


ডাঃ আশিস দত্ত: ব্রেনের বিকাশের প্রক্রিয়াটি শুরু হয় ভ্রূণ অবস্থা থেকেই। এই কারণেই বারবার সন্তানসম্ভবা মহিলাকে পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়ানোর কথা বলা হয়। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাকে ভালো খাবারদাবার খাওয়ানোর কথাও বলা হয়। স্কুলে পড়ার সময় বাচ্চার ব্রেন যাতে ভালোভাবে কাজ করে তা নিয়ে বাবা-মা চিন্তিত থাকেন। সন্তানের পুষ্টির জন্য জরুরি নানা খাদ্য খাওয়ানোর ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। স্কুলের গণ্ডি কাটিয়ে কলেজে প্রবেশের পর খাবার নিয়ে শুধু চিন্তা আর চিন্তা! ওদিকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর সেখানে পারফরম্যান্স ভালো করার জন্য আরেক চিন্তা। আবার আমরা চাই বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যেন ব্রেন ফেল না করে, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতি হারানোর ঘটনা না ঘটে! সারা জীবনই ব্রেন সতেজ রাখার জন্য কী খাওয়া উচিত তা নিয়ে আমাদের চিন্তার অন্ত নেই। তাহলে দেখে নেওয়া যাক কী খেলে ভালো হয়।
সবুজ শাকসব্জি
সব ধরনের সবুজ শাকসব্জিতেই রয়েছে একাধিক ভিটামিন এবং খনিজ। বিশেষ করে পালং শাক, বাঁধাকপি, ব্রকোলির মতো খাদ্য অবশ্যই পাতে রাখতে হবে। এই ধরনের খাদ্যে মেলে লিউটিন, ফোলেট, বিটা ক্যারোটিনের মতো উপাদান। উপাদানগুলি ব্রেনের কগনেটিভ ডিক্লাইন বা চিন্তাভাবনার মধ্যে মন্থরতা আসা প্রতিরোধ করে। এছাড়া সব ধরনের শাকের কথা আলাদা করে বলতেই হবে। শিশুরা শাক খেতে তেমন পছন্দ করে না ঠিকই, তবে বাড়িতে সকলে একসঙ্গে বসে শাক দিয়ে ভাত খেলে শিশুও খেতে শিখবে। শাক ব্রেনের স্বাস্থ্যের জরুরি উপাদানের জোগান দেয়।
মাছ
ফ্যাটি ফিশ বা তেলযুক্ত মাছ ব্রেনের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা নেয়। আবার কগনেটিভ ডিটোরিয়েশন বা নিউরোনের ক্ষয় কমাতেও সাহায্য করে এই ধরনের মাছ। তেল যুক্ত মাছে আছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, যা রক্তে বিটা অ্যামাইলয়েড নামে একটি ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
দেখা গিয়েছে অ্যালঝাইমার্স রোগীর ব্রেনের নিউরোনের উপর বিটা অ্যামাইলয়েড প্লাক জমা হয়। ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তে বিটা অ্যামাইলয়েডের মাত্রা কমাতে পারে। রক্তে বিটা অ্যামাইলয়েডের মাত্রা কমলে প্লাক জমাও প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। ফলে অ্যালঝাইমার্স রোগও প্রতিরোধ করা যায়।
বেরি
বেরির কথা বললেই আমরা কল্পনা করতে থাকি ব্লু বেরি, ব্ল্যাক বেরি, এই সমস্ত বিদেশি এবং মহার্ঘ ফলের কথা। অনেকেই ভাবেন, ‘দামি দামি বিদেশি ফল ডাক্তারবাবু খেতে বলছেন, আমার সন্তান তো আর পারবে না ওসব খেতে, তাহলে ওর ব্রেন কি সতেজ হবে না?’ এই ধারণা সর্বৈব ভুল। বেরি শব্দটি ইংরেজি শব্দ হতে পারে। তবে আমাদের দেশের বেশ কিছু ফল বেরি জাতীয় ফলের অধীনেই পড়ে। উদাহরণ হিসেবে জামের কথা বলা যায়। বর্ষাকালে জাম পাওয়া যায় একথা আমরা জানি। আবার আমলকীও একধরনের বেরিজাতীয় ফল। বাজারে ফলের দোকানে যে কালো রঙের আঙুরের দেখা মেলে তাও এক ধরনের বেরি। সুতরাং বেরি বললে সবসময় বিদেশ থেকে আনা ব্লু বেরি খেতে হবে তার কোনও অর্থ নেই। অতএব বর্ষাকালে জাম খান। গ্রীষ্মকালে আঙুর আর শীতকালে আমলকী।
প্রশ্ন হল, বেরি জাতীয় ফল নিয়ে এত আলোচনার কারণ কী? আসলে বেরি জাতীয় ফলে রয়েছে ‘প্লান্ট পিগমেন্ট’। এই উপাদান স্মৃতিশক্তি বাড়াতে বিশেষভাবে কাজে আসে। এছাড়া রয়েছে যথেষ্ট মাত্রায় ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ফাইবার ইত্যাদি। সুতরাং পর্যাপ্ত মাত্রায় বেরি জাতীয় খাদ্য খাওয়া গেলে উপকারই হবে। আজকাল গ্রামেগঞ্জে স্ট্রবেরির চাষও হচ্ছে। তাও খেতে পারেন মাঝেমধ্যে!
চা, কফি এবং ডার্ক চকোলেট
দিনে একবার-দু’বার চা বা কফি পান করা যায়। ব্রেনের হায়ার ফাংশন বা হায়ার মেন্টাল ফাংশনকে উন্নত করে চা, কফি। এই ধরনের পানীয়ে থাকে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি উপাদান যা ব্রেনের কোষের ক্ষতি রোধ করে। তাই বলে চা, কফি খুব বেশি দুধ দিয়ে আর চিনি দিয়ে খাওয়ার কথা বলা হচ্ছে না। খেতে হবে লাল চা। কফি পান করুন ব্ল্যাক, তাও চিনি ছাড়া। মনে রাখবেন চিনি মেশানো খাদ্য ও পানীয় কখনওই ব্রেনের স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী নয়।
কফি খেলে আমরা জেগে থাকি। কারণ কফির ক্যাফিন ব্রেনে থাকা নিউরোট্রান্সমিটার অ্যাডিনোসিনের মাত্রা হ্রাস করে। অ্যাডিনোসিন আমাদের ঘুম আসার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। তাই ব্রেনে অ্যাডিনোসিনের মাত্রা হ্রাস পেলে ব্রেন সজাগ হয়ে যায়। একইসঙ্গে মেজাজের উন্নতি ঘটাতেও সক্ষম ক্যাফিন। কফি ব্রেনে একটি নিউরোট্রান্সমিটারের ক্ষরণ ঘটায় যার নাম সেরেটোনিন। এই নিউরোট্রান্সমিটার মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। বাচ্চা-বড় সকলের ক্ষেত্রে ডার্ক চকোলেটও সমানভাবে উপকারী। এতে থাকে ফ্ল্যাভোনয়েডস যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে ও ব্রেনের কোষের ক্ষতি রোধ করে।
বাদাম: বাদাম খাওয়ার কথা উঠলে অনেকেই শুধু আখরোট খাওয়ার কথা ভাবেন। হ্যাঁ, আখরোট নিঃসন্দেহে উপকারী। তবে স্মৃতিশক্তির উন্নতি ঘটাতে যে কোনও ধরনের বাদামই উপকারী। আখরোট খান, পাশপাশি কাজুবাদাম, চিনেবাদাম অবশ্যই খেতে পারেন। বাদামে থাকে প্রচুর ফ্যাট আর প্রোটিন। স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও প্রোটিন স্মৃতির উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করে।
মোটামুটি এই হল ব্রেন সতেজ করার খাবারদাবার।
বোনাস খাদ্য ও পানীয়
টম্যাটো: অক্সিডেটিভ স্ট্রেস-এর কারণে শরীরে তৈরি হয় ফ্রি র্যাডিকেলস। এর বাড়বাড়ন্তে আমাদের ব্রেনে প্রদাহ দেখা যায়। ফলে ব্রেনের কোষের ক্ষতি হয়। ফ্রি র্যাডিকেলস কমাতে পারে টম্যাটো। তাই প্রতিদিন স্যালাডে রাখুন টম্যাটো!
ডিম: বাচ্চাদের জন্য গোটা ডিম দুর্দান্ত উপকারী। বাচ্চারা ইচ্ছে মতো ডিম খেতে পারে। বৃদ্ধ বয়সেও ডিম খাওয়া যায়। তবে সেই সময় কুসুম বাদ দিয়ে খাওয়াই ভালো। ডিম কেন উপকারী? বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ব্রেনের আট্রফি বা শুকিয়ে যাওয়া রোধ করে ডিমে থাকা ভিটামিন বি৬, বি১২ এবং কোলিন।
কোলিনের কথা আলাদা করে বলা দরকার। ব্রেনে এক নিউরোনের সঙ্গে অন্য নিউরোনের সংযোগ রক্ষা করতে সাহায্য করে বিশেষ নিউরোট্রান্সমিটার যার নাম অ্যাসিটাইল কোলিন। এছাড়া মেজাজ ভালো রাখতে ও স্মৃতি ধরে রাখতেও সাহায্য করে এই নিউরোট্রান্সমিটার। এই নিউরোট্রান্সমিটারের উৎপাদনে আবার সাহায্য করে ডিমে থাকা কোলিন।
প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ৮ গ্লাস জল পান জরুরি। আমাদের রক্তের বেশিরভাগ উপাদানই জল। ফলে ব্রেনে অক্সিজেন থেকে শুরু করে পুষ্টি উপাদান পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভরসা সেই রক্ত। তাই ডিহাইড্রেশন এড়াতে ও ব্রেনের কার্যকারিতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত জল পান জরুরি।
সামান্য সংযোজন
ব্রেন সতেজ রাখতে পারে কেমন ডায়েট? এই নিয়ে হয়েছে বিস্তর গবেষণা। দেখা গিয়েছে ব্রেন সতেজ রাখার ক্ষেত্রে উপযোগী হল মেডিটেরিনিয়ান ডায়েট। অর্থাৎ স্পেন, ইতালি, গ্রিস, ফ্রান্স এইসব দেশের যে খাদ্যাভ্যাস তাকেই বলে মেডিটেরিনিয়ান ডায়েট। এই ডায়েটে থাকা নানা খাদ্য উপাদান আমাদের মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। মন ভালো থাকলে মাথাও ভালো কাজ করে।
খাদ্যগুলি কীভাবে মন ভালো রাখে? আসলে, মন ভালো রাখার জন্য সেরেটোনিন নামে একটি নিউরোট্রান্সমিটারের দরকার। ৯৫ শতাংশ নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি হয় গ্যাস্ট্রোইনটেসটাইনাল ট্র্যাক্ট-এ। সেরোটোনিন উৎপাদনে সাহায্য করে অন্ত্রের বেশকিছু ভালো ব্যাকটেরিয়া। অতএব এমন কিছু খাদ্য আমাদের প্রতিদিন খাওয়া উচিত যা অন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা বাড়াতে পারে। ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়লে সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়বে এবং মন-মেজাজের উন্নতি হবে। ব্রেনও কাজ করবে ভালো। দেখা গিয়েছে এই ডায়েট অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ও সেরেটোনিনের মাত্রা বাড়ায়।
মেডিটেরিনিয়ান ডায়েটে কী থাকে? আমরা কি সেগুলি খেতে পাই না? মেডিটেরিনিয়ান ডায়েট সম্পূর্ণ হয় শাকসব্জি, ফল, গমের তৈরি খাদ্য, বাদাম এবং অলিভ অয়েল দ্বারা। অলিভ অয়েল আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড দ্বারা পূর্ণ। দেখতে গেলে বাঙালিদের সনাতন খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মেডিটেরিনিয়ান ডায়েটের মিল আছে। আমরাও তো আগে খেতাম ভাত, রুটি, শাক, মাছ, ডাল। টিফিনে মুড়ির সঙ্গে আমরা খেতাম অঙ্কুরিত ছোলা, বাদাম। বাটার, চিজ হ্যামবার্গার কোথায় ছিল তখন? ব্যস্ত জীবনে এখন রান্না করার সময় নেই বলে সকলে রেডি টু ইট ফুডে অভ্যস্ত হতে গিয়ে শরীরের সঙ্গে মস্তিষ্কেরও হানি ঘটাচ্ছি।
কী খাবেন না?
স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাদ্য যেমন মাখন, চিজ, ঘি, তেল ব্রেনের পক্ষে হানিকারক। কোনওরকম প্রিজারভেটিভ দেওয়া খাদ্য যেমন দোকানের কেক, পেস্ট্রি, প্যাকেটজাত খাদ্য একেবারেই খাবেন না। রেড মিট যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন। বাচ্চা থেকে বয়স্ক সকলেই পান করা বন্ধ করুন মিষ্টি যে কোনও পানীয়। কোল্ড ড্রিংকসই হোক বা অন্য কোনও পানীয়, তার মধ্যে মেশানো হয় কৃত্রিম মিষ্টি আসপার্টেম। আসপার্টেম ব্রেনের কোষের ভয়ঙ্কর ক্ষতি করে। চিনি মেশানো পানীয়ও এড়িয়ে চলুন কারণ চিনিও ব্রেনের কোষের পক্ষে ভালো নয়। ময়দার তৈরি যে কোনও খাদ্য এড়িয়ে চলুন। যে কোনও ধরনের অ্যালকোহল ব্রেনের পক্ষে টক্সিন হিসেবেই কাজ করে।
লেখক ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স (কলকাতা)-এর নিউরোলজিস্ট।
অনুলিখন: সুপ্রিয় নায়েক