নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: অশোকনগরের কিডনি পাচার কাণ্ডের ‘কিংপিন’ গুরুপদ জানা এবং তার সেকেন্ড ম্যান বিকাশ ওরফে শীতল ঘোষের ‘এজেন্টদের’ জেরা করবে পুলিস। তদন্তকারীরা বলছেন, এই এজেন্টদের মাধ্যমেই দুঃস্থ পরিবারের লোকজনকে দেওয়া হতো মোটা টাকার ঋণ। সেই টাকা সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে ‘ধমকানি ও চমকানি’ দিত তারাই। এমনকী ঋণ গ্রহীতার বাড়িতে গিয়ে মোবাইল, বাইক, সোনার আংটিও কেড়ে নিত তারা। চলতি সপ্তাহেই তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিস। এদিকে, বছর তিনেকের মধ্যে ধৃতদের সম্পত্তি হঠাৎ করে বেড়ে গিয়েছে। পুলিসের তদন্তের আওতায় এই সম্পত্তিও।
জানা গিয়েছে, অশোকনগরে কিডনি পাচারের ঘটনায় মিলেছে আন্তর্জাতিক যোগ। আর এই চক্রে এক নেফ্রোলজিস্ট ও আইনজীবী স্ক্যানারে পুলিসের। তবে, এই কারবারে রয়েছে একটি বড় র্যাকেট। রয়েছে সতেজ একটি ‘সাপ্লাই লাইন।’ ধৃত সুশান্ত ঘোষ ওরফে শীতলদের মতো সুদখোরদেরও আতস কাচের নীচে রেখেছে পুলিস। তাতেই ‘এজেন্ট’দের নয়া কার্যকলাপ জেনেছে পুলিস। সূত্রের খবর, একজন সুদখোরের হয়ে কাজ করত পাঁচজন। তাদের কাজ ছিল এমন অসহায় ‘ক্লায়েন্ট’ ধরা। তাদের নামমাত্র এগ্রিমেন্ট করে টাকা ধার দেওয়ার পরই এজেন্টদের রুদ্রমূর্তি দেখা যেত। প্রতিদিন সুদের টাকা সংগ্রহ করত তারা। যে ঋণগ্রহীতা পরপর কয়েকদিন সুদের টাকা দিতেন না, এজেন্টরা তাদের বাড়িতে গিয়ে হামলা চালাত। দেওয়া হতো মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকিও। শুধু তাই নয়, হুমকি ও মারধরও করত তারা। এমনকী ঋণীদের বাড়ি থেকে মোবাইল, বাইক বা সোনার আংটিও জোর করে কেড়ে নিত। সুদের টাকা পরিশোধ করার পরই এই জিনিস ফেরত পাওয়া যেত। যদি তারপরেও কেউ সুদ মেটাতে অক্ষম হলে, শুরু হয়ে যেত মানসিক চাপ দেওয়া। শেষে সুদের টাকা পরিশোধের নামে বাধ্য করানো হতো কিডনি বিক্রির জন্য। তদন্তকারীদের কথায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে ঋণীরা টাকা দিতে না পারায় কিডনি বিক্রি করেছেন। আর জোর করে ‘হাতানো’ সামগ্রী রয়ে গিয়েছে সুদখোরদের বাড়িতেই। এর ভাগও গিয়েছে এজেন্টদের কাছে। ফলে, রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গিয়েছে ‘কিংপিন ও তার সেকেন্ড ম্যানের’। সূত্রের আরও খবর, দক্ষিণ কলকাতার নামজাদা বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিমাসে ২০ থেকে ২৫টি কিডনি প্রতিস্থাপন হতো। কিন্তু, রোজ কিডনিদাতা জোগাড় করা সম্ভব হতো না। তাই জেলায় জেলায় তৈরি হয়ে গিয়েছিল সুদের আড়ালে কিডনি বিক্রির টিম। পুলিস জানতে পেরেছে অশোকনগর থানা এলাকায় একাধিক সুদখোরের চাপে বিগত ৫-৭ বছরে কমবেশি ২৫ জন কিডনি বিক্রি করেছেন। তদন্তকারীরা বলছেন, যদি কিডনি সাপ্লাই লাইন কেটে দেওয়া যায়, তাহলে গোড়াতেই ধাক্কা খাবে পাচার চক্র। তাই, ধৃত পাঁচজনকে সোমবার জেরা করেছেন বারাসত পুলিস জেলার অতিরিক্ত পুলিস সুপার স্পর্শ নিলাঙ্গী। আগামী ক’দিনের মধ্যে হাতে আর কিছু তথ্য এলেই আইনজীবী ও নেফ্রোলজিস্টকে পুলিস জেরা করবে বলেই অশোকনগর থানার পুলিসের দাবি।