


পরামর্শে অ্যাপোলো হাসপাতালের ইউরোগাইনিকোলজিস্ট ডাঃ মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায়।
সাধারণ মানুষ চলতি কথায় ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই-কে ‘ই কোলাই’ কিংবা ‘বি কোলাই’ বলে। তবে এখানে একটি ভ্রান্তি রয়েছে। আদতে ‘বি কোলাই’ বলে কিছু হয় না। যেসব জীবাণুর সংক্রমণে ইউটিআই হয়, তার অন্যতম ই-কোলাই। এই ই-কোলাই কথাটিকেই অপভ্রংশে ‘বি-কোলাই’ বলেন অনেকে। ই-কোলাই ছাড়াও প্রোটিয়াস, সিউডোমোনাস ইত্যাদি জীবাণুও এই রোগের জন্য দায়ী। এই জীবাণুগুলি কোনওটাই বাইরে থেকে শরীরে প্রবেশ করে না। সবই মানুষের পেটের ভিতর থাকে। তাই মলত্যাগের সময় জিআই ট্র্যাক্টের মাধ্যমে এসে রেকটামের চারপাশে ছড়িয়ে থাকে। এই জীবাণুগুলির সংক্রমণের কারণেই রোগী অসুখের শিকার হন।
মেয়েরা ঘন ঘন আক্রান্ত কেন?
ইউটিআই নিয়ে মধ্যবয়স্ক মহিলারা বেশ টেনশনে থাকেন। অস্বীকার করার উপায় নেই, এই অসুখ মধ্যবয়সি মহিলাদের ঘন ঘন হতে পারে। এর নেপথ্যে কিছু কারণ রয়েছে। যেমন: ১. রেকটাম ও ভ্যাজাইনার মধ্যে দূরত্ব খুব কম। তাই রেকটামের চারপাশে এসে জড়ো হওয়া জীবাণুগুলি সহজেই ভ্যাজাইনার কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ২. ইউরেথ্রা বা যে নালী দিয়ে ইউরিন শরীরের বাইরে নির্গত হয়, পুরুষের সেই নালীর দৈর্ঘ্য ৯-১০ সেমি, মহিলাদের ক্ষেত্রে সেই নালীর দৈর্ঘ্য মাত্র ১.৫-২ সেমি। তাই যদি কোনওভাবে এই জীবাণুগুলি ভ্যাজাইনার কাছে পৌঁছয়, তাহলে সহজেই ইউরেথ্রার মাধ্যমে খুব কম পথ অতিক্রম করে সেগুলি শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে। ৩. ভ্যাজাইনায় সবসময়ই প্রচুর উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে। কিন্তু কোনওভাবে ভ্যাজাইনাল অংশের স্বাস্থ্য বিঘ্নিত হলে তারা শরীরের বাহ্যিক অংশের দিকে উঠে আসে ও স্থানীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দিতে পারে। ৪. এছাড়া মহিলাদের জীবনে একটি পর্যায়ে মেনোপজ আসে। পিরিয়ড চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মেয়েদের শরীরে কিছু হরমোনের পরিবর্তন হয়। তাই এই সময় মেয়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে। তাই মেয়েদের ইউটিআই বেশি পরিমাণে হয়। ছেলেদের জীবনচক্রে এমন কোনও ‘লাইফ ইভেন্ট’ না থাকায় পুরুষের তুলনায় মেয়েদের ক্ষেত্রে এই রোগের হানা বেশি।
ইউটিআই সাধারণত দু’ধরনের। সিঙ্গল ইউটিআই ও রেকারেন্ট ইউটিআই।
সিঙ্গল ইউটিআই: সম্প্রতি কোনও কারণে ইউটিআই হানা দিয়েছে, চিকিৎসার মাধ্যমে নানা অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাবে তা ভালো হল। এই যে একবার অসুখটি হানা দিল, একে বলে সিঙ্গল ইউটিআই।
রেকারেন্ট ইউটিআই: বারবার ইউটিআই ফিরে এলে, সেই সমস্যা কেন বারবার ঘুরেফিরে আসছে, তা বোঝা দরকার। বারবার এই অসুখ হানা দিলে তাকে বলে রেকারেন্ট ইউটিআই।
এই রেকারেন্ট ইউটিআই আবার দু’প্রকার। ১. পার্সিস্ট্যান্ট ইউটিআই ২. রিল্যাপ্স ইউটিআই। ধরা যাক, কোনও মহিলার একবার ই-কোলাই ইনফেকশন থেকে ইউটিআই হয়েছে। হয়তো ওষুধপত্র খেয়ে সাময়িক সুস্থ হলেও সংক্রমণের পুরোটা শরীর থেকে যায়নি। ফলে প্রতি মাসেই ই-কোলাই সংক্রমণ হানা দিচ্ছে। এমন হলে তাকে বলে পার্সিস্ট্যান্ট ইউটিআই। আবার অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এক মাসে ই-কোলাই হানা দিল, সেরেও গেল সম্পূর্ণ, কিন্তু মাস যেতে না যেতেই ফের সিউডোমোনাস ইনফেকশন হল। সেটা সারার পর হয়তো প্রোটিয়াস বা অন্য কোনও সংক্রমণ হল। অর্থাৎ বারবার নতুন নতুন সংক্রমণ হচ্ছে। একে বলে রিল্যাপ্স ইউটিআই। ইউরিনের রুটিন কালচার করা হলে তবেই এই অসুখটি পার্সিস্ট্যান্ট নাকি রেকারেন্স সে সম্পর্কে ধারণা জন্মাবে। তাই ইউটিআই-এক অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স শেষ হওয়ার পরেও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ফের ইউরিনের রুটিন কালচার করতে হবে।
রেকারেন্ট ইউটিআই কেন হয়?
নানা কারণে এই অসুখ হয়। এর অন্যতম কারণ পেট পরিষ্কার না হওয়া। অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, হয়তো গত দু’দিন পেট পরিষ্কার হল না, পরের একদিন হয়তো ডায়ারিয়ার মতো হল। ডায়ারিয়ার দিন কিন্তু বাওয়েল ট্র্যাক্ট থেকে রেকটাম পর্যন্ত বারবার জীবাণু আসার সুযোগ পায়। তাই রেকটামের আশপাশে ব্যাকটেরিয়া লোড বেড়ে যায় ও সংক্রমণ ঘটে। পেটের নানা অসুখ— যেমন, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম, ইনফ্লামেটরি বাওয়েল ডিজিজ, ক্রনিক কনস্টিপেশন ইত্যাদি সমস্যাগুলির চিকিৎসা না করলে রেকারেন্ট ইউটিআই-এর প্রবণতা বাড়বে।
আর একটি কারণ অটোইমিউন ডিজঅর্ডার। অর্থাৎ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি। থাইরয়েড, ডায়াবেটিস, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, ইরিটেবল বাওয়েল ডিজিজ, চোখের নানা অসুখ, ক্যান্সার ও কিডনি প্রতিস্থাপনের রোগীদেরও ইমিউন সাপ্রেশেন্ট (অটোইমিউন অসুখ বাগে আনার ওষুধ) দেওয়া হয়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কমে যাওয়ার জন্য এই রোগীদের শরীরেও বারবার ইউটিআই হানা দিতে পারে।
এছাড়া যদি কোনও কারণে মূত্রথলিতে সমস্যা থাকে অর্থাৎ মূত্রত্যাগের পরেও থলিতে মূত্র জমে থাকে তাহলে ওই জমা মূত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়।
বেশি বয়সের অনেক মহিলা আবার মূত্র ধরে রাখতে পারেন না। লিকেজের সমস্যা দেখা দেয়। ফলে ভ্যাজাইনা থেকে রেকটামের পর্যন্ত একটা জলের নালী তৈরি হয়। ফলে রেকটামের আশপাশে ছড়িয়ে থাকা জীবাণু এই নালী বা ট্র্যাক্ট ধরে উপরের দিকে উঠে যায় ও ইউটিআই ঘটায়। লিকেজ অনেক সময় খুব কম পরিমাণে হয়। সেই জমা ইউরিন ভ্যাজাইনায় জমে একটি সাদা ডিসচার্জে পরিণত হয় ও নানা কাজের মাঝে ভ্যাজাইনা থেকে হোয়াইট ডিসচার্জ হিসেবে নিঃসৃত হয়। এই লিকেজের সমস্যার ঠিক চিকিৎসা না হলে ইউটিআই হওয়ার প্রবণতা বাড়বে।
ইউটিআই-এর লক্ষণ
ইউটিআই-এর সাধারণ উপসর্গ বলতে আমরা বুঝি, ইউরিন করার সময় জ্বালা, যন্ত্রণা বা ব্যথা হওয়া, কারও আবার পেটে খুব ব্যথা শুরু হয়। কখনও জ্বর আসে, ইউরিন হওয়ার পরেও মনে হয়, এখনও অনেকটা ইউরিন জমে আছে ইত্যাদি। তবে এই সব লক্ষণ থাকলেও ইউটিআই হয়েছে কি না তার প্রধান প্রমাণ একটি ইউরিন কালচার রিপোর্ট। এইসব উপসর্গ কিন্তু মূত্রের অন্য নানা অসুখের কারণে ও বাওয়েলজনিত নানা অসুখের কারণেও হতে পারে। তাই অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে প্রথমবার কালচার করানো খুব প্রয়োজন। সেখানে ব্যাকটেরিয়া লোড যদি ১০৫ –এর বেশি হয়, তাহলে ওষুধ দেওয়া প্রয়োজন। ওষুধ বন্ধ হওয়ার তিন-চার সপ্তাহ পরে ফের একবার ইউরিন কালচার রিপোর্ট করাতে হবে।
অনেক সময় উপসর্গ থাকে, পাস সেল বা আরবিসি পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে নিয়ম মেনে ইউরিন কালচার করলে দেখা যাচ্ছে ইনফেকশন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন?
এমন সমস্যাও অনেক মহিলার ক্ষেত্রে দেখা যায়। একে বলে স্টেরাইল পায়ুরিয়া। এমন হলে তিনটি জিনিস খেয়াল করতে হবে। ১. ইউরিনারি ট্র্যাক্টের কোথাও স্টোন আছে কি না ২. ক্যান্সার আছে কি না ৩. ইউরিনারি ট্র্যাক্ট-এ টিবি বা টিউবারক্যুলোসিস আছে কি না। এসব ক্ষেত্রে আন্টিবায়োটিক সমাধান নয়। টিবি সহজে ধরা পড়ে না। তাই সেক্ষেত্রে পরপর তিনদিন ইউরিন টেস্ট করতে পাঠাতে হবে। সঙ্গে অবশ্যই প্রয়োজন ফের ইউরিন কালচার রিপোর্ট।
কী কী টেস্টে ধরা পড়ে ইউটিআই
সাধারণ ইউটিআই-এর জন্য সাধারণত ইউরিন রুটিন কালচার করেই দেখা হয়। তবে এর সঙ্গে আরও কিছু পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া দরকার। যেমন: আল্ট্রাসোনোগ্রাফি, প্রি অ্যান্ড পোস্ট ভয়েড টেস্ট (ইউরিন করার আগে কতটা ইউরিন ব্লাডারে ছিল ও পরে কতটা ইউরিন ব্লাডারে থেকে যাচ্ছে), ফাস্টিং-পিপির সঙ্গে এইচবিএ১সি, থাইরয়েডের পরীক্ষায় টিএসএইচ-এর সঙ্গে টি৪, পেটের জন্য স্টুল রুটিন কালচার ও স্টুল ফর ক্যালপ্রোটেক্টিন, স্টুল ফর অকাল্ট ব্লাড। এরপরেও চিকিৎসক প্রয়োজন পড়লে কিডনি ও ইউরিনারি ব্লাডারের সিটি স্ক্যান করাবেন।
অসুখ নিয়ে কিছু মিথ ও মেনে চলার নিয়ম
• কমোড ছাড়া বাইরের বাথরুম ব্যবহার করলে ইউটিআই হয় না। অনেকের ধারণা, বাইরের বাথরুম থেকে এই সংক্রমণ বেশি ছড়ায়। কিন্তু এই মতবাদ ঠিক নয়। বরং কমোড-সহ বাইরের বাথরুমে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। যতক্ষণ না পর্যন্ত অন্যের ইউরিন আপনার ভ্যাজাইনাল বা রেকটাম অংশকে স্পর্শ করছে, ততক্ষণে অন্যের ইউরিন থেকে সংক্রমণ ছড়ায় না। এই সংক্রমণ আসলে মূলত হয় কমোড থেকে। কমোডে বসার জায়গায় অন্যের ভ্যাজাইনাল অংশ ছুঁয়ে থাকে। তাই তাতে জীবাণু থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই প্রতিবার বাইরের কমোড ব্যবহার করার সময় কোনও জীবাণুনাশক স্প্রে ব্যবহার করুন বা ওয়েট ওয়াইপ দিয়ে কমোড মুছে নিন।
• প্রতিবার ইউরিন করার পর হ্যান্ড শাওয়ার দিয়ে বা মগে জল দিয়ে সামনে থেকে জায়গাটি ধুয়ে নিন। সামনে থেকে পিছনদিকে জলের দিয়ে ধুতে হবে। কোনওভাবেই পিছনে রেকটামের কাছে যাওয়ার পর ফের ভ্যাজাইনার অংশ ধোয়া যাবে না। এতে রেকটাম অঞ্চলের জীবাণু জলের তোড়ে ভ্যাজাইনার কাছে চলে আসতে পারে। ধোয়ার সময় নখ বা হাতের তালু এতে স্পর্শ করাবেন না। বাইরে থাকলে নন মেডিকেটেড বেবি ওয়াইপ দিয়ে একবার জায়গাটি সামনে থেকে পিছনে টেনে মুছে নিন। একাধিকবার পরিষ্কার করতে চাইলে একাধিক ওয়াইপ ব্যবহার করতে হবে ও একই নিয়মে পরিষ্কার করতে হবে। এক্ষেত্রেও ওয়াইপ রেকটাম ছুঁয়ে গেলে আর তাকে ভ্যাজাইনাল অংশে আনা যাবে না।
• কোনও জীবাণুনাশক লোশন, জেল বা জীবাণুনাশক ওষুধ ভ্যাজাইনায় দেবেন না। এতে ওখানকার ভালো ব্যাকটেরিয়া মরে যায় ও খারাপ ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বাড়ে।
• প্রতিদিন অন্তত ২.৫ লিটার জল খেতে হবে। যাঁরা বেশি কায়িক শ্রম করেন, তাঁরা ৩ লিটার জল খাবেন। অনেকে ইউটিআই ঠেকাতে ৪-৫ লিটার জল খান, এটা ঠিক কাজ নয়। এতে কিডনির উপর চাপ বাড়ে।
• গ্লুটেনে অ্যালার্জি থাকলে তা এড়িয়ে চলুন। ডায়াবেটিসের রোগী-সহ সকলেই পাতে ফাইবারসমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ বাড়ান।
লিখেছেন মনীষা মুখোপাধ্যায়