নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: দশভুজা হলেও নদীয়ার অধিকাংশ বনেদি বাড়ির দুর্গাপ্রতিমা ভিন্ন এক আখ্যান শোনায়। এক নজরে দেবীকে মনে হয় দ্বিভুজা— শান্ত, স্নিগ্ধ, ঘরের মেয়ে। বাকি আট হাত লুকিয়ে থাকে তাঁর কালো কেশের আড়ালে। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যই নদীয়ার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোকে আলাদা করে তুলেছে সমগ্র বাংলার চোখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পিছনে রয়েছে দেবীকে ঘরের মেয়ে হিসেবে দেখার প্রচলিত রীতি। মহিষাসুরমর্দিনী দশভুজা দুর্গার যে রণং দেহি রূপ, বনেদি বাড়ির পুজোগুলোয় তা সচরাচর দেখা যায় না। বরং এখানে দুর্গা হলেন স্নেহময়ী কন্যা, যিনি প্রতিবছর সপরিবারে বাপের বাড়ি আসেন। তাই তাঁকে দ্বিভুজা রূপেই দেখা হয়— মাতৃরূপী, স্নেহময়ী। তবে দেবীর দশ হাত নেই, এমন নয়। প্রতিমা শিল্পীরা সযত্নে বাকি আটটি হাত লুকিয়ে রাখেন দেবীর কেশের আড়ালে।
এই ধারা শুরু হয়েছিল কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির রাজরাজেশ্বরী প্রতিমা থেকে। একসময়ে সেখানে দুটো হাত প্রকট ছিল, বাকি আটটি হাত ছোট আকারে ঢেকে রাখা হতো। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির সেই প্রতিমা শৈলীর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে নদীয়ার প্রায় সব বনেদি বাড়ির দুর্গা প্রতিমা।
চাপড়ার ব্রহ্মবাড়ি থেকে ধুবুলিয়ার বেলপুকুর— প্রায় সব বনেদি পরিবারেই দেখা যায় দুর্গা প্রতিমার এই বৈশিষ্ট্য। মাটিয়ারির চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে পূজিত হন দ্বিবাহু বিশিষ্ট দুর্গা। শান্তিপুরের বড় গোস্বামী বাড়িতে প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী ধরে দেবী কাত্যায়নী পূজিত হচ্ছেন চিরাচরিত নিয়মে। এখানে দেবীর আট হাত অস্ত্রহীন, অস্ত্র থাকে কেবল দু’ হাতে। দেবীর দুই সন্তান— কার্তিক ও গণেশও থাকেন একেবারে ভিন্ন ভঙ্গিমায়। কৃষ্ণগঞ্জের পাবাখালির রায়চৌধুরী বাড়িতেও প্রতিমার বাকি আট হাত লুকিয়ে থাকে কেশের আড়ালে।
স্থানীয় গবেষক সুপ্রতিম কর্মকারের কথায়, নদীয়ার বনেদি বাড়ির পুজোয় দেবীকে মায়ের থেকেও বেশি ঘরের মেয়ে হিসেবেই দেখা হয়। তাই দশ হাত নয়, দু’ হাত বিশিষ্ট রূপই বেশি মানানসই। তবে দেবীর দশ হাত নেই— এমন ধারণা একেবারেই ভুল। সেগুলো থাকে, কিন্তু ঢাকা পড়ে যায় কালো কেশে।
পুজোর সময় নদীয়ার বনেদি বাড়িগুলোর ছবি বদলে যায়। শতবর্ষ প্রাচীন বাড়িগুলো আলোয়, আনন্দে গমগম করে। ভিড় জমে দূরদূরান্তের দর্শনার্থীদের। থিম পুজোর চটকদারির বদলে এখানে প্রকাশিত হয় আভিজাত্যের গাম্ভীর্য, ঐতিহ্যের শিকড় আর প্রতিমার অনন্য শৈলী।
সাধারণ থিম পুজোতে যেখানে কল্পনার প্রকাশই মুখ্য, সেখানে নদীয়ার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো হল ইতিহাসের ধারক, ঐতিহ্যের বাহক। আর প্রতিমার এই দ্বিভুজা রূপ বার্তা দেয়— এখানে দেবী মহিষাসুরমর্দিনী নন, তিনি ঘরের মেয়ে, স্নেহময়ী উমা।