


দু’ঘণ্টাতেই বাগডোগরা থেকে পৌঁছে গেলাম হায়দরাবাদ। গাড়ি বুক করে রওনা হলাম হোটেল অভিমুখে। বাবুখান লেনে প্রচুর বাঙালি হোটেল আছে, বাঙালি খাবার-দাবারও পাওয়া যায়। আমরা যে ক’দিন ছিলাম এখানকার আবহাওয়া আমাদের মুগ্ধ করেছে।
পরের দিন আমাদের প্রথম গন্তব্য গোলকোন্ডা ফোর্ট। এক সময় এই গোলকোন্ডাতেই নাকি হীরের খনি ছিল। কেল্লার ভিতর বেশ ঠান্ডা। রোদ লুকোচুরি খেলছে মাঝেমধ্যেই। মনে হচ্ছে দুর্গের সবুজের প্রান্তরে কেউ রোদের জরি বুনে দিয়েছে। এক সময় কুতুবশাহী বংশের রাজধানী ছিল এই গোলকোন্ডা। নির্জনতায় ঢাকা এই কেল্লায় বিষণ্ণতা ভর করে আছে। এই কেল্লায় তিলে তিলে গড়ে ওঠা কলাশৈলী দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। স্থাপত্যবিদ্যা ও ধ্বনিবিদ্যার অপূর্ব মিশেলে গড়ে উঠেছে গোলকোন্ডা দুর্গ।
১৫৯১ খ্রিস্টাব্দে গোলকোন্ডার পঞ্চম নৃপতি মহম্মদ কুলি কুতুব শাহ শহরটির পত্তন করেন। চার মিনার এই শহরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ৫৬ মিটার উঁচু এই খিলান যেন সৌন্দর্যের খনি। আলো দিয়ে যখন তা সাজানো হয় তখন মনে হয় স্বর্গের রাজদুয়ার বুঝি। হায়দরাবাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গরিমা আজও এতটুকু ম্লান হয়নি। শহর চারিদিকে তার ঐতিহ্য বিলিয়ে দিচ্ছে।
হায়দরাবাদের নিজাম প্যালেস বা চৌমহল্লা প্যালেস ইমারত হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে শহরের বুকে। এখানকার মিউজিয়ামে রয়েছে বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়ে আসা বহু মূল্যবান আসবাব, গাড়ি, ঝাড়বাতি, মার্বেলের মূর্তি, ঘর সাজানোর শোপিস, কাজ করা থালা-বাসন ইত্যাদি। ঐতিহাসিকদের মতে সপ্তম নিজাম মীর ওসমান আলি খান ভারতকে ৫০০০ কেজি সোনা দান করেছিলেন। চৌমহল্লা প্যালেস তাঁর সেই প্রাচুর্যের স্মৃতি হিসেবে দণ্ডায়মান।
এরপর সালার জং মিউজিয়াম। নবাব মীর ইউসুফ খান সালার জং তৃতীয় নামে বিখ্যাত। তাঁর সারা জীবনের সংগ্রহ এখানে এলে দেখতে পাওয়া যায়। মিউজিয়ামটি পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু উদ্বোধন করেন।
হায়দরাবাদ আর সেকেন্দ্রাবাদ শহর দু’টিকে হুসেন সাগর আলাদা করেছে। সন্ধের আলোকজ্জ্বল রোশনাই লেকের পরিবেশকে মনোরম করে তোলে। মোহময় এক রূপচ্ছটা রাঙিয়ে দেয় রাতের হুসেন সাগরতট। লেকের মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে বুদ্ধের মনোলিথিক স্ট্যাচু। এখন লেকের বুকে বোটিংও করা যায়। হুসেন সাগর থেকে একটু এগিয়ে গেলেই পাশে লুম্বিনী পার্ক।
সম্পূর্ণ সাদা মার্বেল পাথরে গড়া এলাকার ঐতিহ্যবাহী বিড়লা মন্দির। সাদা ঝকঝকে অপরূপ রূপচ্ছটা আর ঐশ্বরিক প্রভা ঠিকরে বেরচ্ছে মন্দিরের গা থেকে। একটি পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এই মন্দির। মন্দিরের উপর থেকে দেখা যায় হুসেন সাগর।
এলাকার এই পার্ক দেশের বৃহত্তম চিড়িয়াখানাগুলির মধ্যে অন্যতম। প্রচুর জন্তু-জানোয়ার, পাখি, প্রজাপতির দেখা মিলবে এই জুলজিক্যাল পার্কে। মনোরম পরিবেশ, জঙ্গলে ও সুন্দর ঘন গাছপালায় আচ্ছাদিত। এই পার্কে না এলে যেন হায়দরাবাদ সফর সম্পূর্ণ হয় না। রয়েছে প্রজাপতি পার্ক, সিংহ সাফারি, হাতি, বাঘ, সাপ, ভল্লুক, নেকড়ে বাঘ, শিয়াল, পান্ডা সহ নানা জন্তু।
সপরিবার ঘুরতে গেলে রামোজি ফিল্ম সিটি এককথায় দারুণ স্থান। ২৫০০ একরের এই বিশাল ফিল্ম সিটি উপভোগ করতে চাইলে সারাদিন হাতে সময় রাখা দরকার। পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য রয়েছে নানা রকম খেলাধুলোর ব্যবস্থা। হানামকোন্ডা পাহাড়ি ঢালে ১১৬২ খ্রিস্টাব্দে ১০০০ পিলারের রুদ্রেশ্বর শিব মন্দিরটি তৈরি করেন রাজা রুদ্রদেব। অসামান্য কারুশিল্প ও সৌকর্যের প্রমাণ বহন করে এই মন্দির। চোখ জুড়িয়ে যাওয়া আরেক শৈলী নজরে আসবে মন্দিরের হাতি ও নন্দীর মূর্তি দু’টিতে।
মক্কা মসজিদ হায়দরাবাদের একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। দেশের সব চাইতে বড় মসজিদগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। মসজিদটির ইট-পাথর মক্কা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল তাই এই মসজিদটির এমন নামকরণ।
হায়দরাবাদ এলেন আর একটু বিরিয়ানি খাবেন না! এখানকার দম-বিরিয়ানি অবশ্যই চেখে দেখার মতো। সঙ্গে ঘি-মিশ্রিত মাটন হালিম এবং কিমা সমোসা একদম মাস্ট। এর সঙ্গে আছে ওসমানিয়া বিস্কুট এবং মিষ্টি কুকি। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। আর আছে ফিরনি।
হায়দরাবাদের বৈচিত্র্য সত্যিই অতুলনীয়। এখানে পাবেন আভিজাত্যের সোনালি দাস্তান। সারা জীবনের অনেক চাওয়া-পাওয়ার মাঝেও ভ্রমণসুখ এক অন্যরকম আনন্দ। তা মনে যত্নে লালিত হয়। এই সুখ কেউ হৃদয় থেকে কেড়ে নিতে পারে না। সেই সুখ নিয়েই এবার বাড়ির পথে রওনা হলাম।
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে হায়দরাবাদ বিমান বা রেল পথে যেতে পারেন। থাকার জন্য নানা মানের হোটেল আছে।
শুভজিৎ বোস