মোদি জমানায় দেশের প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা মেলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা হয়েছে, তিনি ঢাকঢোল পিটিয়ে যা বলেন বা দাবি করেন বাস্তব ছবিটা ঠিক তার উলটো। বিজেপি দাবি করে, নরেন্দ্র মোদির অন্যতম প্রিয় বিষয় হল ‘দুর্নীতি রোধ’। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ‘দুর্নীতিমুক্ত’ দেশ গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তিনি। রীতিমতো হিন্দি ছবির জনপ্রিয় ডায়লগের অনুকরণে তাঁর ঘোষণা ছিল, ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা।’ তাঁর দল বলেছিল, ‘সুশাসন সঙ্কল্প, বিজেপি বিকল্প।’ সে সময় মনমোহন সিং সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ‘ক্যাগ’-এর রিপোর্টকে হাতিয়ার করে দেশজুড়ে প্রচার চালিয়েছিল গেরুয়াবাহিনী। তারপরের এগারো বছরে লোকসভা ও যে কোনও রাজ্যের বিধানসভা ভোটের প্রচারে ‘দুর্নীতির’ বিরুদ্ধে কার্যত জেহাদ ঘোষণা করতে দেখা গিয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। ২০১৬ সালে নোটবন্দির ঘোষণা করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সব কালো টাকা ফিরে আসবে। তাঁর স্বগর্ব ঘোষণা ছিল, আর্থিক নয়ছয়, জাল নোটের জমানা শেষ হয়ে গেল। বলেছিলেন, দুর্নীতিরোধে তাঁর মনোভাব ‘জিরো টলারেন্স’। এত ঢক্কানিনাদের নিট ফল হল, মোদির ভারত দুর্নীতির পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে। কেমন সেই ছবি? জার্মানির একটি সংস্থা সমীক্ষা করে জানিয়েছে, ২০২৪ সালে মোদির পছন্দের বিষয় ‘দুর্নীতিতে’ ১০০ নম্বরে ভারত পেয়েছে ৩৮ নম্বর, এই সমীক্ষায় পাশের নম্বর ছিল ১০০-তে ৪৩। এতেই স্পষ্ট মোদি জমানায় দুর্নীতিমুক্ত ভারত গঠন তো হয়ইনি, বরং ধাপে ধাপে দুর্নীতি বেড়েছে। দুর্নীতি সূচকে পাশ মার্কসটুকুও তুলতে না পেরে ভারত ফেল করেছে। তার আগের দু’বছরে ভারত পেয়েছে যথাক্রমে ৪০ এবং ৩৯ নম্বর। সরকারি স্তরে দুর্নীতিকে এই সূচকের মাত্রা বা মান নির্ধারণের জন্য বিবেচনা করা হয়। তাতেই ১৪৩ কোটির এ দেশ পাশ নম্বর তুলতে পারেনি। দুর্নীতি নির্ধারণের এই পরীক্ষায় বসেছিল ১৮০টি দেশ। ভারতের স্থান ৯৬-তে। মোদিজির সান্ত্বনা হতে পারে, সমীক্ষায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশই ৫০-এর কম নম্বর পেয়েছে। তবু প্রশ্ন থাকে, ‘দুর্নীতিমুক্ত’ ভারত গঠনের কী হল?
এই লজ্জা থেকে ভারতকে মুক্ত করতে সাত বছর আগে অভিভাবকের ভূমিকায় মঞ্চে অবতীর্ণ হয়েছিল বিশ্বব্যাংক। সরকারি ক্ষেত্রে আর্থিক স্বচ্ছতা ফেরাতে ২০১৭ সালে বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কারের একটি রুটম্যাপ মোদি সরকারের হাতে তুলে দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। সেখানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিমা, শেয়ার বাজার সংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি, দেশের নেতা, মন্ত্রী, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, শিল্পপতিদের আর্থিক অনিয়ম বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। যথাযথ আইনি ঘেরাটোপ তৈরি করে প্রকৃত দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার দাওয়াই দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। কালো টাকা, জাল নোটের কারবার ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শও ছিল। সেই বিশ্বব্যাংকই সম্প্রতি একরাশ হতাশা প্রকাশ করে জানিয়েছে, আর্থিক দুর্নীতি গোড়া থেকে কেটে ফেলার কোনও উদ্যোগই নেয়নি মোদি সরকার। বিশ্বব্যাংকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিকে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দেওয়া হোক। দুর্নীতিরোধে ব্যাংকগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রিজার্ভ ব্যাংককে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিতে আইনের বদল আনা হোক। কিন্তু ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি।’ দেশ প্রকৃত দুর্নীতিমুক্ত হলে আর কী প্রতিশ্রুতি দেবেন মোদি? তাই হয়তো সুপরামর্শগুলিকে গ্রাহ্যই করেনি তাঁর সরকার।
এটাই নরেন্দ্র মোদি তথা কেন্দ্রীয় সরকারের আসল চেহারা। তিনি গলার শিরা ফুলিয়ে বলবেন, দুর্নীতিমুক্ত ভারতের কথা, কালো টাকা ফেরানোর কথা, আর্থিক অসাম্য দূর করার কথা, দেশের সব মানুষকে পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার কথা। আর বাস্তবে দুর্নীতি, কালো ও জাল টাকার সমান্তরাল অর্থনীতি রমরমিয়ে চলবে! ক্ষুধাসূচকে ভারতের স্থান হবে ১০৫ নম্বরে। ভারত চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ বলে দাবির আড়ালে চাপা পড়ে থাকছে মাথাপিছু আয়ে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের চেয়ে পিছিয়ে থাকার আসল সত্যটি। আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী ‘জি-২০’র রিপোর্টে মোদির ভারতের আরও এক সত্যকে বেআব্রু করে দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ২০০০-২০২৩ সালের মধ্যে দেশের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের সম্পত্তি ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে গরিব মানুষের সম্পদ বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ! ভারত সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এই অসাম্যকে ‘জরুরি’ পর্যায়ের সংকট বলে অভিহিত করেছেন ‘জি-২০’ গোষ্ঠীর বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এই চরম অসাম্য শুধু অর্থনীতিকেই বিপর্যস্ত করছে না, সেইসঙ্গে গণতন্ত্র, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভবিতব্যকেও গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এসব জেনে প্রধানমন্ত্রীর কি আদৌ কোনও বোধোদয় হবে? তাই বলতেই হয়, মোদি জমানায় দুর্নীতি বন্ধ তো দূরঅস্ত, বরং পরোক্ষে সরকারি দাক্ষিণ্যে দুর্নীতির রাস্তাগুলিকে যত্নসহকারে আগলে রাখা হয়েছে।