Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আত্মকর্ম্ম

আত্মকর্ম্মের দ্বারা আত্মিক স্থিতির উৎকর্ষ-সাধন ঘটিয়া থাকে। তীব্রতা অনুসারে কর্ম্মকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যাইতে পারে। আত্মকর্ম্ম ততক্ষণ পর্য্যন্ত সম্পন্ন হইতে পারে না যতক্ষণ পর্য্যন্ত দেহে চৈতন্য শক্তির উন্মেষ না হয়। প্রতি মনুষ্যদেহে এই শক্তি কুলকুণ্ডলিনী নামে নিহিত রহিয়াছে।

আত্মকর্ম্ম
  • ৫ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আত্মকর্ম্মের দ্বারা আত্মিক স্থিতির উৎকর্ষ-সাধন ঘটিয়া থাকে। তীব্রতা অনুসারে কর্ম্মকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যাইতে পারে। আত্মকর্ম্ম ততক্ষণ পর্য্যন্ত সম্পন্ন হইতে পারে না যতক্ষণ পর্য্যন্ত দেহে চৈতন্য শক্তির উন্মেষ না হয়। প্রতি মনুষ্যদেহে এই শক্তি কুলকুণ্ডলিনী নামে নিহিত রহিয়াছে। যতক্ষণ এই শক্তি উন্মেষ হইয়া শিবত্বের অভিব্যক্তি না ঘটে ততক্ষণ পর্য্যন্ত মানুষ মনুষ্যাকারসম্পন্ন হইয়াও প্রকৃতিতে পশু ভিন্ন অপর কিছু নহে। পশুত্ব-নিবৃত্তির একমাত্র উপায় কুণ্ডলিনীর উদ্বোধন এবং শিবভাবের বিকাশ। 

Advertisement

কিন্তু এই উদ্বোধন সকলের সমান মাত্রাতে হয় না। অনেকের এই উদ্বোধন হয়ই না—তাহাদের প্রসঙ্গ বর্ত্তমান সময়ে আলোচ্য নহে। কিন্তু যাহাদের কুণ্ডলিনী উদ্বুদ্ধ হয় তাহাদের ও সকলের জাগরণের মাত্রা সমান নহে বলিয়া সকলকে এক শ্রেণীতে নিবেশ করা চলে না। সদ্‌গুরু সাক্ষাৎ ভগবৎশক্তিসম্পন্ন হইলেও শিষ্যের আধারের বলবত্তার উপর তাঁহার সঞ্চারিত শক্তির ফল-প্রকাশ নির্ভর করে। যে আধারে যে পরিমাণ শক্তির ধারণা সম্ভবপর সদগুরু সেই আধারে তাহার অধিক শক্তির সঞ্চার করেন না এবং তদ্‌ অ঩পেক্ষা ন্যূন শক্তিরও সঞ্চার করেন না। আধার দুর্ব্বল হইলে কুণ্ডলিনীর উন্মেষ কিঞ্চিন্মাত্রাতেই হইয়া থাকে। তাহার পর সাধক স্বয়ং নিজকর্ম্মের দ্বারা ঐ উন্মেষের অগ্রগতি সম্পাদন করে। এই প্রকারে ধীরে ধীরে সাধকের অন্তরে এবং বাহিরে উদ্বুদ্ধ চৈতন্যশক্তির বিকাশ ঘটিয়ে থাকে। চৈতন্যশক্তির বিকাশের ফলে অনাত্মাতে আত্মভাবত কাটিয়া যায়ই, বিশেষতঃ আত্মাতে আত্মাভিমানের পূর্ণ অভিব্যক্তির পথও খুলিয়া যায়। 
প্রকৃতি ও মায়া হইতে আত্মস্বরূপের বিবেকজ্ঞান উদিত হইলেও কর্ম্ম সংস্কার নষ্ট হইয়া যায় এবং জন্ম-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে নিত্য স্থিতির উপলব্ধি হয়। কিন্তু পশুভাবের বীজ তখনও থাকিয়া যায়। পশুভাব নিবৃত্ত না হইলে ভগবৎস্বরূপে স্থিতি দুর্ঘট। সাধকের আত্মা পরমাত্মা হইতে অভিন্ন অথবা পরমাত্মার সনাতন অংশভূত এবং স্বরূপতঃ নিত্য দিব্য-ভাবাপন্ন-উহা পশু অবস্থার নিম্নস্তরে এই সকল প্রাকৃতিক সূক্ষ্ম সংস্কাররাশির আবেষ্টনে আচ্ছন্ন হইয়া বদ্ধের ন্যায় বিদ্যমান থাকে। দিব্যজ্ঞানের উদয় এবং ক্রমিক বিকাশ হইলে ঐ সকল সংস্কারের নিবৃত্তি তো হয়ই, উপরন্তু মৌলিক পশুবীজও কাটিয়া যায়।সাধক কর্ম্মদ্বারা গুরু হইতে প্রাপ্ত জ্ঞানাগ্নির স্কুলিঙ্গকে নিজ সত্তায় সম্পূর্ণভাবে বিস্তারিত করে এবং এই বিস্তারের মাত্রা অনুসারে অজ্ঞানজ কর্ম্মসংস্কারগুলি নষ্ট হইতে থাকে। দেহ কর্ম্মসম্ভূত বলিয়া দেহে অবস্থিতি কাল পর্য্যন্ত অজ্ঞান ও কর্ম্ম-সংস্কার সম্পূর্ণভাবে নিবৃত্ত হয় না। কারণ সম্পূর্ণ নিবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে সাধারণতঃ দেহপাত অবশ্যম্ভাবী। এইজন্য সাধকের পূর্ণ সিদ্ধি দেহে অবস্থানকালে হইতে পারে না—লেশমাত্র অবিদ্যা অথবা অজ্ঞান দেহাবস্থায় থাকিবেই থাকিবে। পূর্ণ নির্ব্বিকল্পক স্থিতি প্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেহ-সম্বন্ধ ছিন্ন হইয়া যায় এবং আত্মা সর্ব্ব সংস্কার বর্জ্জিত হইয়া চিদাকাশে নিজ স্বরূপে বিরাজ করে। ইহাকে কৈবল্য অথবা বিদেহ কৈবল্য নামে কেহ কেহ বর্ণনা করিয়া থাকেন।
গোপীনাথ কবিরাজের ‘বিশুদ্ধবাণী’ (১ম খণ্ড) থেকে 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ