সুমিত জানা (কাঠমাণ্ডুর নিউ রোডের বাসিন্দা): একবছর আগে বাংলাদেশের, তারও আগে শ্রীলঙ্কার গণঅভ্যুত্থানের ভিডিয়ো নিউজ চ্যানেল আর সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছি। সেসময় ভাবিইনি যে, একদিন আমিও এমন ভয়াবহ ঘটনার মুখোমুখি হব। আমার বাড়ি ঘাটালে কুঠিঘাটের জামিরায়। বাবা বহুবছর যাবৎ কাঠমাণ্ডুতে ভাড়ার ফ্ল্যাটে থাকেন। সেখানে তাঁর সোনার গয়না তৈরির কারখানাও চলে। উচ্চমাধ্যমিকের পর বাবাকে সাহায্য করার জন্য আমিও নেপালে চলে আসি। সঙ্গে মাও থাকেন।
বেশ ভালোই কাটছিল আমাদের। সম্প্রতি টিভিতে নেপালের উত্তাল পরিস্থিতি দেখছিলাম বটে কিন্তু আমাদের তেমন সমস্যা হচ্ছিল না। হঠাৎ সোমবার সকালে বাড়ির মালিক কেদারশাহি এসে দরজায় টোকা দিতেই বুকটা কেঁপে উঠল! দশতলা বিল্ডিংয়ের চারতলায় থাকি আমরা। কেদার সতর্ক করে গেলেন, ‘‘বাইরের অবস্থা ভালো নয়। কেউ বাইরে বেরোবেন না।’’ বিক্ষোভে শামিল জেন-জি। ভয়টা বেশি তাঁর তাতেই। আতঙ্কের মাত্রা বেড়ে গেল আমাদেরও।
এই গণ্ডগোল কবে থামবে জানি না। তাই কিছু চাল-ডাল, আলু-ডিম আর সবজি মজুত করতে গিয়ে দেখি বেশিরভাগ দোকান বন্ধ। গুটিকয়েক খোলা দোকানে ব্যাপক ভিড়। দোকানবাজার সেরে ফেরার সময় হঠাৎ দেখি, একদল নেপালি লোক পাগলের মতো ছুটছে এবং তাদের পিছনে পুলিশ। মুহূর্তের মধ্যে সবটা কেমন যেন সিনেমার মতো লাগছিল। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গিয়ে লুকিয়েচুরিয়ে বাড়ির দিকে দৌড়োলাম। বাড়ির ছাদ থেকে দেখছি, চারিদিকে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া! বহু জিনিস পুড়ছে। সঙ্গে ভেসে আসছে গুলির বিকট আওয়াজ। বুকের মধ্যে একটা চাপা ভয়, সঙ্গে তারুণ্যেরও দুঃসাহস। বাবা-মাকে ফাঁকি দিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে বাড়ির অদূরে বিশালবাজার জনসেবার (থানা) দিকে গেলাম। হা কপাল! জনসেবার সমস্ত গাড়িই মেন রোডে নামিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে বিক্ষোভকারীরা। তারা আগুন ধরাল থানাতেও। বাড়িতে উদ্বেগের মধ্যে টিভিতে খবরই দেখছি শুধু।
সেই আতঙ্কের মধ্যে, সন্ধ্যায় খবর পেলাম, এক-দেড় কিমি দূরে ললিতপুর নখু জেলের গেট ভেঙে ফেলা হয়েছে। টিভির খবর, প্রায় দেড় হাজার বন্দি জেল থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। পরে বিক্ষোভকারীরা ওই জেলেও আগুন ধরিয়ে দেয়। এই ঘটনার পর আমাদের স্নায়ুর চাপ আরও বেড়ে গেল। এরপর রাতের দিকে শুনি, আমাদের পরিচিত এক বাঙালি ব্যবসায়ী শ্রীনিবাসের দোকান লুট হয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা নামতেই এত চেনা শহরটা ভীষণ অচেনা হয়ে গেল। বাইরে থেকে আসছে সাইরেন, গুলির আওয়াজ আর মানুষের আর্তনাদ।
জানলার ফাঁক দিয়ে ধোঁয়ায় ভরা আকাশ দেখে মনে হচ্ছিল, আমরা যেকোনও সময় আক্রান্ত হব। একাধিক দিন পেরিয়ে, আজও বাইরে বেরোতে সাহস পাচ্ছি না। শহর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে ঠিকই, তবে আতঙ্কের ছায়া আঁকা যেন প্রতিটি মুখে। এই অস্থিরতার শেষ কখন হবে, তা কেউ জানে না। এই আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন কাটছে আমাদের। বাবা-মা এবং আমরা, সবাই মিলে এই পরিস্থিতি থেকে দ্রুত মুক্তি প্রার্থনা করছি।