Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভারতের উদ্যোগ কাম্য

হরমুজ প্রণালীতে তেলের ট্যাঙ্কার যাতায়াতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, শত্রু দেশ তো বটেই, এবং যেসব দেশ এই বিপর্যয়ে পাশে নেই তাদের জাহাজ তারা এই পথে চলতে দেবে না।

ভারতের উদ্যোগ কাম্য
  • ৫ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হরমুজ প্রণালীতে তেলের ট্যাঙ্কার যাতায়াতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, শত্রু দেশ তো বটেই, এবং যেসব দেশ এই বিপর্যয়ে পাশে নেই তাদের জাহাজ তারা এই পথে চলতে দেবে না। দেখলেই ধ্বংস করে দেবে। সোজা কথায়, চিন্তার কালো মেঘ ক্রমশ ঘন হচ্ছে মধ্য প্রাচ্যের মাঝ আকাশে। এপিক ফিউরি শুরু হয়েছে ২৭ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার। ১ মার্চ, রবিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনেইকে খতম করার পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তির্যক ভঙ্গিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, এটা চলতে পারে আরো অন্তত চার সপ্তাহ! ইরানের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনাতেও আগ্রহ দেখিয়েছিল আমেরিকা। কিন্তু তেহরান তাতে সাড়া দেওয়ার পরিবর্তে অল আউট খেলার অনড় মনোভাবই প্রকট করেছে। আমেরিকা এবং ইজরায়েলের যৌথ বাহিনীর টার্গেট—স্ট্র্যাটেজিক ইরানিয়ান মিলিটারি সাইটস—তার মধ্যে থাকছে মিসাইল ফেসিলিটিজ, নাভাল ইনস্টলেশনস ও কমান্ড সেন্টারস। ইরানের নিউক্লিয়ার ডিল ফাইনালাইজ করার ব্যাপারে ইরানকে দেওয়া ট্রাম্পের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারির সূত্রেই এই যুদ্ধের সূত্রপাত। আমেরিকা সরকারিভাবে জানিয়েছে, তাদের এই মিশন এইভাবেই সাজানো হয়েছে যে, ইরানের মিসাইল এবং সামরিক কাঠামো থেকে ধেয়ে আসা যাবতীয় হানা তারা নিখুঁতভাবে রুখে দেবে। ইরানকে মুখতোড় জবাবসহ মার্কিন নাগরিক এবং তার সহযোগীদেরও সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। 

Advertisement

কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের হত্যার বদলা নিতে রবিবার রাত থেকেই শুরু হয়েছে একের পর এক মিসাইল এবং ড্রোন হামলা! ইরান একা নয়, সঙ্গে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লার মতো বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীও। যুদ্ধের চতুর্থ দিনে সেই প্রত্যাঘাতে ইজরায়েলের সঙ্গেই কাঁপছে গোটা আরব দুনিয়া। ইরাক, কুয়েত, জর্ডন, বাহরিন, কাতার, ইউএই, সৌদি আরব, এমনকি ওমানেও আছড়ে পড়েছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। প্রতিটি ক্ষেত্রে ইরানের পাখির চোখ আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলি। ইতিমধ্যেই আমেরিকার এবং তার সহযোগী দেশগুলির বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। সোমবার সাতসকালে কুয়েতে ভেঙে পড়ে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান। তবে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, কুয়েতি এয়ার ডিফেন্স ফোর্সের সেমসাইড গোল হয়ে গিয়েছে। তাতেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে মার্কিন এফ-১৫ই ফাইটার জেটগুলি। কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসেও অগ্নিসংযোগের চিত্র সামনে এসেছে। এমনকি পশ্চিম এশিয়ায় সেফ হেভেন দুবাই বিমানবন্দর বিপর্যস্ত। সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সেনাঘাঁটিকেও নিশানা করেছিল দুটি ড্রোন। 
তবে সোমবারের যে ঘটনা গোটা বিশ্বকে আতঙ্কিত করে তুলেছে, তা হল সৌদির রাস টানুরায় আরামকোর তেল শোধনাগারে ইরানের জোড়া ড্রোন হামলা। শোধনাগার থেকে কালো পুরু ধোঁয়া বেরিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সুবৃহৎ এই রিফাইনারিতে দৈনিক সাড়ে পাঁচ লক্ষ ব্যারেল তেল পরিশোধিত হয়। আপাতত সেটি বন্ধ রাখারই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। একটি তেলের ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওমান উপসাগরে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের ট্যাঙ্কার যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইরান। সব মিলিয়ে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে বিশ্বজুড়েই জ্বালানি অগ্নিমূল্য। দাম বাড়ছে দ্রুত। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এখনই প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছে। যুদ্ধ শুরু হতেই গ্যাস উত্পাদন বন্ধ করেছে কাতার। তাতে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামবৃদ্ধি ঘটেছে ৪০ শতাংশেরও বেশি। নগরে আগুন লাগলে যেমন দেবালয়ও রক্ষা পায় না, তেমনি নিস্তার নেই আমাদের ভারতেরও। তেল ও গ্যাসের অগ্নিমূল্যের আঁচ ভারতের বাজারেও পড়ে গিয়েছে। এই সর্বনাশ অদূর ভবিষ্যতে কী আকার নেবে তা ভেবে ইতিমধ্যেই আতঙ্কিত অর্থনীতির পণ্ডিতরা। কারণ ভারতে তেল ও গ্যাসের যে বিপুল চাহিদা, তুলনায় দেশীয় উৎপাদন নগণ্য। আমদানির অর্ধেকের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ভারতে যে তেলের মজুত রয়েছে, তাতে খুব বেশিদিন চলবে না। আবার রাশিয়ার তেল নিয়েও আমেরিকার আপত্তি এক বড়ো কাঁটা। সব মিলিয়ে তেল বা জ্বালানি ইস্যুতে রীতিমতো ব্যাকফুটে ভারত। শুধু তেল আমদানিই নয়, ভারতের প্রায় এক কোটি মানুষ মধ্যপ্রাচ্যে জীবিকার প্রয়োজনে রয়েছেন। তাঁদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে। তাতে পুষ্ট হয় ভারতের অর্থনীতি। অন্যদিকে, পরিবহণ খরচ থেকে শুরু করে সমস্ত পণ্যের দামও তেলের দামের সঙ্গে ওঠানামা করে। তার দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত কর্মসংস্থানও। তাই ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের এই অবাঞ্ছিত যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। ভারতসহ বিশ্ব অর্থনীতিকে সর্বনাশের দোরগোড়া থেকে ফেরানোর জন্যই তা দরকার। বৃহত্তম গণতন্ত্র এবং শান্তিকামী বৃহৎ শক্তি হিসেবে ভারতের উচিত এই ব্যাপারে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ