


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দার্জিলিংয়ের বৃষ্টি-বিপর্যয় হাজার হাজার পর্যটককে যেমন বিপাকে ফেলেছে। যাঁরা বিপর্যয় থেকে মুক্তি পেতে রবিবারই পাহাড় থেকে নীচে নামার উদ্যোগ নিলেন, ভোগান্তি পিছু ছাড়ল না তাঁদেরও। রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল তাঁদের। সঙ্গে পিছু ছাড়ল না আতঙ্কও।
পুজোর ছুটি উপলক্ষ্যে স্বামীর সঙ্গে সিকিমের নামচিতে বেড়াতে গিয়েছিলেন ঢাকুরিয়ার শম্পা হালদার। গতকাল থেকেই আবহাওয়ার অবনতি হতে শুরু করে। তার মধ্যেই কপাল ঠুকে নামচি থেকে কার্শিয়াংয়ের উদ্দেশে রওনা দেন তাঁরা। অন্যসময়ে যে রাস্তা আসতে সাধারণত ঘণ্টা তিনেক সময় লাগে, সেই রাস্তাতেই সময় লেগে যায় ৬ ঘণ্টা। দুপুর ১১টায় রওনা হয়ে কার্শিয়াংয়ে পৌঁছান বিকেল ৫টায়। শম্পাদেবী বলেন, ‘হোটেলে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু হয় তুমুল ঝড়বৃষ্টি। মনে হচ্ছিল যেন ঘরটা বোধহয় এখনই ভেঙে পড়বে। একটা ব্যাগে আইডি কার্ড, মানিব্যাগ আর ফোন ভরে তৈরি ছিলাম। যাতে কোনও বিপদ হলে অন্তত ওই ব্যাগটা নিয়ে বেড়িয়ে আসতে পারি। রবিবার ভোরের দিকে বৃষ্টি একটু কমে। সকাল ৭টা নাগাদ বৃষ্টি কমতেই গাড়ির খোঁজ করতে থাকি। কিন্তু কোনও গাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল না। হোটেলের কর্মীরা বাসেরও খোঁজ করছিলেন। দুপুর ১২টা নাগাদ ভাগ্যক্রমে একটা গাড়ি পাওয়া যায়। গাড়িটা যাত্রী নিয়ে শিলিগুড়ি থেকে সোনাদা যাচ্ছিল। কিন্তু রাস্তা বন্ধ থাকায় ওই যাত্রীদের কার্শিয়াংয়েই নামিয়ে দেন গাড়িচালক। সেখান থেকে শিলিগুড়ি ফিরছিল গাড়িটি। দুটো সিট খালি থাকায় আমরা উঠে পড়ি। গাড়ি চালু করার আগে চালক বেশ কয়েকজনকে ফোন করেন। গাড়িচালককে একজন জানান, তিনি হিলকার্ট রোড (এনএইচ-১১০) ধরে যাচ্ছেন। রাস্তা ঠিক আছে। তড়িঘড়ি ওই রাস্তা দিয়েই রওনা হই। ১২টায় গাড়িতে উঠে বাগডোগরা পৌঁছোই পৌনে ৩টে নাগাদ। রাস্তায় সত্যিই কোনও জ্যাম পাইনি। তবে গাড়িচালকের কাছে শুনলাম, অধিকাংশ রাস্তায় নাকি ধস নেমে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বাগডোগরা পৌঁছতে ১২০০ টাকা ভাড়া নিয়েছিলেন ওই গাড়িচালক। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কলকাতায় ফেরার বিমান। বিমানবন্দরে বসে ভাবছি, এ যাত্রায় কোনও মতে বেঁচে গেলাম।’
বিপর্যয়ে প্রায় একই অভিজ্ঞতা সল্টলেকবাসী বিশ্বজিৎ দাসেরও। স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে নিজেই গাড়ি চালিয়ে পুজোর ছুটিতে রওনা দিয়েছিলেন পাহাড়ে। প্রবল বৃষ্টিতে যাতে নতুন করে আরও বেশি বিপদে পড়তে না-হয়, তার জন্য গাড়ি চালিয়ে রবিবারই শিলিগুড়ি নামার পরিকল্পনা করেন তিনি। সকাল সাড়ে ১০টায় জোড়পোখরি থেকে রওনা দেন। রোহিনীর রাস্তায় ধস নামায়, সেই পথ বন্ধ ছিল। তাই পাঙ্খাবাড়ি রোডে আসার চেষ্টা করেন তিনি। যে পথ আসতে পৌনে একঘণ্টা থেকে বড়ো জোর এক ঘণ্টা লাগার কথা, সেই পথে আসতে বিকেল সাড়ে ৩টে বেজে যায় তাঁর। গোটা রাস্তাজুড়ে যেভাবে শয়ে শয়ে থেমে থাকা গাড়ির গাড়ির লম্বা লাইন ছিল, তাতে আদৌ নীচে নামা সম্ভব হবে কি না, সেই চিন্তা তাড়া করে ফিরছিল তাঁকে। বেড়াতে আসার আনন্দ যেন ক্রমশ অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল তাঁর কাছে। সন্ধ্যাবেলা যখন শিলিগুড়িতে এসে পৌঁছান, তখন মনোবল আর অবশিষ্ট নেই এতটুকু।