শতরূপা দত্ত: দুর্গাপুজো এখন আর শুধুমাত্র ঠাকুরদালানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। পাঁচ দশকে বদলে গিয়েছে এর রূপ, আঙ্গিক। সাতের দশকে যেখানে বনেদি বাড়ির গম্ভীর আরাধনা ছিল মূল আকর্ষণ, আজ সেখানে কোটি টাকার থিম পুজো, আন্তর্জাতিক পুরস্কার আর ইউনেস্কোর স্বীকৃতি। পঞ্চাশ বছরে দুর্গাপুজো হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক উৎসব থেকে বিশ্বমঞ্চের কার্নিভাল। যেখানে ঐতিহ্য, অর্থনীতি আর প্রযুক্তি মিশেছে একসঙ্গে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার ছায়ায় পুজো
সাতের দশকের দুর্গাপুজো মূলত গৃহোৎসব ও বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানেই বেশি হতো। উত্তর কলকাতার বনেদি পরিবার, রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ির পুজো তখনও মূল আকর্ষণ। পাড়ার ক্লাবপুজো ছিল, তবে সীমিত আকারে। বাজেট কম, সাজসজ্জা ছিল সাধারণ। কাপড়ের মণ্ডপ, বাঁশ-খড়ের কাঠামো, কাগজের অলঙ্করণ। পুজোর আসল আকর্ষণ ঢাকের বাজনা, আরতি, সিঁদুরখেলা ও ঠাকুর দেখার আনন্দে।
সাতের দশকে শেষ আর আটের দশকের শুরুর সময়টা পশ্চিমবঙ্গের জন্য ছিল এক কঠিন অধ্যায়। জরুরি অবস্থা (১৯৭৫-’৭৭) দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সেই সময় দুর্গাপুজোও রাজনৈতিক ছায়ার বাইরে ছিল না। অনেক মণ্ডপেই শাসকদলের প্রভাব স্পষ্ট ছিল, মহল্লার পুজোয় পোস্টার, স্লোগান, প্রচারপত্র ঢুকে পড়ত। এই দশকে শহুরে দুর্গাপুজোয় কিন্তু নতুন রূপকল্প দেখা যায়। বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে একদিকে লোডশেডিং চললেও, আলোকসজ্জার নতুন ট্রেন্ড—রঙিন বাল্ব আর ঘূর্ণায়মান আলো। সেই সময় প্যান্ডেলের বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠে। আর গ্রামীণ বাংলায় তখনও কাঁসার থালা বাজিয়ে ঢাকঢোল সহযোগে পুজোর আবহ। কিন্তু শহরে রাজনৈতিক স্লোগান, ছাত্র আন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়নের ডাকে হরতাল সবকিছুর মাঝেই দুর্গাপুজো হয়ে ওঠে জনতার জমায়েত ও প্রতিবাদের উৎসব।
বারোয়ারি পুজোয় প্রথম থিম
এই সময় প্রথম পুজো মণ্ডপে থিমের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ১৯৮৩ সালে উত্তর কলকাতার এক মণ্ডপে গ্রামীণ বাংলার খড়ের ঘর তুলে আনার চেষ্টা। যদিও সেটা আজকের মতো পূর্ণাঙ্গ থিম নয়, তবুও সেই পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ থেকেই নয়ের দশকে থিম-যুগের বীজ বপন হয়েছিল। আটের দশকের শেষ দিক থেকে শুরু করলে দেখা যায়, তখনকার দুর্গাপুজো ছিল নিরাভরণ অথচ ভরপুর আন্তরিকতায় ভরা। পাড়ার মাঠে বা গলির কোণে বাঁশ-খড়ের কাঠামো তুলে দেওয়া হতো, তার উপর কাপড়ের শামিয়ানা। সন্ধেবেলা রঙিন বাল্বের মালা জ্বলজ্বল করত, কখনও বা দড়িতে ঝোলানো হ্যারিকেন। প্রতিমা তখনও একেবারেই ঐতিহ্যবাহী। কুমোরটুলির শিল্পীরা বানাতেন মা দুর্গার দশভুজা রূপ, শাস্ত্র মতে আঁকা সিংহ, মহিষ আর কার্তিক-সরস্বতী-লক্ষ্মী-গণেশ। মণ্ডপসজ্জার চেয়ে ভক্তি, সমবেত আনন্দ আর ভোগের সুবাসই ছিল প্রধান আকর্ষণ। দুপুরে খিচুড়ি-লাবড়া, পাঁপড়, বেগুনভাজা পরিবেশন হতো পাতায় সাজিয়ে। সন্ধেবেলা ঢাকের তালে আরতির সময় মানুষ ভিড় জমাতেন, তারপর চলত ধুনুচি নাচ, রাত নামলেই পাড়ার মাঠে যাত্রাপালা বা নাটকের মঞ্চ। সেই যুগের দুর্গাপুজোতে ঝলমলানি কম ছিল, কিন্তু আবেগ ছিল অফুরন্ত। তখন পুজোর সবচেয়ে বড় সাফল্য মানেই সবাই মিলে চাঁদা তোলা, সবাই মিলে কাজ ভাগ করে নেওয়া। সেই পুজোর ঘ্রাণ আজও অনেকের স্মৃতিতে নস্টালজিয়া হয়ে রয়ে গিয়েছে।
কর্পোরেট আগমন নতুন মোড়
নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ছবিটা বদলাতে শুরু করল। কলকাতার দুর্গাপুজো পেল নতুন প্রাণ, নতুন আলো। আর তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল চন্দননগরের লাইটিং। বিদ্যুতের আলো দিয়ে চলমান ছবি তৈরি করার সেই বিস্ময় এক লহমায় পাল্টে দিল শহরের প্যান্ডেলের চেহারা। হঠাৎ দেখা যেত আলোর মধ্যে দিয়ে উড়ে চলেছে বিমান, সমুদ্রের ঢেউ কুলুকুলু করছে, কিংবা শচীন তেন্ডুলকর ব্যাট চালাচ্ছেন। কলকাতার রাত হয়ে উঠল এক আলোকময় ক্যানভাস, যেখানে প্রযুক্তির জাদুতে দর্শক মুগ্ধ হয়ে হাঁটতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। একসময় যে পাড়ার পুজো কেবল প্রতিবেশীদের মিলনক্ষেত্র ছিল, সেটি এখন আকর্ষণ করতে শুরু করল দূরদূরান্তের মানুষকে। অর্থনীতির ছবিও পাল্টাল—কোটি টাকার বাজেট তখনও আসেনি, কিন্তু লক্ষাধিক টাকা খরচ করে চমকপ্রদ আলো সাজানো শুরু হল।
নয়ের দশক দুর্গাপুজোর ইতিহাসে মাইলফলক। এই সময়েই থিম পুজোর জোয়ার শুরু হয়। কুমোরটুলি ছাড়াও অনেক শিল্পী, ডিজাইনার মণ্ডপ ও প্রতিমা গঠনে যুক্ত হতে থাকেন। এক পুজো আরেকটিকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়—কোথাও গ্রামীণ বাংলার প্রতিরূপ, কোথাও আবার মিশর বা আফ্রিকার সভ্যতার ছোঁয়া। মিডিয়া কভারেজও বাড়ে। পুজো তখন আর কেবল পাড়ার নয়, শহরের মুখ হয়ে উঠতে শুরু করে।
এই সময়ে দক্ষিণ কলকাতার বহু মণ্ডপ নতুন আঙ্গিকে থিম নিয়ে আসতে থাকে। ঐতিহ্যবাহী পুজোও পিছিয়ে ছিল না, তারা মণ্ডপে পুরনো রীতি বজায় রেখে আধুনিক আলোয় মেলবন্ধন ঘটায়। বাজেটও ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে—একেকটা বড় মণ্ডপে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ হতে থাকে।
ব্র্যান্ডিং আর আন্তর্জাতিকীকরণ
সহস্রাব্দের শুরুর সঙ্গে দুর্গাপুজোয় প্রবল রূপান্তর আসে। স্পনসর, কর্পোরেট, বিজ্ঞাপন সংস্থা পুজোয় ঢুকে পড়ে। কোটি টাকার বাজেট হয়, তারকা দিয়ে উদ্বোধন করানো হয়। থিমপুজো তখন সর্বজনীন। পুজো কমিটিগুলি বড় বড় সংস্থা থেকে অর্থ পেতে শুরু করে। এর ফলে বাজেট কয়েক লক্ষ থেকে কোটি ছাড়িয়ে যায়। ২০০০ সালে একাধিক পুজো প্রথম কোটি টাকার বাজেটে পৌঁছয়। একই সময়ে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব বাড়তে থাকে—কে বড় বাজেট আনবে, কে বেশি দর্শক টানবে, সেই লড়াই শুরু হয়। তখন আর শুধু আলো নয়, বরং ভাবনার জয়জয়কার। কলকাতার শিল্পীরা বুঝিয়ে দিলেন, দুর্গাপুজো কেবল পুজোর আচার নয়, এটি হতে পারে মুক্ত শিল্পের মঞ্চ। কোথাও মণ্ডপ সাজানো হল রাজস্থানের কেল্লার মতো, কোথাও আফ্রিকার গ্রামের প্রতিরূপ, আবার কোথাও পরিবেশ রক্ষার বার্তা বহন করছে প্রতিমা। প্রতিমার মাধ্যমও পাল্টাতে লাগল—বাঁশ, কাগজ, ধাতু, ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বা কাঠের টুকরো দিয়ে তৈরি হল অনন্য সৃষ্টি। পুজো এখন আর দেবীকে প্রণাম করার জন্য নয়, মানুষ আসতে লাগলেন থিম দেখার জন্য। প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র হল যে প্রতিটি ক্লাব চেষ্টা করত কীভাবে প্রতিবছর নতুন কিছু করে দর্শককে চমকে দেওয়া যায়। বিদেশি পর্যটকরাও এই সময় থেকে কলকাতার প্যান্ডেল ট্যুরে আসতে শুরু করেন। শহর একরকম হয়ে উঠল খোলা আকাশের আর্ট গ্যালারি। এই দশক দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক দরবারের দিকে ঠেলে দিল, যেখানে শিল্প, সৃজনশীলতা ও প্রতিযোগিতা মিশে গেল একসঙ্গে। দুর্গাপুজোর এক নতুন অধ্যায় থিম পুজোর যুগ। এখন আর কেবল আলো বা প্রতিমা নয়, বরং ভাবনা ও শিল্পসৃষ্টির দাপট। দর্শকসংখ্যা এতটাই বেড়ে যায় যে পুলিশদের বিশেষ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ চালু করতে হয়।
বিশ্বমঞ্চে দুর্গাপুজো
২০১০ সালের পর থেকে দুর্গাপুজো হয়ে ওঠে সত্যিকারের ‘গ্লোবাল ফেস্টিভ্যাল’। ইউনেস্কো ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজোকে ‘Intangible Cultural Heritage of Humanity’ স্বীকৃতি দেয়। তখন পুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, অর্থনীতি, পর্যটন, সংস্কৃতির সেতুবন্ধন। বিদেশি ট্যুরিস্টদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ, ভিড় সামলাতে অ্যাপ, লাইভ স্ট্রিমিং সবই শুরু হয়।
প্রতিমাতেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হল। মাটি ছাড়াও ব্যবহৃত হতে লাগল বাঁশ, কাগজ, ধাতু, প্লাস্টিক—যা দিয়ে তৈরি হল অভিনব শিল্পকর্ম। পুজোতে আসতে লাগলেন শুধু ভক্ত নয়, শিল্পপ্রেমীরাও। শহর একপ্রকার হয়ে উঠল খোলা আকাশের আর্ট গ্যালারি। প্যান্ডেল সাজানোতে ফাইবারগ্লাস, লাইটিংয়ে এলইডি, সাউন্ড সিস্টেমে ডিজিটালাইজেশনের ব্যবহার শুরু হয়। এই দশকে কলকাতার দুর্গাপুজো বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেতে শুরু করে। গ্লোবালাইজেশন, মিডিয়ার প্রসার এবং ইন্টারনেটের কারণে কলকাতার বাইরে থেকেও মানুষ পুজোর খবর জানতে থাকে। ২০১০ সালে প্রথমবার কলকাতা পৌরসভা ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম শ্রেষ্ঠ পুজো নির্বাচনের প্রতিযোগিতা চালু করে।
প্রযুক্তির যুগে পুজো
গত দশ বছরে দুর্গাপুজো প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য এখন প্রতিটি পুজো ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল হয়। অনলাইনে ভোট দিয়ে ‘শ্রেষ্ঠ পুজো’ নির্বাচনের ধারা শুরু হয়েছে। ভিআইপি পাস চালু হয়। এমনকী সিকিউরিটি গার্ড রেখে মণ্ডপে দর্শক প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত করতে দেখা যায় পুজো কমিটিগুলিকে। শুধু তাই নয়, পুজো এখন দশ দিনের। ব্যস্ত সময়ে পুজোর সবটুকু আনন্দ নিঙড়ে নিতে বাঙালি তৈরি হয়ে যায় সেই মহালয়া থেকেই। শহরের বহু নামী পুজো এখন মহালয়ার দিনই উদ্বোধন। ফলে ষষ্ঠী নয়, দ্বিতীয়া-তৃতীয়া থেকেই শুরু হয়ে যায় প্যান্ডেল হপিং।
সবশেষে এল বর্তমান সময়—২০১৫ থেকে আজ। এই দশক দুর্গাপুজোর ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখন পুজো মানে শুধু প্রতিমা বা মণ্ডপ নয়, তার সঙ্গে জুড়েছে প্রযুক্তির বিস্ময়। কোথাও থ্রিডি প্রজেকশন ম্যাপিং, কোথাও ড্রোন শো, কোথাও আবার অগমেন্টেড রিয়ালিটি। প্রতিটি দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ হয়, মানুষ প্যান্ডেলে না গিয়েও ইউটিউব-ফেসবুকে ভিড় করেন। দুর্গাপুজো এখন কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনীতির চালিকা শক্তি। শিল্পী, কারিগর, লাইটিং বিশেষজ্ঞ, টেকনিশিয়ান, খাবারের দোকানদার—সবাই মিলে কয়েক লক্ষ মানুষ এই উৎসবকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
দুর্গাপুজোর এক সময় নিয়ম করে গানের অ্যালবাম রিলিজ করতেন ছোট-বড় শিল্পীরা। সেই ট্রেন্ড এখন ফিকে। শারদ সংখ্যা ছিল পুজোর বাড়তি আকর্ষণ। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শারদ সংখ্যা। আর এখন বহু বিখ্যাত পুজো কমিটি নিজেরাই শারদ সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করে।
কোভিডের সময় (২০২০) পুজো ছোট মাপে হলেও ভার্চুয়াল দর্শন চালু হয়েছিল। মানুষ বাড়িতে বসেই লাইভ স্ট্রিমে পুজো দেখেছেন। এরপর থেকে অনলাইন দর্শন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে পুজো আরও এক ধাপ এগিয়ে পেশাদারিত্বের মোড়কে ঢাকা পড়েছে। শুরু হয়েছে টিকিট কেটে মণ্ডপ দেখা। গত বছর টালা প্রত্যয় টিকিট কেটে প্যান্ডেলে প্রবেশের নিয়ম চালু করে।
দুর্গাপুজো আসলে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির পরিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি। তাই পুজোর পর কার্নিভাল এখন বাড়তি আকর্ষণ। শহরের বহু নামীদামি পুজোর প্রতিমা এখন বিসর্জন দেওয়া হয় না। সংরক্ষিত হয়। এত রূপান্তরের মাঝেও এক জিনিস অপরিবর্তিত— মিলনের আনন্দ। দুর্গাপুজো তাই শুধু বাঙালির উৎসব নয়, এটি বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক শক্তি এবং বিশ্বে বাংলার উজ্জ্বল ব্র্যান্ড।