সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা: রাস্তার দু’পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মণ্ডপের বাঁশ। কেউ মাথায় ঝুড়ি তুলে মাটি বইছেন। কারও কাঁধে আবার খড়ের বোঝা। আর কয়েকজন কাঠের ফ্রেমে উপর এক নাগাড়ে পেরেক ঠুকে চলেছেন— চারিদিকে শারদ-ব্যস্ততা, হাতুড়ির শব্দ এবং শ্রমিকদের তত্পরতায় স্পষ্ট আগমনীর সুর। পাঁচুর দোকান পিছনে ফেললেই খিদিরপুর ২৫ পল্লির মণ্ডপ। কিন্তু দু’পা এগলেই অপার বিস্ময়। প্যান্ডেল থুড়ি, এ তো জীবন্ত ক্যানভাস। লাল মাটির পটভূমিতে সাদা সরলরেখায় ফুটে উঠেছে — কৃষকদের পরিশ্রম, উত্সবে গ্রামের নাচ, কচিকাচাদের খেলাধুলো, পুকুরে মাছের শৈলি। গ্রামীণ জীবনের নানান রং যেন বয়ে চলেছে দেওয়ালে। প্যান্ডেলের নীচের অংশে খড়ের কারুকাজে জীবন্ত প্রকৃতি। মা দুর্গার প্রতিমার সামনে আবার শিকেতে ঝুলছে প্রকাণ্ড এক হাঁড়ি। যা থেকে ধান ঝরে পড়তে দেখে আনন্দে নাচছেন গ্রামের এক দম্পতি।
খিদিরপুর ২৫ পল্লির এবারের থিম শৈলি। মহারাষ্ট্রের প্রাচীন ওয়ারলি শিল্পকল্পার মাধ্যমে গ্রামের প্রবহমান জীবন ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী মলয় রায় ও শুভময় সিনহা। এই শিল্পের শিকড় কয়েক হাজার বছর আগে গ্রথিত হয়েছিল প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্রে। প্রাচীন এই চিত্রকলার ঝলক এখনও আমরা দেখতে পাই মহারাষ্ট্রের উত্তর সহ্যাদ্রীর পাহাড়ি অঞ্চল তালাসারি, জওহল, মোকাদা, পালগর এলাকায়। সেই ধাঁচেই খিদিরপুরের মাঝে গড়ে উঠেছে এক চিলতে গ্রাম। মায়ের প্রতিমাতেও থাকবে এই শিল্পের ঝলক। কলকাতার শহুরে রং এবং মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ এই শিল্পকলার মিশ্রণ দেখতে আপনাকে ঢুঁ মারতেই হবে খিদিরপুর ২৫ পল্লিতে।
খিদিরপুরের দুর্গাপুজো মানেই বিবিধ ভাবনার সমাহার। তাই ২৫ পল্লির শৈলিতে শুধু মজে থাকলে হবে না। ঢিল ছোড়া দূরত্বে ঘুরে আসুন ৭৪ পল্লিতে। সেখানে এবার থিম ‘কালের কলিকাতা’। পুরানো কলকাতার বাবু সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী দেবজ্যোতি জানা। এমন অভিনব ভাবনা ও দেওয়ালের সুন্দর চিত্রাঙ্কনে মোহিত হতে বাধ্য আপনি। এবার গুটি গুটি পায়ে আসুন ভেনাস ক্লাবে অকাল বোধন দেখতে। এবারের থিম, ‘আমি নারী, সব পারি।’ ভেনাস ক্লাবের সম্পাদক হিমাদ্রিশেখর দাঁ বলেন, ‘প্রকৃত শারদোৎসবে ব্রতী আমরা। সমাজে একদিকে নারীরা যেমন সংসার চালান, কর্মক্ষেত্রেও তাঁরা কোনও অংশে পিছিয়ে নেই। সেই ভাবনাই তুলে ধরা হয়েছে।’ মাতৃপ্রতিমা গড়েছেন শিল্পী শুভজিত্ সাউ। জন্ম থেকেই তিনি মূক ও বধির। কিন্তু তাঁর গড়া প্রতিমায় চোখ টানতে তৈরি।
আকর্ষণ কিন্তু আরও বাকি। তাই পেটপুজো সেরে আপনি চলে আসুন পল্লী শারদীয়ায়। সেখানে অপেক্ষা করছে রহস্য রোমাঞ্চে ঘেরা দিনাজপুরের এক আকর্ষণীয় মুখোশ শিল্পকলা, মুখা। স্থানীয় ভাষায় এটা মুখা নাচ বা গমীরা নামেও খ্যাত। দিনাজপুরের বিভিন্ন গ্রামে চণ্ডী পুজোর সময় মুখে মুখোশ পরে ঢাকের তালে এই বিশেষ নাচ পরিবেশন করেন শিল্পীরা। স্থানীয় লোকসংস্কৃতি অনুযায়ী এই নাচের উদ্দেশ্য একদিকে দেবতাকে তুষ্ট করা। অন্যদিকে, অপদেবতা বা অশুভ শক্তিকে দূর করা। পল্লী শারদীয়ায় এই লোকসংস্কৃতিই ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী শঙ্কর পাল। পুজোর চারদিন এই মুখা নাচও উপস্থাপনাও হবে মণ্ডপে।