গুরুপূজা করতে গিয়ে আমরা একটা বিশেষ মন্ত্র ব্যবহার করি। সেই মন্ত্রের ভেতরকার অর্থটা কী? মন্ত্রের প্রথম পঙ্ক্তিটা হচ্ছে—“অখণ্ডমণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্”। ‘আনন্দসূত্রম’ বইয়ে বলেছি, “ব্রহ্মৈব গুরুরেকঃ নাপরঃ”। ব্রহ্মের যাবতীয় গূঢ় তত্ত্ব, ভূমামানসের তথা ভূমাচৈতন্যের গোপন তত্ত্বগুলো একমাত্র ব্রহ্মই জানেন, অন্যে তা জানে না, জানতে পারে না। তাই বলা হয়েছে, “ব্রহ্মৈব গুরুরেকঃ নাপরঃ”। যতদিন পর্যন্ত না তিনি কোন জাগিতিক রূপ পরিগ্রহ করে অন্যকে তা শেখাচ্ছেন অন্যে জানবে কী করে? অর্থাৎ স্বয়ং ব্রহ্মই গুরু। ব্রহ্ম ব্যতীত আর কেউ গুরু হতে পারেন না। তাঁর গোপন তত্ত্ব কেবল তিনিই জানেন। তিনি বিশেষ আধারে নিজেকে ব্যক্ত করেন। সাধারণতঃ লোকেরা ভুল করে ভেবে বসে যে, ওই যে বিশেষ মানবীয় রূপ, ওই ফর্ম বা মানবীয় রূপটিই গুরু। কিন্তু না, সেটা ঠিক নয়, গুরু সেই আধারটির মাধ্যমে নিজেকে ব্যক্ত করছেন মাত্র।
তোমাদের ইতোপূর্বেই বলেছি, এই যে পরিদৃশ্যমান পাঞ্চভৌতিক জগৎ, এটা বিশাল হলেও অনন্ত নয়। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির সময় প্রকৃতির তমোগুণী শক্তিকে কাজে লাগাতে হয়েছিল, ভবিষ্যতেও কাজে লাগানো হবে। এই তমোগুণী স্বভাবের জন্যেই এটা কখনও অনন্ত হতে পারে না। কোথাও একটা বন্ধন থেকে যাবেই কারণ তমোগুণী প্রকৃতির ধর্মই হ’ল সব কিছুকে একটা সীমার বন্ধনে বেঁধে ফেলা। আবার কিছুটা ডিম্বাকৃতি বলে এই সৃষ্ট জগৎকে বলা হয় ব্রহ্মাণ্ড। অণ্ড মানে ডিম। ব্রহ্ম + অণ্ড = ব্রহ্মাণ্ড। অর্থাৎ পরমপুরুষের অণ্ডাকৃতি অভিব্যক্তি। এটা পরমপুরুষের অখণ্ড প্রকাশ। তাই বলা হচ্ছে ‘মণ্ডলাকার’। পরমপুরুষের এই পাঞ্চপভৌতিক অভিপ্রকাশই হ’ল এই বিশ্বটা। এই বিশ্বের সর্বত্রই তিনি পরিব্যাপ্ত। এই যে সর্বব্যাপিত্ব এর জন্যে ইংরেজী শব্দ হচ্ছে all-pervasive, সংস্কৃতে এর জন্যে রয়েছে ‘বিশ্’ ধাতু। এই কারণে সর্বানুস্যূত এই পরমপুরুষের জন্যে ‘বিষ্ণু’ শব্দ প্রযুক্ত হয়। বিষ্ণু মানে ব্যাপনশীল (all-pervasive)। “তৎপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরুবে নমঃ”। তোমরা এও জান যে, এই যে সর্বব্যাপী সত্তা পরমপুরুষ বা বিষ্ণু, ইনি অণুজীবের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। গুরুর সহায়তা ছাড়া মানুষ নিজের চেষ্টায় এই পরমপুরুষের সান্নিধ্যে আসতে পারে না। জীব ও শিবের মধ্যেকার যোগসূত্র হলেন গুরু। এই যে যোগসূত্র, এই যোগসূত্রটুকুও হলেন শিবের অংশ অর্থাৎ শিবই গুরু। “তৎপদং দর্শিতং”—এই যোগসূত্রই বস্তুতঃ পরমপুরুষ, এই যোগসূত্রই তারক ব্রহ্ম। এঁকেই অনুসরণ করতে হবে। “তস্মৈ শ্রীগুরুবে নমঃ”—আমি তোমার বেদীমূলে আত্মসমর্পণ করছি। “অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া”। তোমরা জান, চোখে মলম বা অঞ্জন লাগাতে গেলে একটা শলাকার দরকার পড়ে। শলাকা মানে ছোট একটা ষ্টিক। এখন তত্ত্বগতভাবে দেখতে গেলে সমস্ত অণুজীবই সেই পরম কারণ সত্তার খণ্ড প্রকাশ, সেই এক ও অদ্বিতীয় পরমপুরুষের ভিন্ন ভিন্ন আংশিক প্রকাশ।


