


নিজস্ব ভাষা-বর্ণ ছাড়া জাতি হিসেবে পূর্ণতা পাওয়া কঠিন। বাঙালির ভাষা তো ছিল। বর্ণ-পরিচয়ের অভাব পূরণ করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। সংস্কৃত ভাষার নির্ভরতা কাটিয়ে মাতৃভাষায় লেখাপড়ার পরিসর তৈরি করেছিল তাঁর ‘বর্ণপরিচয়’। শুধু বর্ণের সঙ্গে পরিচয়ই নয়, সেখানে রয়েছে নীতিশিক্ষা ও মূল্যবোধের পাঠও। গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে পালকিতে যেতে যেতেই নাকি এর পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলেন বিদ্যাসাগর! ১৮৫৫ সালের ১৩ এপ্রিল প্রকাশিত হয় বর্ণপরিচয়ের প্রথম ভাগ। হালকা গোলাপি মলাটে। প্রকাশস্থল—কলকাতা। মূল্য—এক আনা। শোনা যায়, শুরুতে নাকি বাঙালির মনে দাগই কাটতে পারেনি এই বই। তবে ধীরে ধীরে তা জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিদ্যাসাগর জীবিত থাকা অবস্থাতেই পঁচিশ লক্ষ কপি ছাপা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও ‘শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রণীত বর্ণপরিচয়’-এর গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা বিন্দুমাত্র কমেনি। বিদ্যাসাগর আধুনিক বর্ণমালার রূপকার। সংস্কারের কাজটিও হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। বর্ণপরিচয়ের প্রথম ভাগের ভূমিকাতে সেই বিষয়টি ব্যাখ্যাও করেছিলেন তিনি। ভাষা বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত ষোলো স্বর ও চৌত্রিশ ব্যঞ্জনবর্ণ ছিল। তাতে বেশ কিছু নতুন বৈশিষ্ট্য যুক্ত করেছিলেন বিদ্যাসাগর। জুড়ে ছিলেন ড়, ঢ়, য় বর্ণগুলি। স্বরবর্ণের তালিকা থেকে অনুস্বর ও বির্সগকে ব্যঞ্জনবর্ণের তালিকায় যুক্ত করেছিলেন। আলাদা মর্যাদা পেয়েছিল চন্দ্রবিন্দু-ও। এমন আরও নানা সংস্কার-সংযোজন, বিয়োজনে বর্ণপরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছিলেন বিদ্যাসাগর। ওই বছরের ১৪ জুন বইয়ের দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। শিশুদের ভাষাশিক্ষার জন্য আরোহী পদ্ধতিতেই পাঠ্যক্রম তৈরি করেছিলেন সংস্কৃত কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ। অর্থাৎ পড়ুয়ারা প্রথমে বর্ণ চিনবে। তারপর সেগুলি জুড়ে শব্দ ও বাক্য গঠনের মাধ্যমে লিখতে-পড়তে শেখা। শতাব্দী প্রাচীন সেই পদ্ধতিও আজও সমান প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছে।