


নোবেল পাননি। তবে তাঁর উত্তরণ নোবেল জয়ের তুলনায় কম নয়। বাগান পরিচর্যা, টেনিস কোর্টের ঘাস ছাঁটাই করাই ছিল হ্যামিল্টনের প্রধান কাজ। অথচ বিশ্বে প্রথম হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি! কীভাবে সম্ভব হল তা? লিখেছেন বিভাস মজুমদার।
আলিবাবা ও ৪০ ডাকাতের সেই গল্পটার কথা নিশ্চয় মনে আছে। আলিবাবার ভাই কাশিম ডাকাতদের ডেরায় গুহার দরজা খোলার নির্দেশ ঠিকমতো বলতে না পারার জন্য বেরতে পারেনি। আর ডাকাতরা এসে তাঁকে কেটে কয়েক টুকরো করে ফেলেছিল। এরপর ডাকাতরা গুহা থেকে বেরিয়ে চলে যাওয়ার পর কাশিমের দেহের টুকরো গুহার মধ্যে থেকে উদ্ধার করে এনেছিল আলিবাবা। আর সেই দেহ জুড়ে দেওয়ার জন্য চোখ বেঁধে এক মুচিকে নিয়ে এসেছিল। মোস্তাফা নামে সেই মুচি সুন্দর করে কাশিমের দেহ সেলাই করে দিয়েছিল। এটা নিছক কাহিনিমাত্র। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় এমন ঘটনা দেখা যায় যেটা অবাক করে দেয়। সেরকমই এক ব্যক্তি ছিলেন হ্যামিল্টন নেকি। দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক হ্যামিল্টনের চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডিগ্রি তো দূর অস্ত, স্কুলে গিয়েও সেভাবে পড়ার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর। অথচ বিশ্বে প্রথম এক মানুষের হৃদপিণ্ড অন্যজনের দেহে প্রতিস্থাপন করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। শুধু অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া নয়, ব্রেন ডেথ হয়ে যাওয়া এক রোগিণীর দেহ থেকে হৃদপিণ্ড নিয়ে তা এক জীবিত ব্যক্তির দেহে প্রতিস্থাপন করতে সহায়তা করেছিলেন। এই অস্ত্রোপচারের পর নিখুঁতভাবে জীবিত ব্যক্তির ক্ষতস্থান সেলাই করেও দিয়েছিলেন।
১৯৬৭ সালের ৩ ডিসেম্বরের ওই ঘটনা চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি করেছে। ওইদিনের ঘটনাটি ছিল এরকম— দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনে এক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে সপরিবারে বেড়াতে এসেছিলেন ২৫ বছরের তরুণী ডেনিস ডারভিল। বিকালে বন্ধুদের সঙ্গে চা খেয়ে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়েছিল ওই তরুণী। এর পর মাকে সঙ্গে নিয়ে কেক কিনতে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। সেই সময় রাস্তার ধারে একটা বিশাল ট্রাক দাঁড়িয়েছিল। সেই ট্রাকের পাশ দিয়ে রাস্তা পার করার সময় একটা গাড়ি সজোরে তাদের ধাক্কা মারে। রাস্তা ধারে ট্রাক পার্কিং করে রাখার জন্য গাড়ি চালক ওই তরুণী আর তাঁর মাকে দেখতে পাননি। আর তাতেই এই দুর্ঘটনা। ঘটনাস্থলেই ওই তরুণীর মায়ের মৃত্যু হয়। আর গুরুতর জখম অবস্থায় ডেনিসকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই দুর্ঘটনায় ওই তরুণীর খুলিতে চিড় ধরে গিয়েছিল আর মাথায় প্রচুর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরেই ব্রেন ডেথ হয়ে যায়। কৃত্রিমভাবে বাইরে থেকে তাঁর শ্বাসযন্ত্র চালু রাখা হয়েছিল। তবে তাঁর হৃদপিণ্ড ভালোভাবে কাজ করছিল। এই অবস্থায় বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে যায়। সেই সময় কেপটাউনের গ্রুটি সেচুর হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৫৪ বছরের আর এক রোগী লুইস ওয়াসকানস্কি। দক্ষিণ আফ্রিকার বাসিন্দা লুইস কেপটাউনে মুদিখানা সামগ্রীর ব্যবসা করতেন। তিনি একজন খেলোয়াড়ও ছিলেন। ফুটবল, সাঁতার এবং ভারোত্তলনে দক্ষ ছিলেন। পরবর্তীকালে হৃদরোগের জন্য তিনি সেসব ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ইতিমধ্যে তাঁর দু’বার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায়। তাঁর হৃদযন্ত্র খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। কেপটাউনের ওই হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন নতুন হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন করা ছাড়া তাঁকে বাচানো কঠিন। তিনি যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন সেই সময়েই ডারভিলকে দুর্ঘটনায় জখম অবস্থায় এই হাসপাতালে আনা হয়েছিল। ডারভিলের ব্রেন ডেথ হয়ে যাওয়ায় তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ে। কিন্তু ডারভিলের হৃদযন্ত্র খুবই শক্তিশালী ছিল। তাই ওই তরুণী বেঁচেছিলেন। এই সময় ডারভিলের অবস্থার কথা তাঁর বাবাকে জানানো হয়। সেইসঙ্গে তাঁর কাছে ডারভিলের হৃদযন্ত্র লুইসের শরীরে প্রতিস্থাপন করার জন্য অনুমতি চান চিকিৎসকরা। ডারভিলের বাবা খুব বড় মনের মানুষ ছিলেন। তিনি তাঁর প্রতিবেশীদের বিপদের দিনে পাশে দাঁড়াতেন। লুইসের শারীরিক অবস্থা শোনার পর তিনি ডারভিলের হৃদযন্ত্র ও কিডনি অন্য রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করার অনুমতি দেন। কিন্তু অনুমতি পেলেই তো আর হল না। একজন জীবিত মানুষের শরীর থেকে হৃদযন্ত্র খুলে নেওয়া চিকিৎসা বিজ্ঞানে খুবই গর্হিত কাজ। এই নীতিবিরুদ্ধ কাজ করা চিকিৎসকদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই ঠিক করা হল ডারভিলের হৃদযন্ত্রকে সাময়িকভাবে অকেজো করে তোলা হবে। এতে চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী ডারভিলের মৃত্যু হবে। তাতে আর কোনও সমস্যা থাকবে না। তাই ডারভিলের শ্বাস প্রশ্বাস যে সব যন্ত্রের সাহায্যে বাইরে থেকে পরিচালিত করা হচ্ছিল তা খুলে নেওয়া হয়। সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত কার্ডিয়াক সার্জেন ক্রিশ্চিয়ান বার্নাড ওই তরুণীর হৃদযন্ত্র সাময়িকভাবে অকেজো করে দিতে পটাশিয়াম ইনজেকশন দেন। রাত ৯টা নাগাদ ডারভালের মৃত্যু হয়। ডারভালের মৃত্যুর পর তাঁর কিডনি ১০ বছরের জোনাথন ভন ওয়াঙ্কের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। আর ডারভিলের হৃদপিণ্ডটি ওয়াসকানস্কির শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। কোনও মানুষের শরীরে প্রথম হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন করে নজির গড়েন কার্ডিয়াক সার্জেন ক্রিচিয়ান বার্নাড।
তবে এভাবে হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন করা খুব একটা সহজ ছিল না। এই অস্ত্রোপচার করার জন্য তিনি হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসককে নিয়ে একটি দল গড়েছিলেন। সেই মেডিক্যাল টিমে ছিলেন হ্যামিল্টন নেকি। চিকিৎসক না হয়েও হ্যামিল্টন ওই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচারে অংশ নিয়েছিলেন। ব্যাপারটি নিয়ে খুবই বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। হ্যামিল্টনকে কেন এরকম একটা অস্ত্রোপচারে সহায়তা করতে ডাকা হয়েছিল তা নিয়ে পরবর্তীকালে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে সেটা এই ঘটনার বহু বছর বাদে। কারণ সেই সময় তা কোনওভাবেই প্রচার করা হয়নি। আসলে হ্যামিল্টন ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ। ১৯৬৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবিদ্বেষ ব্যাপকভাবে ছিল। কোনও শ্বেতাঙ্গকে অস্ত্রোপচার করার অধিকার কৃষ্ণাঙ্গদের ছিল না। জোনাথন ভন ওয়াঙ্ক ছিলেন শ্বেতাঙ্গ। তাই তাঁর অস্ত্রোপচারে একজন কৃষ্ণাঙ্গ সহায়তা করলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠত। ঠিক সেই কারণে একজন মানুষের হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচারে হ্যামিল্টনের অংশ নেওয়ার বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। তাঁকে ওই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার দলে নেওয়ার কারণ ছিল তাঁর দক্ষতা। হ্যামিল্টনের অঙ্গ প্রতিস্থাপনে অসাধারণ দক্ষতা ছিল। যদিও তিনি ১৯৬৭ সালের আগে কোনও মানুষের অঙ্গ প্রতিস্থাপন করেননি। তিনি কুকুর, জিরাফ প্রভৃতি প্রাণীর শরীরে অঙ্গ প্রতিস্থাপনে সহায়তা করতেন। তিনি অস্ত্রোপচারের পর সেলাইও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দ্রুত করতে পারতেন। এই অস্ত্রোপচারের আগে হ্যামিল্টন দীর্ঘদিন ধরে মানব শরীরের বিভিন্ন অংশের খুঁটিনাটি বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জেনেছিলেন। তাঁর প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অস্ত্রোপচার নিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেই প্রশিক্ষণের ফলে তিনি যে কোনও অঙ্গের নাম সহজেই বলে দিতে পারতেন। কোনও ডাক্তারির ছাত্রও এত সহজে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নাম মনে রাখতে পারতেন না বলে বার্নাড জানিয়েছেন। বার্নাড এক সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, হৃদপিণ্ডের চেয়ে লিভার বা যকৃৎ প্রতিস্থাপন করা অনেক বেশি কঠিন কাজ। অথচ হ্যামিল্টন তা সহজেই করতে পারতেন। যেসব চিকিৎসক হ্যামিল্টনের সঙ্গে কাজ করেছেন তাঁরা বলেছেন তিনি এই অস্ত্রোপচারে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। বার্নাডের মতে, হ্যামিল্টন তাঁর চেয়ে অনেক ভালো সার্জেন। তিনি যকৃৎ প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করতে তাঁর মতো অতটা দক্ষ ছিলেন না। অঙ্গ প্রতিস্থাপনে বিশেষজ্ঞ সার্জেন রোজমেরি হিকম্যানের সঙ্গে প্রায় ৩০ বছর অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছিলেন হ্যামিল্টন। তিনিও তাঁর দক্ষতা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বিভিন্ন জীবজন্তুর অস্ত্রোপচারের কাজে সহায়তা করার পাশাপাশি অনেক সময় একাই যে জন্তুর শরীর থেকে কোনও অঙ্গ বের করে নিয়ে অন্য জীবজন্তুর শরীরে প্রতিস্থাপন করতে হবে সেই বেশিরভাগ কাজ একাই করে ফেলতে পারতেন।
সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় গ্রোটি সিউর হাসপাতালের অঙ্গ প্রতিস্থাপন বিভাগের প্রধান ডেল খানকে একটা শুকরের যকৃৎ প্রতিস্থাপন একাই করে দেখিয়েছিলেন। যে অস্ত্রোপচার করতে আমেরিকায় অন্তত তিনজন মেডিক্যাল সার্জেনের দরকার পড়ত সেখানে হ্যামিল্টন একাই এই কাজ করতে পারতেন।
কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার রিসার্চ সেন্টারের প্রধান রেলিপ কিরিশ্চও বিস্মিত হয়েছিলেন হ্যামিল্টনের দক্ষতায়। তাঁর মতে, হ্যামিল্টনের মতো অসাধারণ মানুষের দেখা বহু বছরে একবারই মেলা সম্ভব। তিনি এমন একটা মানুষ ছিলেন যাঁর কোনও প্রথাগত শিক্ষা বা ডিগ্রি না থাকলেও অস্ত্রোপচারের দক্ষতার দিক থেকে তাঁকে সবার সেরা বলা চলে। বহু তরুণ চিকিৎসক তাঁর কাছ থেকে অস্ত্রোপচারের পাঠ নিয়েছেন। এক পরিসংখ্যানে জানা যায় অন্তত ৩৫ হাজার ডাক্তারি পড়ুয়া ছাত্র এবং নতুন ডাক্তারি পাশ করা তরুণদের অস্ত্রোপচারের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন হ্যামিল্টন।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের ন্যাগসিংওয়ানে গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে ১৯২৬ সালের ২৬ জুন হ্যামিল্টন নেকির জন্ম। ১৪ বছর বয়সে তিনি সিক্সথ ইয়ার এডুকেশন শেষ করেন। এরপর পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে পশুপালন করে দিন কাটাতেন হ্যামিল্টন। পরবর্তীকালে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে সংসারের হাল ধরতে রোজগারের আশায় তিনি কেপটাউনে চলে আসেন। সেই সময় কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভবনের একটি অংশের নির্মাণকাজ চলছিল। সেখানে তিনি রাজমিস্ত্রীর জোগাড়ের কাজ পান। সারাদিন কাজের পর সকলে যখন বাড়ি চলে যেত তখন হ্যামিল্টন বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি অংশে থাকতেন। রোজগারের বেশিরভাগ টাকাই তিনি পরিবারের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। এভাবে বছর দুই চলার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই নির্মাণকাজ শেষ হয়ে গেল। কিন্তু সেই সময় তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পদাধিকারীর নজরে পড়ে। তিনি হ্যামিল্টনকে কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে মালির চাকরি করে দেন। সেটা ছিল ১৯৪০ সালের গোড়ার কথা। বাগান পরিচর্যার পাশাপাশি টেনিস কোর্টের ঘাস ছাঁটাই করাই ছিল হ্যামিল্টনের প্রধান কাজ। ১৯৫৩ সালের শেষদিকে একদিন একটি জিরাফের অস্ত্রোপচার করছিলেন কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জিক্যাল ফ্যাকাল্টি রবার্ট গোয়েচ। অ্যানাসথেসিয়া করে অস্ত্রোপচার করার সময় হঠাৎই জিরাফের জ্ঞান ফিরে আসে। ছটফট করতে শুরু করে। সেই সময় জিরাফের গলা ধরে রাখার জন্য একজন শক্তপোক্ত মানুষের দরকার পড়ে। অপারেশন রুম থেকে বেরিয়ে গোয়েচ ওই শক্তপোক্ত লোকের সন্ধান করতে থাকেন। সেই সময় হ্যামিল্টন বাগানে ঘাস ছাঁটছিলেন। তিনি তাঁকে ডাকেন। হ্যামিল্টন এসে ওই জিরাফের গলা জাপটে ধরে বসে থাকেন। তিনি এভাবে প্রায় আট ঘণ্টা বসেছিলেন। মাঝে চিকিৎসকরা চা খেতে বাইরে বের হলেও হ্যামিল্টন সেখানেই বসে থাকেন। ওই অস্ত্রোপচারের শেষে তিনি আবার বাগানে ঘাস কাটতে চলে যান। এরপর প্রায়দিনই হ্যামিল্টনকে অস্ত্রোপচারের সময় জন্তুদের ধরে রাখতে ডাকা হতো। হ্যামিল্টনও সেই কাজ করে ফের বাগান পরিচর্যা করতে চলে যেতেন। তার কাজের প্রতি নিষ্ঠা দেখে ১৯৫৪ সালে রবার্ট গোয়েচ তাঁকে ল্যাবরেটরির জীবজন্তুদের পরিচর্যা করার দায়িত্ব দেন। এই সময় জীবজন্তুদের খাঁচা পরিষ্কার করার পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের সময় জীবজন্তুগুলিকে অ্যানাস্থেশিয়া করার কাজও করতে থাকেন। বেশিরভাগ সময় কুকুরদের অ্যানাস্থেশিয়া করতে হতো। এছাড়া জিরাফের জাগুলার ভেনাস ভ্যালব পৃথক করার অস্ত্রোপচারেও হ্যামিল্টন সহায়তা করতে থাকেন। প্রসঙ্গত, জিরাফের শরীরে থাকা এই ভালবের জন্য জিরাফ জল পান করার জন্য নিচু হলেও অজ্ঞান হয়ে যায় না। রবার্ট গোয়েচও একজন নামী সার্জেন ছিলেন। তিনিই প্রথম সফলভাবে ক্লিনিক্যাল করোনারি আর্টারি বাইপাস গ্র্যাফ্ট সার্জারি করেছিলেন। ১৯৬০ সালের ২ মে এই অস্ত্রোপচার করে নজির গড়েছিলেন তিনি। এমন এক সার্জেনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে অস্ত্রোপচারের বহু খুটিনাটি বিষয় জেনেছিলেন হ্যামিল্টন। পরবর্তীকালে গোয়েচ বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাওয়ার ক্রিচিয়ান বার্নাডের সঙ্গে বেশ কয়েকবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে কাজ করেছিলেন হ্যামিল্টন। বার্নাড আমেরিকা থেকে ওপেন হার্ট সার্জারির কৌশল শিখে এসেছিলেন। তিনি সেই প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাতেও ওই অপারেশন শুরু করেন। পশুদের কীভাবে অ্যানাস্থেশিয়া করতে হয় তা হ্যামিল্টনকে হাতে কলমে শিখিয়েছিলেন বার্নাড। এরপর একদিন হ্যামিল্টনকে তিনি একটি কুকুরের ওপর অ্যানাস্থেশিয়া প্রয়োগ করতে বলেন। খুব দক্ষতার সঙ্গে হ্যামিল্টন সেই কাজ করেন। এরপর থেকে শুধু পশুদের অস্ত্রোপচারের সময় ধরে থাকা নয়, অ্যানাস্থেশিয়ার কাজটি হ্যামিল্টনের উপর ছেড়ে দেন বার্নাড। পরবর্তীকালে হ্যামিল্টন অপারেশনের পর সেলাই করার কাজও রপ্ত করে ফেলেন। তাঁর দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হয়ে বার্নাড তাঁকে প্রিন্সিপ্যাল সার্জিক্যাল অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে ল্যাবরেটরিতে নিয়োগ করেন। বেশ কয়েকবছর ধরে জন্তুদের অস্ত্রোপচারের কাজে সহায়তা করার পাশাপাশি কোনও মানুষের হৃদপিণ্ড এবং লিভারের অস্ত্রোপচারের কাজেও হ্যামিল্টন অগ্রণী ভূমিকা নেন। বলতে গেলে বার্নাডের বদান্যতায় তিনি হাসপাতালের রোগীদের অপারেশনে সহায়তা করার সুযোগ পান। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি খুবই দক্ষ হয়ে ওঠেন। এই কাজে এতটাই অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন যে মানুষের দেহের খুঁটিনাটি সমস্ত অংশের নাম ও তার অবস্থান বলে দিতে পারতেন। চিকিৎসকরা অনেক সময় ভুল করলেও তিনি এ ব্যাপারে অভিধান ছিলেন বলা চলে। তাঁর এই ক্ষমতা দেখে বার্নাড বলেছিলেন, হ্যামিল্টন যদি পড়াশোনার সুযোগ পেতেন তবে তিনি বিশ্বের সেরা সার্জেন হয়ে উঠতেন। এব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। এরপর এল সেই ঐতিহাসিক দিন। ১৯৬৭ সালে ৩ ডিসেম্বর। বার্নাড হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের সুযোগ পান। এজন্য তিনি চিকিৎসকদের যে টিম গড়েছিলেন তার মধ্যে সহকারি হিসাবে হ্যামিল্টনকে বেছে নেন। দক্ষতার কারণেই তিনি তাঁকে বেছেছিলেন। তবে তাঁকে বাছলেও দরকার ছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। সেটাও তিনি গোপনে করিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি তা দীর্ঘদিন গোপনও রেখেছিলেন। ওই হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের সময় হ্যামিল্টন একাই লুইস ওয়াসকানস্কি নামে ওই রোগীর দেহ থেকে আগের হৃদপিণ্ডের অংশ সরিয়ে নেওয়ার কাজ করেছিলেন। এই অস্ত্রোপচারের পর অবশ্য মাত্র ১৮ দিন বেঁচেছিলেন ওয়াসকানস্কি। অস্ত্রোপচার সফল হলেও নিউমোনিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়। তবে প্রথম সফলভাবে হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন করে নজির গড়ে দিয়েছিলেন ক্রিশ্চিয়ান বার্নাড। এই অস্ত্রোপচারে হ্যামিল্টনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
১৯৬৮ সালে বার্নাডের হৃদপিণ্ডের অস্ত্রোপচারের গবেষক দলের সদস্যরা অন্যত্র চলে গেলেও হ্যামিল্টন রয়ে গিয়েছিলেন বার্নাডের সঙ্গে। তিনি সেই সময় হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের কৌশলের আরও উন্নতি করার জন্য বার্নাডকে সহায়তা করতেন। তবে ১৯৭০ সালে বার্নাডের হাসপাতালের চাকরি ছেড়ে চলে যান হ্যামিল্টন। তিনি এই সময় যকৃৎ প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচারের কাজে যুক্ত হন। সার্জেন রোজমারি হিকম্যানের ল্যাবরেটরিতে তিনি কাজে যোগ দেন। সেখানে তিনি শুধু যকৃৎ বা লিভার প্রতিস্থাপনে হিকম্যানকে সহায়তাই করেননি, যকৃৎ প্রতিস্থাপনের সহজ পদ্ধতির প্রশিক্ষণও দিয়েছিলেন। কোনওরকম মেডিক্যাল ডিগ্রি না থাকলেও হ্যামিল্টন একাজে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। অনেক সময় তিনি একাই যকৃৎ গ্রহীতা প্রাণীর অস্ত্রোপচার করে ফেলতেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে হিকম্যানের সঙ্গে অস্ত্রোপচারের কাজ করেছিলেন হ্যামিলন্টন। ১৯৯১ সালে কাজ থেকে অবসর গ্রহণের দিন পর্যন্ত হিকম্যানের সঙ্গে কাজ করেছিলেন হ্যামিল্টন। অস্ত্রোপচারে এত দক্ষ এবং প্রখ্যাত সার্জেনদের সঙ্গে কাজ করার পরেও কিন্তু খাতায় কলমে বাগানের মালির পদেই রয়ে গিয়েছিলেন হ্যামিল্টন। সেজন্য অবসর গ্রহণের পর মাত্র মাসে মাত্র ৭৬০ র্যান্ড বা প্রায় ২৭৫ ডলার পেনশন বা অবসরকালীন ভাতা হিসাবে পেতেন হ্যামিল্টন।
হ্যামিল্টনের ব্যক্তিগত জীবন খুবই সাধারণ ছিল। তাঁর চার পুত্র ও এক কন্যা। তিনি এক কামরার একটি ছোট ঘরে থাকতেন। বাড়িতে বিদ্যুৎ, জলের কোনও সংযোগ ছিল না। তিনি তাঁর রোজগারের বেশিরভাগ অর্থ স্ত্রী ও পরিবারকে পাঠিয়ে দিতেন। তিনি নিয়মিত চার্চে যেতেন এবং সময় পেলেই বাইবেল পড়তেন। অবসর গ্রহণের পর তাঁর পরিবার যেখানে থাকত সেখানকার মানুষদের সহায়তাও করতেন। তিনি সেখানে একটি স্কুল তৈরিতে সহায়তা করেন। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিকও চালু করেছিলেন। অবসরের পর সেই ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিকে তিনি এলাকার মানুষের চিকিৎসায় সহায়তা করতেন। এই কাজের সুবাদে তাঁর নাম বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রখ্যাত সার্জেন ক্রিশ্চিয়ান বার্নাড পরবর্তীকালে তাঁর অবদানের কথা সংবাদমাধ্যমে এক সাক্ষাৎকারে জানান। এরপর একের পর এক সার্জেন হ্যামিল্টনের অত্যাশ্চর্য দক্ষতার কথা জানান। গোটা বিশ্বে এ নিয়ে শোরগোল পড়ে যায়। ২০০২ সালে তাঁকে মেট্রোপলিটাল ইস্টার্ন কেপ অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। ওই বছরই অসাধারণ এবং বিরল উৎকর্ষতার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান দ্য ব্রোঞ্জ অর্ডার অব ম্যাপাঙ্গুবি দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করেন দেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থাবো এমবেকি। ২০০৩ সালে তিনি বিটিডব্লুএসসি ব্ল্যাক এস/হিরোস অ্যাওয়ার্ড পান। ২০০৩ সালেই তাঁকে কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক মাস্টার ডিগ্রি প্রদান করে। তবে এ বিষয়ে দু’টি মত রয়েছে। একটি মতে তাঁকে সাম্মানিক মাস্টার অব মেডিসিন বা এমএমএড দেওয়া হয়েছিল। অপর মতে তাঁকে এমএসসি বা মাস্টার অব সায়েন্স ডিগ্রি দেওয়া হয়েছিল। ২০০৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার পার্লামেন্ট তাঁকে সিনিয়র সিভিল গার্ড অব অনার জানিয়েছিল। ২০০৫ সালের ২৯ মে ৭৮ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের উপনগরী ল্যাঙ্গায় হ্যামিল্টনের জীবনাবসান হয়। তাঁর স্মরণে ২০১৭ সালের আগস্টে কেপটাউনের ক্রিচিয়ান বার্নাড হাসপাতালের বিপরীতের রাস্তার নাম পরিবর্তন করে হ্যামিল্টন নেকি স্কোয়ার করা হয়।
হ্যামিল্টন ১৯৬৭ সালের ৩ ডিসেম্বর বিশ্বের প্রথম একটি মানুষের হৃদপিণ্ড অপর মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচারে বিশেষ ভৃমিকা নিয়েছিলেন বলে দাবি করা হলেও এ নিয়ে নানান বিতর্ক রয়েছে। ২০০৫ সালের ১৪ জুলাই থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমেরিকার সংবাদসংস্থা দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং অন্তত ৫টি পাক্ষিক পত্রিকা হ্যামিল্টনের জীবনীতে তাঁকে প্রথম মানব হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচারে ভূমিকা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল সেই তথ্য প্রত্যাহারের কথা জানায়। এর কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছিল হ্যামিল্টনের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ওই কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু হ্যামিল্টন যে সময়ে ওই অস্ত্রোপচারের কথা বলেছিলেন তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবিদ্বেষ থাকার কারণে কোনও কালো চামড়ার মানুষের পক্ষে একজন সাদা চামড়ার ব্যক্তির অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়া সম্ভব ছিল না। কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে হ্যামিল্টনের ওই অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়া বিষয়টি অস্বীকার না করলেও তা তাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে বলে জানিয়েছিল। দি ইকোনমিস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল হ্যামিল্টন অপারেশন থিয়েটারের কাছাকাছি ছিলেন, কিন্তু তিনি তাতে অংশ নেননি। হ্যামিল্টনের এক ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গিয়েছে হ্যামিল্টন রেডিওতে প্রথম মানুষের হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের খবর শুনেছিলেন। ওই পত্রিকার মতে এটাই প্রমাণ করে হ্যামিল্টন ওই অস্ত্রোপচারে অংশ নেননি। ওই পত্রিকায় আরও বলা হয়েছে ১৯৬৭ সালে যে ল্যাবরেটরি হ্যামিল্টন কাজ করতেন তাঁর প্রধান জানান, সেখানে হ্যামিল্টন একজন সাধারণ সেবাকর্মী হিসাবে কাজ করতেন। তখন ভিক্টর পিক নামে একজন সার্জিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করতেন। ১৯৭০ সালের গোড়ার দিকে পিকের মৃত্যুর পর গবেষণামূলক অস্ত্রোপচারের কাজে সহায়তা করতে হ্যামিল্টনকে নিয়োগ করা হয়েছিল। প্রখ্যাত সার্জেন হিকম্যানের মতে, হ্যামিল্টন একজন সৎ মানুষ। তিনি ওই অস্ত্রোপচার করার দাবি করতে পারেন না। হ্যামিল্টনের জীবনী নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্রের পরিচালক ড্রিক ডি ভিলিয়ার্সও বলেছেন, অন্য লোকের কাছে প্রথম মানুষের হৃদপিণ্ড অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়ার কথা জানালেও হ্যামিল্টন তাঁর কাছে কখনই এই দাবি করেননি।
ডেভিড ডেন্ট ২০০৫ সালে কেপটাউন ইউনিভার্সিটির হেলথ সায়েন্সের অস্থায়ী ডিন-এর মতে, ১৯৬৭ সালে তিনি হ্যামিল্টনের সঙ্গে শুয়োরের যকৃৎ প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করেছিলেন। কিন্তু যকৃৎ প্রতিস্থাপনে হ্যামিল্টন দক্ষ হলেও কোনও হাসপাতালে তিনি হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার করেননি। আবার বেশকিছু জার্নালে হ্যামিল্টন যে ওই অস্ত্রোপচারে অংশ নিয়েছিলেন তার দাবিও করা হয়েছে। এগুলির মধ্যে রয়েছে জার্নাল অব দ্য ন্যাশনাল মেডিক্যাল অ্যাসেসিয়েশন, ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি প্রভৃতি। তবে বিতর্ক যাই থাকুক, সব মিলিয়ে একজন তথাকথিত শিক্ষিত বা ডিগ্রিধারী না হয়েও যে কেবল সুযোগ ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একজন মানুষ দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন তার অনন্য নজির হয়ে গোটা বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছেন হ্যামিল্টন নেকি। যকৃৎ প্রতিস্থাপনের যে সহজ কৌশল ও নিপুণতা তিনি দেখিয়ে গিয়েছেন তা আজকের দিনেও একইভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।