেন।

Advertisement

কিন্তু বাংলার জন্য আক্ষেপের বিষয় হল, প্রথমোক্ত অধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মান দুটির একটির জন্যও কোনো বঙ্গসন্তান বিবেচিত হননি। ওই পুরস্কার যাঁরা পেলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—বলিউড তারকা ধর্মেন্দ্র। বিনোদন জগতে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে মরণোত্তর পদ্মবিভূষণ দেওয়া হল। কেরলের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী ভি এস অচ্যুতানন্দনও পদ্মবিভূষণের জন্য বিবেচিত হয়েছেন। পদ্মভূষণ পেয়েছেন সংগীতশিল্পী অলকা ইয়াগনিক, ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শিবু সোরেন এবং যুক্তরাষ্ট্রনিবাসী টেনিস কিংবদন্তি বিজয় অমৃতরাজ। প্রসঙ্গত, একইদিনে অশোকচক্র সম্মানও ঘোষণা করা হয়। এবছর অশোকচক্র সম্মানে ভূষিত হলেন মহাকাশচারী শুভাংশু শুক্লা। বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ঘোষিত হল ভারতীয় বায়ুসেনার এই গ্রুপ ক্যাপ্টেনের নামে। অন্যান্যবারের মতো এবারও সাহিত্য, শিল্প, খেলা, চিকিৎসা, ব্যবসা, সমাজসেবাসহ নানা ক্ষেত্রে গুণী ব্যক্তিত্ব বা প্রতিভাকে তিন ধরনের পদ্মসম্মান দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে এবার শুধুই পদ্মশ্রী সম্মান উঠছে বঙ্গসন্তানদের হাতে।

পদ্মশ্রী প্রাপক বঙ্গসন্তানদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জনপ্রিয় অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। চারদশক যাবৎ তিনিই টলিউডের একটি স্তম্ভ। সাড়ে তিনশোর বেশি ফিল্মে নানাধরনের চরিত্রচিত্রণ করে দর্শকদের মন জয় করেছেন তিনি। পদ্মশ্রী পাচ্ছেন তবলাবাদক কুমার বসু। বেনারস ঘরানার এই শিল্পীর হাতে সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার উঠেছিল ২০০৭ সালে। রাজ্য সরকারও পুরস্কৃত করেছে কলকাতার এই বিশিষ্ট তবলাবাদককে। পদ্মশ্রী হলেন বীরভূমের কাঁথাশিল্পী তৃপ্তি মুখোপাধ্যায়। কাঁথা সেলাই শিল্পকে জনপ্রিয় করার কাজে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁর হাতে এই জাতীয় পুরস্কার উঠছে। এই শিল্পচর্চার মাধ্যমে ২০ সহস্রাধিক মহিলাকে তিনি স্বনির্ভর হতে শিখিয়েছেন। তাঁর শিল্পসৃষ্টি আগেও সরকারি স্বীকৃতি লাভ করেছে। তিনি সম্মানিত হয়েছেন রাজ্য সরকারের ‘বঙ্গশ্রী’ এবং কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রকের ‘শিল্পগুরু’ সম্মানে। তাঁরই মুকুটে এবছর যুক্ত হল পদ্মশ্রী। পদ্মসম্মান পেলেন বাংলার সন্তুরবাদক তরুণ ভট্টাচার্য। চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনবদ্য অবদানের জন্য পদ্মশ্রী হচ্ছেন বিশিষ্ট হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ সরোজ মণ্ডল। সাহিত্য ও শিক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য পদ্মশ্রী পাচ্ছেন সাঁওতালি ভাষার কথাসাহিত্যিক রবিলাল টুডু। ২০২২ সালে রাজ্য সরকার তাঁকে বঙ্গভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। ছাত্রজীবন থেকে নাটক লেখেন এবং অভিনয়ও করেছেন তিনি। বিরসা মুন্ডার জীবনী নিয়ে রবিলাল টুডুর লেখা বই ‘বীর বিরসা’ তাঁকে খ্যাতির আলোয় তুলে আনে। কালনার জ্যোতিষ দেবনাথ পদ্মশ্রী পাচ্ছেন মসলিন শিল্পে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য। বাল্যকাল থেকেই তিনি এই শিল্পচর্চায় নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। থিয়েটার শিল্পের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব বালুরঘাটের হরিমাধব মুখোপাধ্যায়। অভিনয়, পরিচালনা এবং লেখার মাধ্যমে তিনি থিয়েটার শিল্পের সেবা করেছেন ছয় দশক যাবৎ। নাটক পরিচালনা করেছেন আঞ্চলিক ভাষাতেও। জগমোহন মজুমদার ও অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিষ্য হরিমাধব শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে নাটককে গ্রামবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন। এই বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব মরণোত্তর পদ্মশ্রীতে ভূষিত হলেন। শিক্ষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য পদ্মশ্রী পাচ্ছেন অশোককুমার হালদার। মালদহের অশোকবাবু কর্মজীবন শুরু করেছিলেন রেলের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে। পরে ‘দলিত সাহিত্যিক’ পরিচয় তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। এবার পদ্মশ্রী হলেন তিনিও। বাংলা মা বরাবরই রত্নগর্ভা। প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রের কৃতী এবং প্রতিভা সৃষ্টিতে তিনি অকৃপণ। তবু এই ভারতে বঙ্গসন্তানরা বারবারই বৈষম্যের শিকার, বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে যথাসময়ে প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয়নি। তার বড়ো কারণ দিল্লির সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ। এই প্রশ্ন, এই আক্ষেপ পদ্মসম্মানের তালিকাতেও রয়ে গেল। মোদি সরকারের চোখে কি বাংলায় প্রতিভার স্বল্পতা ধরা পড়ল?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ