তেহরান: মার্কিন রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই সোমবার নতুন ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা বেছে নিয়েছে ইরান। আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের উত্তরসূরি হয়েছেন তাঁর ছেলে মোজতবা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘হার্ডলাইনার’ বা কট্টরপন্থী হিসাবে পরিচিত মোজতবাকে বেছে নেওয়া আসলে তেহরানের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ প্রক্রিয়ারই অঙ্গ। আর সেই জল্পনাকে সত্যি করেই এরপর প্রত্যয়ী ইরানের হুমকি, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ালেই উড়িয়ে দেওয়া হবে সেই দেশকে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান আলি লারিজানি এদিন বলেন, ট্রাম্পকে একা ছাড়া হবে না। খামেনেইকে হত্যার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ‘চরম মূল্য চোকাতে হবে। একই রকম প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন আইআরজিসি মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফিগারিও— ‘ইরানের পরমাণু গবেষণা পরিকাঠামোয় আঘাত করে যুদ্ধের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে আমেরিকা। তাই তাদের সহযোগীদের বলছি, আমেরিকার হাত ছাড়ুন। নয়তো প্রত্যাঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’ তাঁর হুঁশিয়ারি, যুদ্ধের মাশুল গুনতে হবে অশোধিত তেলের দামে। ব্যারেল প্রতি সেই দর ২০০ ডলারে পৌঁছে যেতে পারে।
তবে এদিননের সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে তেহরানকে সমর্থন করার কথা ঘোষণা করেছে রাশিয়া। পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন-ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পরেও ভ্লাদিমির পুতিনের দেশ সংযম বজায় রেখেছিল। দীর্ঘদিনের মিত্র দেশ ইরানের বেহাল অবস্থা দেখেও মস্কোর এই অবস্থানে নানা মহল থেকে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। সব দ্বিধা কাটিয়ে সোমবার ইরানকে নিঃশর্ত সমর্থনের কথা ঘোষণা করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। পুতিনের কথায়, ‘তেহরানের প্রতি অটুট সমর্থন রয়েছে। ইরানি বন্ধুদের পাশে রয়েছি।’ এখানেই থেমে থাকেননি পুতিন। তাঁর সদম্ভ ঘোষণা, ‘রাশিয়া ইরানের বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল, রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।’ নবনিযুক্ত ইরানেরর সর্বোচ্চ শাসক মোজতবার প্রতি তাঁর বার্তা, ‘ইরান যখন সশস্ত্র আগ্রাসনের মুখোমুখি হচ্ছে, তখন প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে আপনার অবস্থানে নিঃসন্দেহে প্রচণ্ড সাহস এবং নিষ্ঠার প্রয়োজন হবে।’ চীনের তরফেও কার্যত এক বার্তা এসেছে।
খামেনেইকে নিকেশের পরে ট্রাম্প সাফ জানিয়েছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ পদে মোজতবাকে তাঁরা চান না। এই অবস্থায় মোজতবার পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধেই বকলমে যুদ্ধ ঘোষণা করল রাশিয়া-চীন। বাস্তবিকই ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ পশ্চিম এশিয়া এখন আড়াআড়িভাবে দু’অক্ষে বিভক্ত। একদিকে রয়েছে ইজরায়েল-আমেরিকা। অন্য অক্ষে ইরান-রাশিয়া-চীন।
ভূ-রাজনীতির এই জটিল সমীকরণ তৈরির দিনেই ইরানে আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়িয়েছে ইজরায়েল। যুদ্ধের দশম দিনে তেহরানের পাশাপাশি ইস্পাহান এবং দক্ষিণ ইরানেও তারা আক্রমণ শানিয়েছে। ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্সের (আইডিএফ) মুখপাত্র বলেন, ‘ইরানের জঙ্গি নেটওয়ার্ক নির্মূল করতে তেহরান, ইস্ফাহান এবং দক্ষিণ ইরানে হামলা চালানো হয়েছে।’ থেমে নেই ইরানও। ইজরায়েল, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোয় তারা হামলা চালিয়েছে। ইরানের দিক থেকে উড়ে আসা ১৭টি ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে কাতার। তবে এদিনই হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের আরও একটি যুদ্ধ জাহাজ ধ্বংস করেছে মার্কিন-ইজরায়েলি বাহিনী।